জাল জয়ীফ হাদিস সিরিজ (১-১০০) নং হাদিস

১/১. অধ্যায়ঃ

১ থেকে ১০০ নং হাদিস

জাল জয়িফ হাদিস সিরিজ

হাদিস নং ১

الدين هو العقل، ومن لا دين له لا عقل له

বর্ণনাকারী বর্ণনাকারী

দ্বীন [ধর্ম] হচ্ছে বিবেক, যার দ্বীন [ধর্ম] নেই তার কোন বিবেক নেই।হাদীসটি বাতিল।হাদীসটি নাসাঈ “আল-কুনা” গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন এবং তার থেকে দুলাবী “আল-কুনা ওয়াল আসমা” গ্রন্থে (২/১০৪) আবূ মালেক বিশ্‌র ইবনু গালিব সূত্রে যুহরী হতে... প্রথম বাক্যটি ছাড়া মারফু’ হিসাবে বর্ণনা করেছেন।ইমাম নাসাঈ হাদীসটি সম্পর্কে বলেনঃ (আরবী) এ হাদীসটি বাতিল, মুনকার।আমি (আলবানী) বলছিঃ হাদীসটির সমস্যা হচ্ছে এ বিশর নামক বর্ণনাকারী। কারণ আযদী বলেন : তিনি মাজহূল [অপরিচিত] বর্ণনাকারী। ইমাম যাহাবী “মীযানুল ই’তিদাল” এবং ইবনু হাজার আসকালানী “লিসানুল মীযান” গ্রন্থে তার কথাকে সমর্থন করেছেন।হারিস ইবনু আবী উসামা তার “মুসনাদ” গ্রন্থে (কাফ ১০০/১-১০৪/১) দাউদ ইবনু্ল মুহাব্বার সূত্রে বিবেকের ফযীলত সম্পর্কে ত্রিশের অধিক হাদীস উল্লেখ করেছেন।হাফিয ইবনু হাজার আসকালানী বলেনঃ সে সবগুলোই জাল (বানোয়াট)।সেগুলোর একটি হচ্ছে এ হাদীসটি যেমনটি সুয়ূতী তার “যায়লুল-লাআলিল মাসনূ’য়াতি ফিল আহাদীছিল মাওযূ’আত” গ্রন্থে (পৃ : ৪-১০) উল্লেখ করেছেন : তার থেকে হাদীসটি আল্লামা মুহাম্মাদ তাহির আল-হিন্দী মাওযূ’ গ্রন্থ “তাযকিরাতুল মাওযূ’আত”-এর মধ্যে (পৃ: ২৯-৩০) উল্লেখ করেছেন।দাউদ ইবনুল মুহাব্বার সম্পর্কে যাহাবী বলেন :ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বাল বলেন : হাদীস কী তিনি তাই জানতেন না। আবূ হাতিম বলেন : তিনি যাহেবুল হাদীস [হাদীসকে বিতাড়নকারী], নির্ভরযোগ্য নন। দারাকুতনী বলেনঃ তিনি মাতরূক [অগ্রহণযোগ্য ব্যক্তি]। আব্দুল গনী ইবনু সা’ঈদ দারাকুতনী হতে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেনঃ মায়সারা ইবনু আব্দি রাব্বিহি “আল-আকল” নামক গ্রন্থ রচনা করেন আর তার নিকট হতে দাউদ ইবনুল মুহাব্বার তা চুরি করেন। অতঃপর তিনি তার (মায়সারার) সনদের পরিবর্তে নিজের বানোয়াট সনদ জড়িয়ে দেন। এরপর তা চুরি করেন আব্দুল আযীয ইবনু আবূ রাজা এবং সুলায়মান ইবনু ঈসা সাজযী।মোটকথা বিবেকের ফযীলত সম্পর্কে কোন সহীহ হাদীস নেই। এ সম্পর্কে বর্ণিত হাদীস হয় দুর্বল, না হয় জাল (বানোয়াট)।আল্লামা ইবনুল কাইয়্যিম “আল-মানার” গ্রন্থে বলেনঃ (পৃ: ২৫) (আরবী) ‘বিবেক সম্পর্কে বর্ণিত সকল হাদীস মিথ্যা।’

জাল জয়িফ হাদিস সিরিজ

হাদিস নং ২

(من لم تنهه صلاته عن الفحشاء والمنكر لم يزدد من الله إلا بعدا) .باطل.

