কুরআনের মর্যাদা

৮/০. অধ্যায়ঃ

কুরআনের মর্যাদা - প্রথম অনুচ্ছেদ

এখানে সাধারণভাবে পূর্ণ কুরআনের ফাযীলাত বা মর্যাদা বর্ণনা করা হয়েছে এবং বিশেষ কতিপয় সূরা ও আয়াতের ফাযীলাতও খাসভাবে বর্ণনা করা হয়েছে।আল কুরআনের কোন বিশেষ অংশ অন্য কোন অংশের উপর বিশেষ কোন মর্যাদা বা শ্রেষ্ঠত্ব রাখে কি-না তা নিয়ে গবেষকগণ ইখতিলাফ করেছেন। আবূল হাসান আল আশ্’আরী, কাযী আবূ বকর আল বাকিলানী প্রমুখ মনীষীগণ মনে করেন কুরআনের সকল আয়াত ও সূরার মর্যাদা সমান, কোন অংশই অপর কোন অংশের উপর বিশেষ কোন মর্যাদা রাখে না। কেননা মর্যাদা বা শ্রেষ্ঠত্ব হলো অমর্যাদা ও ত্রুটির বিপরীত অথচ আল্লাহর কালামের হাক্বীকত ও মৌলিকত্ব এক, সেখানে কোন ত্রুটিও নেই, কোন অংশের মর্যাদারও কমতি নেই। সুতরাং আল কুরআনের কোন অংশের বিশেষ কান মর্যাদা নেই।পক্ষান্তরে অন্য আরেকদল অর্থাৎ- জমহূর ’উলামায়ে কিরাম প্রকাশ্য এবং স্পষ্ট হাদীসের ভিত্তিতে বলেন, কুরআনের এক অংশ অন্য অংশের উপর বিশেষ মর্যাদা বা শ্রেষ্ঠত্ব রাখে। যেমন- হাদীসে এসেছে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উবাই ইবনু কা’বকে বলেছিলেনঃالا اعلمك اعظم سورة في القراٰن.’’আমি কি তোমাকে কুরআনের শ্রেষ্ঠ সূরাটি শিক্ষা দিব না?’’নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো বলেনঃ ’’নিশ্চয় ’কুল হুওয়াল্ল-হু আহাদ’ (সূরাটি) কুরআনের এক তৃতীয়াংশের মর্যাদা রাখে।’’ইমাম কুরতুবী (রহঃ) বলেনঃ কুরআনের কোন অংশের অধিক মর্যাদাশীল হওয়ার বিষয়টি অসংখ্য নস (কুরআন-হাদীসের স্পষ্ট দলীল) দ্বারা প্রমাণিত হওয়া সত্ত্বেও এ বিষয়ে ইখতিলাফ করা সত্যই আশ্চর্যজনক।আল কুরআনের বিশেষ অংশের বিশেষ মর্যাদার বিষয় নিয়েও লোকেরা ইখতিলাফ করেছেন। একদলের মতে এ শ্রেষ্ঠত্ব ও মর্যাদা তথা পুরস্কার ও সাওয়াব হলো ব্যক্তির কর্মের ভিত্তিতে যে যত আন্তরিকভাবে বা ইখলাসের সাথে চিন্তা, গবেষণা করে এবং আল্লাহর ভয় নিয়ে এর তিলাওয়াত ও ’আমল করবে তার মর্যাদা তত বেশী হবে। পক্ষান্তরে তাতে কমতি হলো ঐগুলোর কমতি হওয়া।