তাশাহহুদ বা আত্তাহিয়্যাতু: আরবি, বাংলা অর্থ ও শাহাদাত আঙুল তোলার নিয়ম

আব্দুর রহমান
আব্দুর রহমান
১২ জুল, ২০২৬সালাত

নামাজ বা সালাত হলো মুমিনের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। নামাজের প্রতিটি রুকন, জিকর ও দোয়ার রয়েছে সুনির্দিষ্ট আইনি ও আধ্যাত্মিক গুরুত্ব। এর মধ্যে অন্যতম একটি অনুষঙ্গ হলো তাশাহহুদ, যা সাধারণ মানুষের কাছে 'আত্তাহিয়্যাতু' দোয়া নামে পরিচিত। নামাজের দ্বিতীয় রাকাতে (তিন বা চার রাকাতবিশিষ্ট নামাজে) এবং শেষ রাকাতে বসা অবস্থায় এই দোয়াটি পাঠ করতে হয়। তাশাহহুদ পাঠ করা নামাজের অন্যতম একটি ওয়াজিব বিধান, যা বাদ পড়লে নামাজ ত্রুটিযুক্ত হয়। এই নিবন্ধে তাশাহহুদের সহিহ রূপ, অর্থ, ফজিলত এবং এটি পাঠের সময় আঙুল দিয়ে ইশারা করার সুন্নাহসম্মত নিয়মাবলী বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।

তাশাহহুদ বা আত্তাহিয়্যাতু দোয়ার আইনি বিধান

ইসলামী ফিকহ অনুযায়ী, নামাজের প্রথম ও শেষ বৈঠকে তাশাহহুদ বা আত্তাহিয়্যাতু পাঠ করা ওয়াজিব। আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, "যখন তাশাহহুদ ফরজ করা হয়নি, তখন আমরা বলতাম: আল্লাহর বান্দাদের পক্ষ থেকে আল্লাহর প্রতি সালাম, জিবরাঈলের প্রতি সালাম, মিকাঈলের প্রতি সালাম। তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) আমাদের বললেন: তোমরা এমন বলো না; বরং বলো—আত্তাহিয়্যাতু লিল্লাহি..." (সহীহ বুখারী, হাদিস ৮ Roman৩১)। ভুলবশত তাশাহহুদ বাদ পড়লে নামাজের শেষে সাহু সেজদা (সেজদায়ে সাহু) দেওয়া আবশ্যক। তবে ইচ্ছাকৃতভাবে এটি বর্জন করলে নামাজ পুনরায় আদায় করতে হবে।

মিরাজের অলীক গল্প ও তাশাহহুদের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট

উপমহাদেশের অনেক প্রচলিত বইপুস্তক বা আলোচনায় দাবি করা হয় যে, মিরাজের রাতে মহান আল্লাহ, রাসুলুল্লাহ (সা.) এবং ফেরেশতাদের মধ্যকার কথোপকথন থেকেই আত্তাহিয়্যাতু দোয়ার উৎপত্তি। তবে মুহাদ্দিস ও ইসলামী স্কলারদের মতে, এই কাহিনীর সপক্ষে কোনো সহিহ বা নির্ভরযোগ্য হাদিসের প্রমাণ নেই। এটি একটি বহুল প্রচলিত লোকগাথা মাত্র। মূলত, রাসুলুল্লাহ (সা.) যেভাবে সাহাবীদের কুরআনের সূরা শিক্ষা দিতেন, ঠিক সেভাবেই অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে নামাজের এই দোয়াটি শিক্ষা দিতেন।

আত্তাহিয়্যাতু দোয়ার সহিহ আরবি, উচ্চারণ ও বাংলা অর্থ

হাদিস গ্রন্থে তাশাহহুদের কয়েকটি সহিহ বর্ণনা এসেছে। এর মধ্যে আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত শব্দবিন্যাসটি সবচেয়ে বেশি বিশুদ্ধ ও গ্রহণযোগ্য:

التَّحِيَّاتُ لِلَّهِ وَالصَّلَوَاتُ وَالطَّيِّبَاتُ، السَّلَامُ عَلَيْكَ أَيُّهَا النَّبِيُّ وَرَحْمَةُ اللَّهِ وَبَرَكَاتُهُ، السَّلَامُ عَلَيْنَا وَعَلَى عِبَادِ اللَّهِ الصَّالِحِينَ، أَشْهَدُ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَأَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا عَبْدُهُ وَرَسُولُهُ


উচ্চারণ: আত্তাহিয়্যাতু লিল্লাহি ওয়াস-সালাওয়াতু ওয়াত-তাইয়িবাতু, আস-সালামু আলাইকা আইয়ুহান-নাবিয়্যু ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু। আস-সালামু আলাইনা ওয়া আলা ইবাদিল্লাহিস-সালিহীন। আশহাদু আল-লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মাদান আবদুহু ওয়া রাসুলুহু।

অনুবাদ: যাবতীয় মৌখিক এবাদত, যাবতীয় শারীরিক এবাদত ও যাবতীয় আর্থিক ইবাদত আল্লাহর জন্য। হে নবী! আপনার প্রতি শান্তি, আল্লাহর রহমত ও তাঁর বরকত বর্ষিত হোক। আমাদের প্রতি এবং আল্লাহর নেক বান্দাদের প্রতি শান্তি বর্ষিত হোক। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই এবং আমি আরও সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মাদ আল্লাহর বান্দা ও তাঁর রাসুল।

হাদিসের সূত্র: এই শব্দবিন্যাসটি ইমাম বুখারী ও ইমাম মুসলিম বর্ণনা করেছেন (সহীহ বুখারী, হাদিস ৬৩২৮; সহিহ মুসলিম, হাদিস ৮৯৯)।

তাশাহহুদের সময় শাহাদাত আঙুল দিয়ে ইশারা করার নিয়ম

তাশাহহুদ পাঠ করার সময় ডান হাতের শাহাদাত বা তর্জনী আঙুল উঁচিয়ে আল্লাহর একত্ববাদের ইশারা করা সুন্নাত। এটি শয়তানের বিরুদ্ধে একটি শক্তিশালী আত্মিক প্রতিরোধ। তবে আঙুল তোলার সঠিক সময় ও পদ্ধতি নিয়ে ফকীহদের মধ্যে কিছুটা মতপার্থক্য রয়েছে:

  • হানাফী মাজহাবের নিয়ম: তাশাহহুদ পড়ার সময় ডান হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলি ও মধ্যমা আঙুল দিয়ে গোল বৃত্ত তৈরি করতে হবে এবং অনামিকা ও কনিষ্ঠা আঙুল দুটিকে মুষ্টিবদ্ধ করতে হবে। এরপর যখন তাওহীদের ঘোষণা বা 'লা ইলাহা' (কোনো উপাস্য নেই) বলা হবে, তখন শাহাদাত আঙুলটি সোজা ওপরে তুলতে হবে এবং 'ইল্লাল্লাহ' (আল্লাহ ছাড়া) বলার সময় আঙুলটি নামিয়ে নিতে হবে। তবে আঙুল নামানোর পর হাত যেভাবে বৃত্তাকার ছিল, শেষ পর্যন্ত সেভাবেই থাকবে।
  • অন্যান্য মাজহাবের নিয়ম: শাফেয়ী, মালিকী ও হাম্বলী মাজহাবের ওলামাদের মতে, তাশাহহুদ শুরু করার পর থেকেই আঙুলটি সামান্য উঁচিয়ে ইশারা করতে হয় এবং কেউ কেউ তাশাহহুদের শেষ পর্যন্ত আঙুলটি মৃদু নাড়ানোর কথাও বলেছেন, যা ওয়াইল ইবনে হুজর (রা.)-এর হাদিস দ্বারা প্রমাণিত।