বর্ণনাকারী বর্ণনাকারী

যে ব্যক্তির সলাত তাকে তার নির্লজ্জ ও অশোভনীয় কাজ হতে বিরত করে না, আল্লাহর নিকট হতে তার শুধু দূরত্বই বৃদ্ধি পায়।হাদীসটি বাতিল।যদিও হাদীসটি মানুষের মুখে মুখে প্রসিদ্ধি লাভ করেছে তবুও সেটি সনদ এবং ভাষা উভয় দিক দিয়েই সহীহ নয়।সনদ সহীহ না হওয়ার কারণঃ হাদীসটি তাবারানী “আল মু’জামুল কাবীর” গ্রন্থে (৩/১০৬/২), কাযা’ঈ “মুসনাদুশ শিহাব” গ্রন্থে (২/৪৩) এবং ইবনু আবী হাতিম বর্ণনা করেছেন, যেমনটি “তাফসীর ইবনু কাসীর” গ্রন্থে (২/৪১৪) এবং “আল কাওয়াকাবুদ দুরারী” গ্রন্থে (৮৩/২/১) লাইস সূত্রে তাউস-এর মাধ্যমে ইবনু আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত হয়েছে।এ লাইসের কারণে হাদীসটির সনদ দুর্বল –তিনি হচ্ছেন লাইস ইবনু আবী সুলাইম- কারণ তিনি দুর্বল বর্ণনাকারী।হাফিয ইবনু হাজার “তাকরীবুত তাহযীব” গ্রন্থে তার জীবনী লিখতে গিয়ে বলেনঃ তিনি সত্যবাদী, কিন্তু শেষ জীবনে তার মস্তিষ্ক বিকৃতি ঘটেছিল। তার হাদীস পৃথক করা যেত না, ফলে তার হাদীস মাতরূক [অগ্রহণযোগ্য]।হায়সামী “মাজমা’উয যাওয়াইদ” গ্রন্থে তার (১/১৩৪) একই কারণ উল্লেখ করেছেন। তার শাইখ হাফিয আল-ইরাকী “তাখরীজুল ইহইয়া” গ্রন্থে (১/১৪৩) বলেছেন : হাদীসটির সনদ লাইয়েনুন (দুর্বল)।আমি (আলবানী) বলছি : হাদীসটি ইবনু জারীর তার “তাফসীর” গ্রন্থে (২০/৯২) ইবনু আব্বাস (রাঃ) হতে অন্য সূত্রে মওকূফ হিসাবে বর্ণনা করেছেন। সম্ভবত এটিই সহীহ্ অর্থাৎ সাহাবীর কথা। যদিও তার সনদে এমন ব্যক্তি রয়েছেন যার নাম উল্লেখ করা হয়নি।ইমাম আহমাদ “কিতাবুল যুহুদ” গ্রন্থে (পৃ: ১৫৯) আর তাবারানী “মু’জামুল কাবীর” গ্রন্থে হাদীসটি ইবনু মাস’ঊদ (রাঃ) হতে মওকূফ হিসাবে ভিন্ন ভাষায় বর্ণনা করেছেন।হাফিয ইরাকী বলেন : তার সনদটি সহীহ্। অতএব হাদীসটি মওকূফ।ইবনুল আ’রাবী তার “আল-মু’জাম” গ্রন্থে (১/১৯৩) হাদীসটি হাসান বাসরী হতে মুরসাল হিসাবে বর্ণনা করেছেন। কিন্তু হাসান হচ্ছেন মুদাল্লিস।হাফিয যাহাবী “মীযানুল ই’তিদাল” গ্রন্থে বলেনঃতিনি বেশী বেশী তাদলীস করতেন। তিনি (আরবী) আন শব্দে বর্ণনা করলে তার হাদীস দ্বারা দলীল গ্রহণ করাটা দুর্বল হয়ে যায়। আবূ হুরাইরা (রাঃ) হতে তার শ্রবণ সাব্যস্ত হয়নি। এ কারণে মুহাদ্দিসগণ আবূ হুরাইরা (রাঃ) হতে তার হাদীসকে মুনকাতি’ হিসাবে গণ্য করেছেন।তবে হাসান বাসরীর নিজের কথা হিসাবে হাদীসটি বর্ণিত হয়েছে। তিনি নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন এমন কথা বলেননি। ইমাম আহমাদ “আল-যুহুদ” গ্রন্থে (পৃ:২৬৪) এভাবেই বর্ণনা করেছেন আর তার সনদটি সহীহ। অনুরূপ ভাবে ইবনু জারীরও বিভিন্ন সূত্রে তার থেকেই (২০/৯২) বর্ণনা করেছেন এবং এটিই সঠিক।“মুসনাদুশ শিহাব” গ্রন্থে (২/৪৩) মিকদাম ইবনু দাঊদ সূত্রে হাসান বাসরী হতে মারফূ’ হিসাবে বর্ণিত হয়েছে।কিন্তু এই মিকদাম সম্পর্কে নাসাঈ বলেনঃ তিনি নির্ভরযোগ্য নন।মোটকথা নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) পর্যন্ত এটির সনদ সহীহ নয়। ইবনু মাসঊদ (রাঃ) এবং হাসান বাসরী হতে সহীহ সনদে বর্ণিত হয়েছে। ইবনু আব্বাস (রাঃ) হতেও বর্ণনা করা হয়েছে।এ কারণেই ইবনু তাইমিয়্যা “কিতাবুল ঈমান” গ্রন্থে (পৃঃ ১২) মওকূফ হিসাবেই উল্লেখ করেছেন।ইবনু উরওয়াহ্ “আল-কাওয়াকিব” গ্রন্থে বলেছেন : এটিই বেশী সঠিক।