অন্য আরেক দল ’উলামার মতে এ শ্রেষ্ঠত্ব হলো শব্দের শ্রেষ্ঠত্বের কারণে। যেমন- আল্লাহর বাণীঃوَإِلٰهُكُمْ إِلٰهٌ وَاحِدٌঅনুরূপ আয়াতুল কুরসী, সূরা আল হাশর-এর শেষাংশ, সূরা আল ইখলাস ইত্যাদি। এগুলোর মধ্যে আল্লাহ তা’আলার চূড়ান্ত ওয়াহদা-নিয়্যাতের এবং সিফাতে কামিলার প্রমাণ বাহক শব্দ রয়েছে যা’’তাব্বাত ইয়াদা.....’’, বা অন্য কোন সূরার মধ্যে নেই। সুতরাং আল কুরআনের কতিপয় আয়াত ও সূরার বিস্ময়কর অর্থ সম্বলিত শব্দের কারণেই তার এ বিশেষ মর্যাদা।এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা দেখতে চাইলে ইমাম সুয়ূতির ইত্ক্বান ২য় খণ্ড ১৫৭ পৃঃ এবং ইমাম ইবনু তায়মিয়াহ্’রجواب أهل العلم والإيمان بتحقيق ما أخبر به رسول الرحمان من أن قل هو الله أحد تعدل ثلث القراٰن(জওয়া-বু আহলিল ’ইলমি ওয়াল ঈমা-নি বি তাহক্বীকি মা- আখবারা বিহী রসূলুর রহমা-ন মিন আন্না কুল হুওয়াল্ল-হু আহাদ তা’দিলু সুলসাল কুরআ-ন) গ্রন্থ দেখে নিন।সম্মানিত লেখকদ্বয় উক্ত গ্রন্থে আল কুরআনের এক অংশ অন্য অংশের উপর, এক সূরা অন্য সূরার উপর মর্যাদা রাখার সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম ব্যাখ্যা করেছেন।অতঃপর জ্ঞাতব্য বিষয় যে, কুরআন শব্দটিالقرأة(কিরাআত) মাসদার থেকে মাফউল অর্থে ব্যবহার হয়েছে। পরবর্তীতে এটিالجمعএকত্রিতকরণের অর্থ প্রদান করেছে। যেহেতু এতে সূরাহগুলোকে এবং বিভিন্ন প্রকার জ্ঞানকে একত্রিত করা হয়েছে সেহেতু একে কুরআন বলা হয়েছে।অন্য আরেকদলের মতেقرنتমূল ধাতু থেকে নির্গত, এর অর্থ একটি বস্ত্ত আরেকটি বস্ত্তর নিকটে হওয়া। আল কুরআনের একটি সূরা আরেকটি সূরার এবং একটি আয়াত আরেকটি আয়াতের নিকটে, সুতরাং একে কুরআন বলা হয়।