তাশাহহুদ পাঠের সময় সাধারণ কিছু ভুলত্রুটি

অনেকেই না বুঝে বা অজ্ঞতার কারণে তাশাহহুদ পড়ার সময় কিছু সাধারণ ভুল করে থাকেন, যা সংশোধন করা উচিত:

  • উচ্চারণ বিকৃত করা: তাড়াহুড়ো করে পড়ার কারণে অনেকে 'আলাইকা' (আপনার ওপর)-এর জায়গায় বহুবচনের 'আলাইকুম' বলে ফেলেন, যা হাদিসের মূল শব্দের পরিপন্থী। আবার অনেকে তাওহীদের সাক্ষ্যের 'আল-লা ইলাহা'-এর 'নুন' বা 'লাম' যুক্তাক্ষরের উচ্চারণ ভুল করেন।
  • অনিয়ন্ত্রিত আঙুল নাড়ানো: আঙুল দিয়ে ইশারা করার সময় পুরো হাত নাড়ানো অথবা লাঠির মতো জোরে জোরে আঙুল ঘোরাতে থাকা সুন্নাহসম্মত নয়। ইশারা হবে কেবল তর্জনী আঙুল দিয়ে এবং তা হবে অত্যন্ত শান্ত ও নিয়ন্ত্রিত।
  • দৃষ্টির অবস্থান ঠিক না রাখা: তাশাহহুদ পড়ার সময় সুন্নাত হলো—দৃষ্টি নিজের ডান হাতের ইশারা করা আঙুলের দিকে রাখা। অনেকে এই সময় এদিক-ওদিক তাকান বা সেজদার জায়গার দিকে তাকিয়ে থাকেন, যা মনোযোগের ব্যাঘাত ঘটায়।

উপসংহার

তাশাহহুদ বা আত্তাহিয়্যাতু সালাতের একটি অনন্য ও গভীর তাৎপর্যপূর্ণ অংশ। এর মাধ্যমে বান্দা আল্লাহর প্রতি তার সর্বোচ্চ আনুগত্য ও তাওহীদের সাক্ষ্য নবায়ন করে এবং প্রিয় নবী (সা.)-এর প্রতি ভালোবাসার সালাম পেশ করে। আমাদের প্রত্যেকের উচিত এই দোয়ার শব্দগুলো অত্যন্ত নিখুঁত ও শুদ্ধভাবে মুখস্থ করা এবং নামাজের মধ্যে ধীরস্থিরভাবে অর্থ উপলব্ধি করে তা পাঠ করা। আল্লাহ তাআলা আমাদের সালাতসমূহকে সুন্নাহ মোতাবেক আদায় করার তাওফিক দান করুন। আমীন।

রেফারেন্স

হাদিস

  • সহীহ বুখারী, হাদিস ৮৩১ (অধ্যায়: সালাতের বিবরণ) — তাশাহহুদ শিক্ষার নির্দেশ ও প্রারম্ভিক বিধান।
  • সহীহ বুখারী, হাদিস ৬৩২৮ (অধ্যায়: দোয়া ও দাওয়াত) — ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত তাশাহহুদের মূল শব্দবিন্যাস।
  • সহিহ মুসলিম, হাদিস ৮৯৯ (অধ্যায়: সালাত) — তাশাহহুদ বা আত্তাহিয়্যাতুর বিশুদ্ধ বর্ণনা।
  • সুনানে নাসাঈ, হাদিস ১২৭৩ — তাশাহহুদের বৈঠকে আঙুল দিয়ে ইশারা করা ও দৃষ্টি নিবন্ধনের সুন্নাহ।

প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)

প্রথম বৈঠকে আত্তাহিয়্যাতু পড়ার পর ভুলে দরুদ শরীফ পড়ে ফেললে কী করণীয়?