ভাষার দিক দিয়ে সহীহ না হওয়ার কারণঃহাদীসটি যে ব্যক্তি সলাতের শর্ত এবং আরকান সমূহের দিকে যত্নবান হয়ে যথাযথভাবে আদায় করে সে ব্যক্তিকেও সম্পৃক্ত করে। অথচ শারী’য়াত তার সলাতকে বিশুদ্ধ বলে রায় প্রদান করেছে। যদিও এ মুসল্লী কোন গুনাহের সাথে জড়িত থাকে। অতএব কীভাবে এ সলাতের কারণে তার সাথে আল্লাহর দূরত্ব বৃদ্ধি পাবে? এটি বিবেক বর্জিত কথা। শারী’য়াত এ কথার সাক্ষ্য দেয় না। হাদীসটি মওকূফ হওয়ার ক্ষেত্রেও সলাত দ্বারা এমন সলাতকে বুঝানো হয়েছে যে সলাতে এমন কোন অংশ ছেড়ে দেয়া হয়েছে যা ছেড়ে দিলে সলাত শুদ্ধ হয় না।আল্লাহ (আরবী) বলেনঃ (আরবী) অর্থঃ ‘নিশ্চয় সলাত নির্লজ্জ ও অশোভনীয় কাজ হতে বিরত রাখে।’ (আনকাবুতঃ ৪৫)।রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে যখন জিজ্ঞেস করা হয়েছিল অমুক ব্যক্তি সারা রাত ধরে ইবাদাত করে অতঃপর যখন সকাল হয় তখন সে চুরি করে। উত্তরে তিনি উক্ত আয়াতের গুরুত্ব দিয়ে বলেছিলেন :‘তুমি যা বলছ তা থেকে অচিরেই তাকে তার সলাত বিরত করবে অথবা বলেন : তাকে তার সলাত বাধা প্রদান করবে।’হাদীসটি ইমাম আহমাদ, বায্‌যার, তাহাবী “মুশকিলুল আসার” গ্রন্থে (২/৪৩০), বাগাবী “হাদীসু আলী ইবনুল যা’আদ” গ্রন্থে (৯/৯৭/১) এবং আবূ বাক্‌র কালাবাযী “মিফতাহু মা’য়ানীল আসার” গ্রন্থে (৩১/১/৬৯/১) সহীহ্ সনদে আবূ হুরাইরাহ্ (আরবী) হতে বর্ণনা করেছেন।লক্ষ্য করুন! রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সংবাদ দিয়েছেন যে, এ ব্যক্তি তার সলাতের কারণে চুরি করা থেকে বিরত থাকবে (যদি তার সলাতটি যথাযথ ভাবে হয়)। তিনি বলেননি যে, তার দূরত্ব বৃদ্ধি করবে, যদিও সে তার চুরি হতে বিরত হয়নি। এ কারণেই আব্দুল হক ইশবীলী “আত-তাহাজ্জুদ” গ্রন্থে (কাফ- ১/২৪) বলেন :সত্যিকার অর্থে যে ব্যক্তি সলাত আদায় করবে এবং সলাতকে আঁকড়ে ধরে রাখবে, তার সলাত তাকে হারামে জড়িত হওয়া এবং হারামে পতিত হওয়া থেকে বিরত রাখবে।অতএব প্রমাণিত হচ্ছে যে, হাদীসটি সনদ এবং ভাষা উভয় দিক দিয়েই দুর্বল।এছাড়া আহমাদ ইবনু মুহাম্মাদ ইয্‌যুদ্দীন ইবনু আব্দিস সালাম ইবনু আব্বাস (‌রাঃ)-এর আসারটি উল্লেখ করে বলেছেন : এ ধরনের হাদীসকে ভীতি প্রদর্শনমূলক হাদীস হিসাবে গণ্য করা বাঞ্ছনীয়।এ হাদীসকে তার বাহ্যিক অর্থে নেয়া সঠিক হবে না। কারণ তার বাহ্যিক অর্থ সহীহ্ হাদীসে যা সাব্যস্ত হয়েছে তার বিপরীত অর্থ বহন করছে। সহীহ্ হাদীসে বলা হয়েছে যে, সলাত গুনাহ্ সমূহকে মোচন করে, অতএব আল্লাহ্ সাথে দূরত্ব বৃদ্ধি করলে সলাত কীভাবে গুনাহ্ মোচনকারী হতে পারে?আমি (আলবানী) বলছিঃ এরূপ ব্যাখ্যা করা যেতে পারে তবে মওকূফ হিসাবে গণ্য করে, রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর বাণী হিসাবে নয়।উপরের আলোচনার সাক্ষ্য দেয় বুখারীতে বর্ণিত হাদীস। এক ব্যক্তি কোন মহিলাকে চুমু দিয়ে দেয়। অতঃপর সে রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নিকট ঘটনাটি উল্লেখ করলে আল্লাহ তা’আলা নিম্নোক্ত আয়াতটি নাযিল করেন : (আরবী) “নিঃসন্দেহে সৎ কর্মগুলো অসৎ কর্মগুলোকে মুছে ফেলে” (হুদ:১১৪)হাফিয যাহাবী “আল-মীযান” গ্রন্থে (৩/২৯৩) ইবনুয যুনায়েদ হতে বর্ণনা করে (আলোচ্য) হাদীসটি সম্পর্কে বলেন : এটি মিথ্যা।