মিশকাতুল মাসাবিহ

হাদিস নং ২১০৯-[১]

عَنْ عُثْمَانَ قَالَ: قَالَ رَسُوْلُ اللّٰهِ ﷺ: «خَيْرُكُمْ مَنْ تَعْلَّمَ الْقُرْاٰنَ وَعَلَّمَه». رَوَاهُ البُخَارِىُّ

বর্ণনাকারী উসমান (রাঃ)

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমাদের মধ্যে সে ব্যক্তিই উত্তম, যে কুরআন শিক্ষা করে এবং তা (মানুষকে) শিক্ষা দেয়। (বুখারী)[১]

[১] সহীহ : বুখারী ৫০২৭, আবূ দাঊদ ১৪৫২, তিরমিযী ২৯০৭, আহমাদ ৫০০, শু‘আবূল ঈমান ১৭৮৫, সহীহ ইবনু হিব্বান ১১৮, সহীহাহ্ ১১৭৩, সহীহ আত্ তারগীব ১৪১৫, সহীহ আল জামি‘ ৩৩১৯।

মিশকাতুল মাসাবিহ

হাদিস নং ২১১০-[২]

وَعَنْ عُقْبَةَ بْنِ عَامِرٍ قَالَ: خَرَجَ رَسُوْلُ اللّٰهِ ﷺ وَنَحْنُ فِى الصُّفَّةِ فَقَالَ: «أَيُّكُمْ يُحِبُّ أَنْ يَغْدُوَ كُلَّ يَوْم إِلٰى بُطْحَانَ أَو الْعَقِيْقَ فَيَأْتِىْ مِنْهُ بِنَاقَتَيْنِ كَوْمَاوَيْنِ فِىْ غَيْرِ إِثْمٍ وَلَا قَطْعِ رَحِمٍ» فَقُلْنَا يَا رَسُول الله نُحِبُّ ذٰلِكَ قَالَ: «أَفَلَا يَغْدُوْ أَحَدُكُمْ إِلَى الْمَسْجِدِ فَيَعْلَمُ أَوْ يَقْرَأُ اٰيَتَيْنِ مِنْ كِتَابِ اللهِ خَيْرٌ لَه مِنْ نَاقَتَيْنِ وَثَلَاثٍ خَيْرٌ لَه مِنْ ثَلَاثٍ وَأَرْبَعٍ خَيْرٌ لَه مِنْ أَرْبَعٍ وَمِنْ أَعْدَادِهِنَّ مِنَ الْإِبِلِ». رَوَاهُ مُسْلِمٌ

বর্ণনাকারী উকবাহ্ ইবনু ‘আমির (রাঃ)

আমরা (একদিন) মসজিদের প্রাঙ্গণে বসেছিলাম। এ সময়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বের হয়ে আসলেন ও (আমাদেরকে) বললেন, তোমাদের কেউ প্রতিদিন সকালে ‘বুত্বহান’ অথবা ‘আক্বীক’ বাজারে গিয়ে দুইটি বড় কুঁজওয়ালা উটনী কোন অপরাধ সংঘটন ও আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন করা ছাড়া নিয়ে আসতে পছন্দ করবে? এ কথা শুনে আমরা বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আমাদের প্রত্যেকেই এ কাজ করতে পছন্দ করবে।তখন তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ যদি তা-ই হয় তাহলে তোমাদের কেউ কোন মসজিদে গিয়ে সকালে আল্লাহর কিতাবের দুইটি আয়াত (মানুষকে) শিক্ষা দেয় না বা (নিজে) শিক্ষাগ্রহণ করে না কেন? অথচ এ দুইটি আয়াত শিক্ষা দেয়া তার জন্য দুইটি উটনী অথবা তিনটি আয়াত শিক্ষা দেয়া তার জন্য তিনটি উটনী অথবা চারটি আয়াত শিক্ষা দেয়া তার জন্য চারটি উটনীর চেয়েও উত্তম। সারকথা কুরআনের যে কোন সংখ্যক আয়াত, একই সংখ্যক উটনীর চেয়ে উত্তম। (মুসলিম)[১]

[১] সহীহ : মুসলিম ৮০৩, ইবনু আবী শায়বাহ্ ৩০০৭৪, সহীহ আত্ তারগীব ১৪১৮, সহীহ আল জামি‘ ২৬৯৭।

মিশকাতুল মাসাবিহ

হাদিস নং ২১১১-[৩]

وَعَنْ أَبِىْ هُرَيْرَةَ قَالَ: قَالَ رَسُوْلُ اللّٰهِ ﷺ: «أَيُحِبُّ أَحَدُكُمْ إِذَا رَجَعَ إِلٰى أَهْلِه أَنْ يَجِدَ فِيهِ ثَلَاثَ خَلِفَاتٍ عِظَامٍ سِمَانٍ». قُلْنَا: نَعَمْ. قَالَ: «فَثَلَاثُ اٰيَاتٍ يَقْرَأُ بِهِنَّ أَحَدُكُمْ فِىْ صلَاتِه خَيْرٌ لَه مِنْ ثَلَاثِ خَلِفَاتٍ عِظَامٍ سِمَانٍ». رَوَاهُ مُسْلِمٌ

বর্ণনাকারী আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ)

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমাদের কেউ কি নিজ ঘরে ফিরে তিনটি মোটাতাজা গর্ভবতী উটনী পেতে পছন্দ করো? আমরা বললাম, (হে আল্লাহর রাসূল!) নিশ্চয়ই পছন্দ করি। তখন তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, তাহলে তারা যেন সালাতে তিনটি আয়াত পড়ে। এ তিনটি আয়াত তার জন্য তিনটি মোটাতাজা গর্ভবতী উটনী অপেক্ষা উত্তম। (মুসলিম)[১]