তিন বা চার রাকাতবিশিষ্ট সালাতের দ্বিতীয় রাকাতে (প্রথম বৈঠকে) কেবল তাশাহহুদ বা আত্তাহিয়্যাতু পড়াই ওয়াজিব। যদি কেউ ভুলবশত বা অসাবধানতাবশত তাশাহহুদের পর দরুদ শরীফের পুরো অংশ বা 'আল্লাহুম্মা সাল্লি আলা মুহাম্মাদ' পর্যন্ত পড়ে ফেলেন, তবে হানাফী মাজহাব অনুযায়ী তার ওপর নামাজের শেষে সেজদায়ে সাহু (সাহু সেজদা) দেওয়া ওয়াজিব হয়ে যাবে। কারণ তিনি ওয়াজিব বৈঠকে অতিরিক্ত সময় বিলম্ব করেছেন।

তাশাহহুদ বা আত্তাহিয়্যাতু কি নিজের ভাষায় (যেমন বাংলায়) উচ্চারণ করে পড়া যাবে?

নামাজের ভেতরের সমস্ত ওয়াজিব ও ফরজ জিকর-আযকার অবশ্যই মূল আরবি ভাষাতেই পাঠ করতে হবে। কোনো নির্ভরযোগ্য ইসলামী স্কলারের মতে নামাজের ভেতরে বাংলা বা অন্য কোনো ভাষায় তাশাহহুদ বা অন্য দোয়া মুখে উচ্চারণ করে অনুবাদ পড়া জায়েজ নয়। এতে নামাজ বাতিল হয়ে যাবে। তবে যিনি আরবি জানেন না, তিনি দ্রুততম সময়ে এটি শিখে নেবেন এবং শেখার অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে অন্যান্য সাধারণ তাসবিহ (যেমন: সুবহানাল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ) পাঠ করবেন।

দুই রাকাতবিশিষ্ট নামাজে (যেমন ফজরের ফরজ) তাশাহহুদের পর কি দরুদ পড়তে হবে?

হ্যাঁ, যেকোনো নামাজের শেষ বৈঠকে (তা দুই রাকাত, তিন রাকাত বা চার রাকাত যাই হোক না কেন) তাশাহহুদ বা আত্তাহিয়্যাতু পাঠ করার পর রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর প্রতি দরুদে ইব্রাহিম এবং এরপর দোয়া মাসুরা পাঠ করা সুন্নতে মুয়াক্কাদা। এগুলো পাঠ শেষেই কেবল সালাম ফিরিয়ে নামাজ সম্পন্ন করতে হয়।

তাশাহহুদের সময় শাহাদাত আঙুল না তুললে কি নামাজ ভেঙে যাবে?

না, তাশাহহুদের সময় শাহাদাত আঙুল উঁচিয়ে তাওহীদের ইশারা করা নামাজের একটি অন্যতম সুন্নাত আমল, এটি ফরজ বা ওয়াজিব নয়। অতএব, কেউ যদি ভুলবশত বা না জানার কারণে আঙুল না তোলে বা ইশারা না করে, তবে তার নামাজ ভেঙে যাবে না এবং নামাজ শুদ্ধ হয়ে যাবে; তবে সে একটি সুন্দর সুন্নাতের সওয়াব থেকে বঞ্চিত হবে।
আব্দুর রহমান

আব্দুর রহমান

এসইও স্পেশালিস্ট ও কনটেন্ট রাইটার

আব্দুর রহমান একজন এসইও স্পেশালিস্ট এবং ইসলামিক কনটেন্ট রাইটার। তিনি ফিকহ, দৈনন্দিন ইবাদত, নামাজ, পারিবারিক দিকনির্দেশনা এবং বাস্তব মুসলিম জীবনধারা নিয়ে সহজ প্রবন্ধ লেখেন, যাতে পাঠকরা প্রতিদিনের জীবনে ইসলাম অনুসরণ করতে পারেন।

আপডেট থাকুন

আমাদের সর্বশেষ আপডেট ও রিলিজ মিস করবেন না