জাল জয়িফ হাদিস সিরিজ

হাদিস নং ৩

" همة الرجال تزيل الجبال ".ليس بحديث.

বর্ণনাকারী বর্ণনাকারী

পুরুষদের ইচ্ছা (মনোবল) পর্বতমালাকে স্থানচ্যুত করতে পারে।এটি হাদীস নয়।ইসমাঈল আজলুনী “কাশফুল খাফা” গ্রন্থে বলেন :এটি যে হাদীস তা অবহিত হতে পারিনি। তবে কোন ব্যক্তি শাইখ আহমাদ গাযালীর উদ্ধৃতিতে বলেছেন যে, রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেনঃ (আরবী) ‘পুরুষদের মনোবল পর্বতমালার উচ্ছেদ ঘটাতে পারে’।আমি (আলবানী) বলছি : সুন্নাতের গ্রন্থগুলো খুঁজেছি এর (হাদীসটির) কোন অস্তিত্ব পাইনি। শাইখ আহমাদ গাযালী কর্তৃক হাদীস বলে উল্লেখ করাটা তাকে সাব্যস্ত করে না। কারণ তিনি মুহাদ্দিসগণের দলভুক্ত নন, বরং তিনি তার ভাই মুহাম্মাদের ন্যায় সূফী সম্প্রদায়ভুক্ত একজন ফাকীহ্ ছিলেন। তার ভাই কর্তৃক রচিত “আল-ইহইয়া” গ্রন্থে কতইনা হাদীস নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর উদ্ধৃতিতে দৃঢ়তার সাথে বলা হয়েছে এগুলো হাদীস। অথচ সেগুলোর কোন ভিত্তিই নেই। যেমনিভাবে হাফিয ইরাকী ও আরো অনেকে বলেছেন। সেগুলোর একটি নিম্নের হাদীসটি :