[১] সহীহ : মুসলিম ৮০২, ইবনু মাজাহ ৩৭৮২, আহমাদ ১০৪৪৬, শু‘আবূল ঈমান ২০৪৮।

মিশকাতুল মাসাবিহ

হাদিস নং ২১১২-[৪]

وَعَنْ عَائِشَةَ رَضِيَ اللّٰهُ عَنْهَا قَالَتْ: قَالَ رَسُوْلُ اللّٰهِ ﷺ: «الْمَاهِرُ بِالْقُرْاٰنِ مَعَ السَّفَرَةِ الْكِرَامِ الْبَرَرَةِ وَالَّذِىْ يَقْرَأُ الْقُرْاٰنَ وَيَتَتَعْتَعُ فِيهِ وَهُوَ عَلَيْهِ شَاقٌّ لَه أَجْرَانِ». (مُتَّفَقٌ عَلَيْهِ)

বর্ণনাকারী আয়িশাহ্ (রাঃ)

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ কুরআন অধ্যয়নে পারদর্শী ব্যক্তি মর্যাদাবান লিপিকার মালায়িকাহ্’র (ফেরেশ্তাগণের) সাথী হবে। আর যে ব্যক্তি কুরআন অধ্যয়ন করে ও যে এতে আটকে যায় এবং কুরআন তার জন্য কষ্টদায়ক হয়, তাহলে তার জন্য দুইটি পুরস্কার। (বুখারী, মুসলিম)[১]

[১] সহীহ : বুখারী ৪৯৩৭, মুসলিম ৭৯৮, ইবনু মাজাহ ৩৭৭৯, মুসান্নাফ ‘আবদুর রাযযাক্ব ৪১৯৪।

মিশকাতুল মাসাবিহ

হাদিস নং ২১১৩-[৫]

وَعَنِ ابْنِ عُمَرَ قَالَ: قَالَ رَسُوْلُ اللّٰهِ ﷺ: «لَا حَسَدَ إِلَّا عَلٰى اِثْنَيْنِ: رَجُلٌ اٰتَاهُ اللّٰهُ الْقُرْاٰنَ فَهُوَ يَقُومُ بِه اٰنَاءَ اللَّيْلِ وَاٰنَاءَ النَّهَارِ وَرَجُلٌ اٰتَاهُ اللّٰهُ مَالًا فَهُوَ يُنْفِقُ مِنْهُ اٰنَاءَ اللَّيْلِ وَاٰنَاءَ النَّهَارِ». (مُتَّفَقٌ عَلَيْهِ)

বর্ণনাকারী আবদুল্লাহ ইবনু ‘উমার

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ দুইটি ব্যতীত অন্য কোন বিষয়ে ঈর্ষা করা যায় না। প্রথম, সে ব্যক্তি যাকে আল্লাহ কুরআনের (‘ইলম) দান করেছেন, আর সে তা দিন-রাত অধ্যয়ন করে। দ্বিতীয়, ঐ ব্যক্তি যাকে আল্লাহ ধন-সম্পদ দান করেছেন এবং তা সে সকাল সন্ধ্যায় দান করে। (বুখারী, মুসলিম)[১]

[১] সহীহ : বুখারী ৭৫২৯, মুসলিম ৮১৫, ইবনু মাজাহ ৪২০৯, মুসান্নাফ ‘আবদুর রাযযাক্ব ৫৯৭৪, আহমাদ ৪৫৫০, সুনানুল কাবীর লিল বায়হাক্বী ৭৮২১, সহীহ ইবনু হিববান ১২৫, সহীহ আত্ তারগীব ৬৩৫, সহীহ আল জামি‘ ৭৪৮৭।

মিশকাতুল মাসাবিহ

হাদিস নং ২১১৪-[৬]