জাল জয়িফ হাদিস সিরিজ

হাদিস নং ৪

(الحديث فى المسجد يأكل الحسنات كما تأكل البهائم الحشيش) .لا أصل له.

বর্ণনাকারী বর্ণনাকারী

মসজিদের মধ্যে কথপোকথন পূণ্যগুলোকে খেয়ে ফেলে যেমনভাবে চতুষ্পদ জন্তুগুলো ঘাস খেয়ে ফেলে।হাদীসটি ভিত্তিহীন।গাযালী এটি “আল-ইহইয়া” গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন। (১/১৩৬)। অথচ তার কোন ভিত্তি নেই।হাফিয ইরাকী বলেন : তার কোন ভিত্তি সম্পর্কে অবহিত হইনি।হাফিস ইবনু হাজার “তাখরীজুল কাশ্‌শাফ” গ্রন্থে ভিত্তি না থাকাকে (৭৩/৯৩, ১৩০/১৭৬) আরো সুষ্পষ্ট করেছেন।আব্দুল ওয়াহাব সুবকী “তাবাকাতুশ-শাফে’ঈয়াহ” গ্রন্থে (৪/১৪৫-১৪৭) বলেছেন: তার কোন সনদ পাইনি।লোকদের মুখে মুখে প্রসিদ্ধি লাভ করেছে যে, মসজিদের মধ্যে বৈধ কথা সৎ কর্মগুলোকে খেয়ে ফেলে যেমনভাবে খড়িকে আগুন খেয়ে ফেলে।এটি ও উপরেরটির মধ্যে কোন পার্থক্য নেই।

জাল জয়িফ হাদিস সিরিজ

হাদিস নং ৫

(ما ترك عبد شيئا لله لا يتركه إلا لله إلا عوضه منه ما هو خير له فى دينه ودنياه) .موضوع بهذا اللفظ.

বর্ণনাকারী বর্ণনাকারী

কোন বান্দা একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যে যখন কিছু ত্যাগ করে, তখন আল্লাহ তাকে তার দ্বীন ও দুনিয়াবী ক্ষেত্রে তার চাইতেও অতি কল্যাণকর বস্তু প্রতিদান হিসাবে দান করেন।এ ভাষায় হাদীসটি বানোয়াট।আমি (আলবানী) বলছি : হাদীসটি ১৩৭৯ হিজরী সনের রমাযান মাসে রেডিও দামেস্কে প্রচারিত কোন এক সম্মানিত ব্যক্তির বক্তব্যে শুনি।হাদীসটি আবূ নো’য়াইম “হিলইয়াতুল আওলিয়া” গ্রন্থে (২/১৯৬), দাইলামী “আল-গারাইয়েবুল মুলতাকাতাহ” গ্রন্থে, আস-সিলাফী “আত-তায়ূরীয়াত” গ্রন্তে (২/২০০) এবং ইবনু আসাকির (৩/২০৮/২, ১৫/৭০/১) আবদুল্লাহ ইবন সা’দ আর-রাকী সূত্রে .........বর্ণনা করেছেন।অত:পর আবূ নু’য়াইম বলেন : হাদীসটি গারীব।আমি (আলবানী বলছি : হাদীসটির সনদ বানোয়াট, কারণ হাদীসটির সনদে বর্ণিত যুহরীর নিচের বর্ণনাকারীগণের মধ্য থেকে আব্দুল্লাহ ইবনু সা’দ আর-রাকী ব্যতীত অন্য কোন বর্ণনাকারীর বিবরণ হাদীসগ্রন্থসমূহে মিলে না। তিনি পরিচিত, তবে মিথ্যুক হিসাবে। হাফিয যাহাবী “মীযানুল ই’তিদাল” গ্রন্থে এবং তার অনুসরণ করে হাফিয ইবনু হাজার আসকালানী “লিসানুল মীযান” গ্রন্থে বলেন :(আরবি) দারাকুতনী তাকে মিথ্যুক আখ্যা দিয়েছেন। তিনি আরো বলেছেন : তিনি হাদীস জাল করতেন। আর আহমাদ ইবনু আব্দান তাকে খুবই দুর্বল আখ্যা দিয়েছেন।হাদীসটিতে অন্য একটি সমস্যা রয়েছে, সেটি হচ্ছে বাক্বার ইবনু মুহাম্মাদ। তিনি মাজহূল (অপরিচিত)। ইবনু আসাকির তার জীবনীতে তার সম্পর্কে ভাল মন্দ কিছুই বলেনি।তব্যে হ্যাঁ হাদীসটি (আরবি) এ শব্দ ছাড়া সহীহ। যা ওয়াকী’ “আল-যুহুদ” নামক গ্রন্থে (২/৬৮/২) এবং তার থেকে ইমাম আহমাদ (৫/৩৬৩) ও কাযা’ঈ “মুসনাদুশ শিহাব” গ্রন্থে (১১৩৫) নিম্নের ভাষায় উল্লেখ করেছেন :(আরবি)‘তুমি আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের উদ্দেশ্যে কিছু ত্যাগ করলে অবশ্যই আল্লাহ তার প্রতিদান হিসাবে তোমাকে তার চেয়ে উত্তম কিছু দান করবেন’।ইমাম মুসলিমের শর্তানুযায়ী হাদীসটির সনদ সহীহ।হাদীসটি ইসপাহানীও “আত-তারগীব” গ্রন্থে (১/৭৩) বর্ণনা করেছেন। অত:পর তিনি উবাই ইবনু কা’ব (রাঃ) হতে তার একটি শাহেদ [সাক্ষীমূলক] হাদীস এমন এক সনদে বর্ণনা করেছেন, শাহেদ হওয়ার ক্ষেত্রে যাতে কোন সমস্যা নেই।

জাল জয়িফ হাদিস সিরিজ

হাদিস নং ৬

" تنكبوا الغبار فإنه منه تكون النسمة ".لا أعلم له أصلا.

বর্ণনাকারী বর্ণনাকারী

ধূলিকণা হতে তোমরা বেঁচে চল, কারণ ধূলিকণা হতেই জীবাণু সৃষ্টি হয়।হাদীসটির কোন ভিত্তি নেই।ইবনুল আসীর (আরবি) মাদ্দায় “আন-নেহায়া” গ্রন্থে হাদীসটি উল্লেখ করে বলেছেন যে, এটি হাদীস! কিন্তু মারফূ হিসাবে এটির কোন ভিত্তি সম্পর্কে জানি না।তবে আমর ইবনুল ‘আস (রাঃ) হতে মাওকূফ হিসাবে ইবনু সা’দ “তাবাকাতুল কুবরা” গ্রন্থে (৮/২/১৯৮) বর্ণনা করেছেন।তা সত্ত্বেও কয়েকটি কারণে সনদের দিক থেকে হাদীসটি সহীহ নয় :১। ইবনু সা’দ মাধ্যম হিসাবে তার শাইখের নাম উল্লেখ করেননি। অর্থ্যাত মু’য়াল্লাক হিসাবে বর্ণনা করেছেন।২। এছাড়া সনদে উল্লেখিত আব্দুল্লাহ ইবনু সালেহ-এর মধ্যে দুর্বলতা রয়েছে, যদিও বুখারী তার থেকে বর্ণনা করেছেন। ইবনু হিব্বান বলেন :তিনি নিজে সত্যবাদী ছিলেন, কিন্তু তার প্রতিবেশীর পক্ষ হতে তার হাদীসে মুনকারের প্রবেশ ঘটেছে। তিনি বলেন : আমি ইবনু খুজায়মাকে বলতে শুনেছি : প্রতিবেশীর সাথে তার শত্রুতা ছিল। এ কারণে প্রতিবেশী ইবনু সালেহের শাইখের উদ্ধৃতিতে নিজের হাতে লিখে হাদীস জাল করতো এবং (আব্দুল্লাহর হাতের লিখার সাথে তার হাতের লিখার মিল ছিল) সে হাদীসকে আব্দুল্লাহ ইবনু সালেহের বাড়ীতে তার গ্রন্থগুলোর উপর ফেলে দিত। ফলে আব্দুল্লাহ তার লিখাকে নিজের হাতের লিখা মনে করতেন এবং তিন তাকে হাদীস হিসাবে বর্ণনা করতেন।