وَعَنْ أَبِىْ مُوسَى الْأَشْعَرِىِّ قَالَ: قَالَ رَسُوْلُ اللّٰهِ ﷺ: «مَثَلُ الْمُؤمِنِ الَّذِىْ يَقْرَأُ الْقُرْاٰنَ مَثَلُ الْأُتْرُجَّةِ رِيْحُهَا طَيِّبٌ وَطَعْمُهَا طَيِّبٌ وَمَثَلُ الْمُؤْمِنِ الَّذِىْ لَا يقْرَأُ الْقُرْاٰنَ مَثَلُ الْتَّمَرَةِ لَا رِيْحَ لَهَا وَطُعْمُهَا حُلْوٌ وَمَثَلُ الْمُنَافِقِ الَّذِىْ لَا يَقْرَأُ الْقُرْاٰنَ كَمَثَلِ الْحَنْظَلَةِ لَيْسَ لَهَا رِيحٌ وَطَعْمُهَا مُرٌّ وَمَثَلُ الْمُنَافِقِ الَّذِىْ يقْرَأُ الْقُرْاٰنَ مَثَلُ الرَّيْحَانَةِ رِيْحُهَا طَيِّبٌ وَطَعْمُهَا مَرٌّ». مُتَّفَقٌ عَلَيْهِ. وَفِىْ رِوَايَةٍ: «الْمُؤْمِنُ الَّذِىْ يَقْرَأُ الْقُرْاٰنَ وَيَعْمَلُ بِه كَالْأُتْرُجَّةِ وَالْمُؤْمِنُ الَّذِىْ لَا يَقْرَأُ الْقُرْاٰنَ وَيَعْمَلُ بِه كَالتَّمْرَةِ

বর্ণনাকারী আবূ মূসা আল আশ্‘আরী (রাঃ)

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ কুরআন পাঠকারী মু’মিনের দৃষ্টান্ত হলো তুরঞ্জ ফল বা কমলা লেবুর ন্যায়। যার গন্ধ ভাল, স্বাদও উত্তম। যে মু’মিন কুরআন পড়ে না, তার দৃষ্টান্ত হলো খেজুরের ন্যায়। এর কোন গন্ধ নেই বটে, কিন্তু উত্তম স্বাদ আছে। কুরআন পাঠ করে না যে মুনাফিক, সে হানাযালাহ্ (তিতা) ফলের মতো, যার কোন গন্ধ নেই অথচ স্বাদ তিতা। আর ওই মুনাফিক যে কুরআন পড়ে তার দৃষ্টান্ত ঐ ফুলের মতো, যার গন্ধ আছে কিন্তু স্বাদ তিতা। (বুখারী, মুসলিম।)অন্য এক বর্ণনায় আছে, যে মু’মিন, কুরআন পড়ে ও সে অনুযায়ী ‘আমাল করে সে কমলা লেবুর মতো। আর যে মু’মিন কুরআন পড়ে না, কিন্তু এর উপর ‘আমাল করে সে খেজুরের মতো।)[১]

[১] সহীহ : বুখারী ৫৪২৭, ৫০৫৯, মুসলিম ৭৯৭, তিরমিযী ২৮৬৫, নাসায়ী ৫০৩৮, ইবনু মাজাহ ২১৪, আহমাদ ১৯৫৪৯, সহীহ ইবনু হিব্বান ৭৭০, সহীহ আত্ তারগীব ১৪১৯।

মিশকাতুল মাসাবিহ

হাদিস নং ২১১৫-[৭]

وَعَنْ عُمَرَ بْنِ الْخَطَّابِ قَالَ: قَالَ رَسُوْلُ اللّٰهِ ﷺ: «إِنَّ اللهَ يَرْفَعُ بِهٰذَا الْكِتَابِ أَقْوَامًا وَيَضَعُ بِه اٰخَرِينَ. رَوَاهُ مُسْلِمٌ

বর্ণনাকারী ‘উমার ইবনুল খাত্ত্বাব (রাঃ)