জাল জয়িফ হাদিস সিরিজ

হাদিস নং ৭

" اثنتان لا تقربهما: الشرك بالله والإضرار بالناس ".لا أصل له.

বর্ণনাকারী বর্ণনাকারী

দু’টি বস্তুর নিকটবর্তী হয়ো না, আল্লাহর সাথে শরীক স্থাপন করা এবং মানুষের ক্ষতি সাধন করা।হাদীসটির কোন ভিত্তি নেই।হাদীসটি এ বাক্যেই পরিচিতি লাভ করেছে। সুন্নাহের কোন গ্রন্থে এর ভিত্তি সম্পর্কে অবহিত হইনি। হতে পারে এর মূলে আছে গাযালীর “আল-ইহইয়া” গ্রন্থে (২/১৮৫) বর্ণিত কথিত হাদীস।হাফিয ইরাকী তাঁর “তাখরীজ” গ্রন্থে বলেনঃ হাদীসটি “ফিরদাউস” গ্রন্থের রচনাকারী আলী (রাঃ) এর হাদীস হতে উল্লেখ করেছেন। কিন্তু তাঁর ছেলে তাঁর “মুসনাদ” গ্রন্থে মুসনাদ হাদীস হিসাবে উল্লেখ করেননি।এ কারণেই সুবকী সেটিকে সেই সব হাদীসগুলোর অন্তর্ভুক্ত করেছেন (৪/১৫৬) যেগুলো “আল-ইহইয়া” গ্রন্থে এসেছে, অথচ তিনি সেগুলোর কোন সনদ পাননি।

জাল জয়িফ হাদিস সিরিজ

হাদিস নং ৮

" اعمل لدنياك كأنك تعيش أبدا، واعمل لآخرتك كأنك تموت غدا ".لا أصل له مرفوعا.

বর্ণনাকারী বর্ণনাকারী

তুমি দুনিয়ার জন্য এমনভাবে কর্ম কর, যেন তুমি অনন্ত কালের জন্য জীবন ধারণ করবে। আর আখেরাতের জন্য এমনভাবে আমল কর, যেন তুমি কালকেই মৃত্যুবরণ করবে।মারফূ’ হিসাবে হাদীসটির কোন ভিত্তি নেই।যদিও এটি পরবর্তী সময়গুলোতে মুখে মুখে পরিচিতি লাভ করেছে। তবে মওকূফ হিসাবে হাদীসটির ভিত্তি পেয়েছি। ইবনু কুতায়বা “গারীবুল হাদীস” গ্রন্থে (১/৪৬/২) বর্ণনা করেছেন। কিন্তু এটির সনদের বর্ণনাকারী ওবায়দুল্লাহ ইবনু আয়যারের জীবনী কে উল্লেখ করেছেন পাচ্ছিনা। অতঃপর এটি সম্পর্কে “তারীখু বুখারী” গ্রন্থে (৩/৩৯৪) এবং “যারহু ওয়াত তা’দীল” (২/২/৩৩০) গ্রন্থে অবহিত হয়েছি। কিন্তু সনদটি মুনকাতি’ [বিচ্ছিন্ন]।অতঃপর ইবনু হিব্বানকে এটিকে “সিকাত আতবা’ইত তাবে’ঈন” গ্রন্থে (৭/১৪৮) উল্লেখ করতে দেখেছি।ইবনুল মুবারাকও অন্য সূত্রে “আল-যুহুদ” গ্রন্থে (২/২১৮) মওকূফ হিসাবে বর্ণনা করেছেন। কিন্তু এটিও মুনকাতি’ [ অর্থাৎ এর সনদে বিচ্ছিন্নতা রয়েছে]। মারফূ’ হিসাবেও বর্ণিত হয়েছে।বাইহাকী তাঁর “সুনান” গ্রন্থে (৩/১৯) আবূ সালেহ-এর সূত্রে বর্ণনা করেছেন (তবে ভাষায় ভিন্নতা আছে)। কিন্তু এটির সনদটিও দু’টি কারণে দুর্বলঃ সনদের এক বর্ণনাকারী উমার ইবনু আব্দিল আযীযের দাস মাজহূল এবং আবূ সালেহ দুর্বল। তিনি হচ্ছেন আব্দুল্লাহ ইবনু সালেহ, লাইসের কাতিব [কেরানী]। তাঁর সম্পর্কে ৬ নং হাদীসে আলোচনা করা হয়েছে।বাইহাকী কর্তৃক বর্ণিত ইবনু ‘আমরের হাদীসের প্রথম অংশটি বায্‌যার জাবের (রা) এর হাদীস হতে বর্ণনা করেছেন (দেখুনঃ ১/৫৭/৭৪-কাশফুল আসতার)। হায়সামী “আল-মাজমা” গ্রন্থে (১/৬২) বলেছেনঃ এটির সনদে ইয়াহইয়া ইবনুল মুতাওয়াক্কিল (আবূ আকীল) রয়েছেন। তিনি মিথ্যুক।