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আল্লাহ তা‘আলা এ কিতাব কুরআনের মাধ্যমে কোন কোন জাতিকে উন্নতি দান করেন। আবার অন্যদেরকে করেন অবনত। (মুসলিম)[১]

[১] সহীহ : মুসলিম ৮১৭, ইবনু মাজাহ ২১৮, আহমাদ ২৩২, দারিমী ৩৪০৮, সুনানুল কুবরা লিল বায়হাক্বী ৫১২৫, শু‘আবূল ঈমান ২৪২৮, সহীহাহ্ ২২৩৯।

মিশকাতুল মাসাবিহ

হাদিস নং ২১১৬-[৮]

وَعَنْ أَبِىْ سَعِيدٍ الْخُدْرِىِّ أَنَّ أُسَيْدَ بنَ حُضَيْرٍ قَالَ: بَيْنَمَا هُوَ يَقْرَأُ مِنَ اللَّيْلِ سُورَةَ الْبَقَرَةِ وَفَرَسُه مَرْبُوطَةٌ عِنْدَه إِذْ جَالَتِ الْفَرَسُ فَسَكَتَ فَسَكَتَتْ فَقَرَأَ فَجَالَتِ الْفَرَسُ فَسَكَتْ فَسَكَنَتْ، ثُمَّ قَرَأَ فَجَالَتِ الْفَرَسُ فَانْصَرَفَ وَكَانَ ابْنُه يَحْيٰى قَرِيْبًا مِنْهَا فأَشْفَقَ أَنْ تُصِيْبَه فَلَمَّا أَخَّرَه رَفَعَ رَأْسَه إِلَى السَّمَاءِ فَإِذَا مِثْلُ الظُّلَّةِ فِيهَا أَمْثَالُ الْمَصَابِيحِ فَلَمَّا أَصْبَحَ حَدَّثَ النَّبِىَّ ﷺ فَقَالَ: «اِقْرَأْ يَا ابْنَ حُضَيْرٍ اقْرَأْ يَا ابْنَ حُضَيْرٍ». قَالَ فَأَشْفَقْتُ يَا رَسُوْلَ اللّٰهِ أَنْ تَطَأَ يَحْيٰى وَكَانَ مِنْهَا قَرِيْبًا فَانْصَرَفْتُ إِلَيْهِ وَرَفَعْتُ رَأْسِىْ إِلَى السَّمَاءِ فَإِذَا مِثْلُ الظُّلَّةِ فِيهَا أَمْثَالُ الْمَصَابِيحِ فَخَرَجَتْ حَتّٰى لَا أَرَاهَا قَالَ: «وَتَدْرِىْ مَا ذَاكَ؟» قَالَ لَا قَالَ: «تِلْكَ الْمَلَائِكَةُ دَنَتْ لِصَوْتِكَ وَلَوْ قَرَأْتَ لَأَصْبَحَتْ يَنْظُرُ النَّاسُ إِلَيْهَا لَا تَتَوَارٰى مِنْهُمْ». مُتَّفَقٌ عَلَيْهِ. وَاللَّفْظُ لِلْبُخَارِىِّ وَفِىْ مُسْلِمٍ: «عَرَجَتْ فِى الْجَوِّ» بَدَلَ: «فَخَرَجْتُ عَلٰى صِيغَةِ الْمُتَكَلِّمِ

বর্ণনাকারী আবূ সা‘ঈদ আল্ খুদরী (রাঃ)