জাল জয়িফ হাদিস সিরিজ

হাদিস নং ৯

" أنا جد كل تقي ".لا أصل له.

বর্ণনাকারী বর্ণনাকারী

আমি প্রত্যেক পরহেজগার (সংযমী) ব্যক্তির দাদা।হাদীসটির কোন ভিত্তি নেই।হাফিয সুয়ূতীকে এটি সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, তিনি বলেনঃ আমি এ হাদীসটি চিনিনা। তিনি এ কথাটি তাঁর “আল-হাবী লিল ফাতাওয়া” গ্রন্থে (২/৮৯) বলেছেন।

জাল জয়িফ হাদিস সিরিজ

হাদিস নং ১০

" إن الله يحب أن يرى عبده تعبا في طلب الحلال ".موضوع.

বর্ণনাকারী বর্ণনাকারী

নিশ্চয় আল্লাহ তাঁর বান্দা কে হালাল রুযি অন্বেষণের উদ্দেশে পরিশ্রান্ত অবস্থায় দেখতে ভালবাসেন।হাদীসটি জাল।এটিকে আবূ মানসূর দাইলামী “মুসনাদুল ফিরদাউস” গ্রন্থে আলী (রাঃ)– এর হাদীস হতে মারফূ হিসাবে বর্ণনা করেছেন।হাফিয ইরাকী (২/৫৬) বলেনঃ এটির সনদে মুহাম্মাদ ইবনু সাহাল আল-আত্তার নামক এক বর্ণনাকারী আছেন। তার সম্পর্কে দারাকুতনী বলেনঃ তিনি হাদিস জালকারী।আমি (আলবানী) বলছিঃ এ হাদীসটি সেই সব হাদীসের একটি যেগুলোকে সুয়ূতি “জামে’উস সাগীর” গ্রন্থে উল্লেখ করে তার গ্রন্থকে কালিমালিপ্ত করেছেন। ভূমিকাতে উদ্ধৃত তার নিজ উক্তির বিরোধিতা করে, তিনি বলেছেনঃ (আরবী)আমি কিতাবটি জালকারী ও মিথ্যুকের একক বর্ণনা হতে হেফাযাত করেছি। এ গ্রন্থের ভাষ্যকার আব্দুর রউফ আর-মানাবী “ফয়যুল কাদীর” গ্রন্থে বলেনঃ “জামে’উস সাগীর” এর লেখকের হাদীসটিকে তার গ্রন্থ হতে মুছে ফেলা উচিত ছিল।

সেটিংস
আরবি ফন্ট ফেস
আরবি ফন্ট সাইজ

32

অনুবাদের ফন্ট সাইজ

18