উসায়দ ইবনু হুযায়র (রাঃ) বলেন, এক রাতে তিনি সূরা আল বাকারাহ্ পড়ছিলেন। তাঁর ঘোড়া তাঁর কাছেই বাঁধা ছিল। হঠাৎ ঘোড়াটি লাফিয়ে উঠল। তিনি ঘোড়াটিকে চুপ করালেন। ঘোড়াটি চুপ হলো। তিনি আবার পড়তে লাগলেন। ঘোড়াটি আবার লাফিয়ে উঠল। তিনি ঘোড়াটিকে শান্ত করলেন। আবার পড়তে লাগলেন। আবার ঘোড়াটি লাফিয়ে উঠল। এবার তিনি থেমে গেলেন। কারণ তখন তাঁর ছেলে ইয়াহ্ইয়া ঘোড়াটির কাছাকাছি ছিল। তিনি ওর ক্ষতির আশংকা করলেন। তারপর তিনি তাকে দূরে সরিয়ে নিয়ে আকাশের দিকে মাথা উঠালেন। দেখলেন, (আকাশে) সামিয়ানার মতো (কি একটা ঝুলছে)। আর এতে যেন অনেক বাতি রয়েছে। ভোরে উঠে তিনি তা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে জানালেন।(ঘটনা) শুনে তিনি বললেন, তুমি পড়তে থাকলে না কেন ইবনু হুযায়র? তুমি পড়তে থাকলে না কেন? ইবনু হুযায়র বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমার ঘোড়া ইয়াহ্ইয়া-কে মাড়িয়ে দেবার ভয় করছিলাম। সে ছিল ঘোড়াটির কাছাকাছি। তাই পড়া বন্ধ করে তার কাছে গেলাম। আবার আকাশের দিকে মাথা উঠালাম। দেখলাম, সামিয়ানার মতো, এতে প্রদীপের মতো কিছু আছে। তারপর আমি ওখান থেকে বের হলাম। আর তা ধীরে ধীরে অদৃশ্য হয়ে গেল।(এসব) শুনে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ এসব কি ছিল জানো? উসায়দ বললেন, জি না, হে আল্লাহর রাসূল! তিনি বললেন, এটা ছিল মালায়িকাহর (ফেরেশতাগণের) দল। তাঁরা তোমার তিলাওয়াত শুনে তোমার নিকটবর্তী হচ্ছিলেন। তুমি যদি পড়তে থাকতে, ভোর পর্যন্ত তাঁরা ওখানে থাকতেন। লোকেরা তাঁদেরকে দেখতে পেত। মানুষ হতে তাঁরা লুকিয়ে থাকত না। (বুখারী, মুসলিম। তবে মতন বুখারীর। মুসলিম-এর বর্ণনায় রয়েছে, ‘সামিয়ানা শূন্যে উঠে গেল,’ ‘আমি বের হলাম’-এর স্থলে।)[১]

[১] সহীহ : বুখারী ৫০১৮, মুসলিম ৭৯৬, শু‘আবূল ঈমান ২৪২৬।

মিশকাতুল মাসাবিহ

হাদিস নং ২১১৭-[৯]

وَعَنِ الْبَرَاءِ بْنِ عَازِبٍ قَالَ: كَانَ رَجُلٌ يَقْرَأُ سُورَةَ الْكَهْفِ وَإِلٰى جَانِبِه حِصَانٌ مَرْبُوطٌ بِشَطَنَيْنِ فَتَغَشَّتْهُ سَحَابَةٌ فَجَعَلَتْ تَدْنُوْ وَتَدْنُوْ وَجَعَلَ فَرَسُه يَنْفِرُ فَلَمَّا أَصْبَحَ أَتَى النَّبِىَّ ﷺ فَذَكَرَ ذٰلِكَ لَه فَقَالَ: «تِلْكَ السَّكِيْنَةُ تَنَزَّلَتْ بِالْقُرْاٰنِ». (مُتَّفَقٌ عَلَيْهِ)

বর্ণনাকারী বারা ইবনু ‘আযিব (রাঃ)

এক ব্যক্তি সূরা ‘আল কাহাফ’ পড়ছিল। দুইটি রশি দিয়ে তার ঘোড়া পাশেই বাঁধা ছিল। এমন সময় এক খণ্ড মেঘ তাকে ঢেকে নিলো। মেঘখণ্ডটি ধীরে ধীরে তার নিকটতর হতে লাগল। আর তার ঘোড়াটি লাফাতে লাগল। সে ভোরে উঠে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে এসে এ ঘটনা তাঁকে জানাল। (তিনি ঘটনা শুনে) বললেন, এটা ছিল রহমত, যা কুরআনের কারণে নেমে এসেছিল। (বুখারী, মুসলিম)[১]

[১] সহীহ : বুখারী ৫০১১, মুসলিম ৭৯৫, শু‘আবূল ঈমান ২২১৭।

মিশকাতুল মাসাবিহ

হাদিস নং ২১১৮-[১০]

وَعَنْ أَبِىْ سَعِيدٍ بْنِ الْمُعَلّٰى قَالَ: كُنْتُ أُصَلِّىْ فِى الْمَسْجِدِ فَدَعَانِى النَّبِىُّ ﷺ فَلَمْ أُجِبْهُ حَتّٰى صَلَّيْتَ ثُمَّ أَتَيْتُه. فَقُلْتُ يَا رَسُوْلَ اللّٰهِ إِنِّىْ كُنْتُ أُصَلِّىْ فَقَالَ أَلَمْ يَقُلِ اللّٰهُ (اسْتَجِيبُوا لِلّٰهِ وَلِلرَّسُولِ إِذَا دعَاكُمْ). ثُمَّ قَالَ : «أَلَا أُعَلِّمُكَ أَعْظَمَ سُورَةٍ فِى الْقُرْاٰنِ قَبْلَ أَنْ تَخْرُجَ مِنَ الْمَسْجِدِ». فَأَخَذَ بِيَدِىْ فَلَمَّا أَرَدْنَا أَنْ نَخْرُجَ قُلْتُ يَا رَسُوْلَ اللهِ! إِنَّكَ قُلْتَ لَأُعَلِّمَنَّكَ أَعْظَمَ سُورَةٍ مِنَ الْقُرْاٰنِ قَالَ: ﴿الْحَمْدُ لِلّٰهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ﴾. هِىَ السَّبْعُ الْمَثَانِىْ وَالْقُرْاٰنُ الْعَظِيمُ الَّذِىْ أُوتِيْتُه. رَوَاهُ البُخَارِىُّ

বর্ণনাকারী আবূ সা‘ঈদ ইবনু মু‘আল্লা (রাঃ)

বলেন, মসজিদে আমি সালাত আদায় করছিলাম। এ সময় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে ডাকলেন। সালাত শেষ না হওয়া পর্যন্ত আমি উত্তর দিলাম না। এরপর আমি তাঁর কাছে গিয়ে বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আমি সালাত আদায় করছিলাম। তখন তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, আল্লাহ কি এ কথা বলেননি যে, যখন আল্লাহ ও আল্লাহর রাসূল ডাকেন তখন তাঁদের ডাকের জবাব দাও? অতঃপর তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, মসজিদ হতে বের হবার আগে আমি কি তোমাকে (পড়ার জন্য) শ্রেষ্ঠতর সূরাটি শিখাব না?এরপর তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আমার হাত ধরলেন। তারপর আমরা মসজিদ হতে বের হতে চাইলে, আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি তো বলেছিলেন, ‘‘আমি কি তোমাকে কুরআনের শ্রেষ্ঠ সূরা শিখাব না?’’ তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, এটি হলো সূরা ‘‘আলহামদু লিল্লা-হি রব্বিল ‘আ-লামীন’’। এ সূরাই (পুনঃ পুনঃ আবৃত্ত) সে সাতটি আয়াত (সাব্‘উল মাসানী) ও মহা কুরআন, যা আমাকে দেয়া হয়েছে। (বুখারী)[১]

[১] সহীহ : বুখারী ৪৪৭৪, ইবনু মাজাহ ৩৭৮৫, আহমাদ ১৭৮৫১, ইবনু মাজাহ ৮৬২, সুনানুল কুবরা লিল বায়হাক্বী ১৩৩৯৭, সহীহ আল জামি‘ ১৪৫২, আবূ দাঊদ ১৪৫৮, নাসায়ী ৯১৩।

সেটিংস
আরবি ফন্ট ফেস
আরবি ফন্ট সাইজ

32

অনুবাদের ফন্ট সাইজ

18