তাশাহহুদ (যা সাধারণ মানুষের কাছে 'আত্তাহিয়্যাতু' নামে পরিচিত) নামাজের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি রুকন বা ওয়াজিব অংশ। প্রত্যেক চার বা তিন রাকাত বিশিষ্ট নামাজের দ্বিতীয় রাকাতে এবং সব নামাজের শেষ রাকাতে বসে এই দোয়াটি পাঠ করতে হয়। 'তাশাহহুদ' শব্দের আভিধানিক অর্থ সাক্ষ্য দেওয়া। এই দোয়ার মাধ্যমে বান্দা আল্লাহর এককত্ব এবং রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নবুওয়াতের সাক্ষ্য প্রদান করে। নিচে সহিহ হাদিসের আলোকে তাশাহহুদ দোয়ার আরবি, উচ্চারণ, বাংলা অর্থ ও সঠিক বসার পদ্ধতি বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।
তাশাহহুদ দোয়ার আরবি পাঠ, উচ্চারণ ও অনুবাদ
নামাজ নিখুঁত ও শুদ্ধ করার জন্য তাশাহহুদ দোয়ার প্রতিটি শব্দের সঠিক উচ্চারণ জানা অত্যন্ত জরুরি। নিচে আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত সবচেয়ে বিশুদ্ধ ও প্রসিদ্ধ তাশাহহুদটি দেওয়া হলো:
আরবি টেক্সট
বাংলা উচ্চারণ
উচ্চারণ: আত্তাহিয়্যাতু লিল্লাহি ওয়াস-সালাওয়াতু ওয়াত-তৈয়্যিবাতু, আস-সালামু আলাইকা আইয়্যুহান-নাবিইয়্যু ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু, আস-সালামু আলাইনা ওয়া আলা ইবাদিল্লাহিস-সালিহীন, আশহাদু আল-লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মাদান আবদুহু ওয়া রাসুলুহু।
বাংলা অর্থ
অর্থ: সমস্ত মৌখিক ইবাদত ও সম্মান, সমস্ত শারীরিক ইবাদত এবং সমস্ত আর্থিক ও পবিত্র ইবাদত একমাত্র আল্লাহর জন্য। হে নবী! আপনার প্রতি শান্তি, আল্লাহর রহমত ও বরকত বর্ষিত হোক। আমাদের প্রতি এবং আল্লাহর সৎকর্মপরায়ণ বান্দাদের প্রতি শান্তি বর্ষিত হোক। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া কোনো সত্য উপাস্য নেই এবং আমি আরও সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মাদ (সা.) আল্লাহর বান্দা ও রাসুল।
তাশাহহুদ দোয়ার গভীর তাৎপর্য
তাশাহহুদ কেবল কিছু শব্দের সমষ্টি নয়, বরং এটি আল্লাহর সঙ্গে বান্দার এক গভীর আধ্যাত্মিক কথোপকথন ও বিশ্বাসের নবায়ন। 'আত্তাহিয়্যাতু' শব্দের মাধ্যমে আমরা আল্লাহর রাজকীয় মহানুভবতার প্রশংসা করি। 'আসসালাওয়াতু' ও 'আত্তাইয়িবাতু' দিয়ে যথাক্রমে আমাদের নামাজ, ইবাদত এবং সমস্ত পবিত্র উপার্জন ও আমল আল্লাহর দরবারে সমর্পণ করি। এরপর নবী করিম (সা.)-এর প্রতি এবং সবশেষে নিজেদের ও পৃথিবীর সমস্ত সৎকর্মশীল মুমিন বান্দার জন্য শান্তি কামনা করা হয়। এই দোয়ার শেষ ভাগে ইসলামের মূল ভিত্তি তথা তাওহিদ ও রিসালাতের দ্ব্যর্থহীন ঘোষণা রয়েছে।
নামাজে তাশাহহুদ পড়ার ও বসার সঠিক সুন্নত পদ্ধতি
তাশাহহুদ পাঠ করার সময় বসার নির্দিষ্ট সুন্নত পদ্ধতি রয়েছে। নামাজের প্রথম বৈঠক ও শেষ বৈঠকের বসার মাঝে কিছুটা ভিন্নতা রয়েছে, যা নিচে স্পষ্ট করা হলো:
১. প্রথম বৈঠকে বসার নিয়ম (ইফতিরাশ)
তিন বা চার রাকাত বিশিষ্ট নামাজের দ্বিতীয় রাকাতে তাশাহহুদ পড়ার জন্য বসার পদ্ধতিকে 'ইফতিরাশ' বলা হয়। এর নিয়ম হলো, বাম পা বিছিয়ে তার ওপর বসতে হবে এবং ডান পা খাড়া করে রাখতে হবে, যেন ডান পায়ের আঙুলগুলো কিবলামুখী থাকে।
২. শেষ বৈঠকে বসার নিয়ম (তাওয়াররুক)
নামাজের শেষ রাকাতে তাশাহহুদ, দুরুদ ও দোয়া মাসুরা পড়ার জন্য বসার সুন্নত পদ্ধতি হলো 'তাওয়াররুক'। এর নিয়ম হলো, বাম পা-টি ডান পায়ের নালির নিচ দিয়ে ডান দিকে বের করে দিতে হবে এবং নিতম্বের (পাছার) ওপর ভর দিয়ে মাটিতে বসতে হবে। এ সময়ও ডান পা খাড়া থাকবে।
৩. শাহাদাত আঙুল দিয়ে ইশারা করার নিয়ম
তাশাহহুদ পড়ার সময় ডান হাত ডান উরুর ওপর এবং বাম হাত বাম উরুর ওপর থাকবে। দোয়া পড়ার সময় ডান হাতের বুড়ো আঙুল ও মধ্যমা আঙুল দিয়ে গোল বৃত্ত তৈরি করতে হবে এবং তর্জনী (শাহাদাত আঙুল) কিবলার দিকে তাক করে রাখতে হবে। 'আশহাদু আল-লা ইলাহা' বলার সময় আঙুলটি সামান্য উঁচিয়ে ইশারা করতে হবে এবং পুরো তাশাহহুদ শেষ হওয়া পর্যন্ত আঙুল নাড়াচড়া বা ইশারারত অবস্থায় রাখা সুন্নত। এ সময় দৃষ্টি থাকবে নিজের ইশারা করা আঙুলের দিকে।
তাশাহহুদ পড়ার গুরুত্ব ও ফজিলত
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবিদেরকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে কুরআনুল কারিমের সুরার মতোই তাশাহহুদ শিক্ষা দিতেন। নামাজের প্রথম বৈঠকে তাশাহহুদ পড়া ওয়াজিব। যদি কেউ ভুলবশত এটি ত্যাগ করে, তবে তাকে সাহু সিজদা (ভুল সংশোধনের সিজদা) দিতে হবে। আর শেষ বৈঠকে তাশাহহুদ পাঠ করা নামাজের অন্যতম ফরজ বা রুকন; এটি ইচ্ছা বা ভুলবশত বাদ পড়লে নামাজ বাতিল হয়ে যায়। এই দোয়ার মাধ্যমে বান্দা প্রতিদিন প্রতি নামাজে নিজের ইমানকে সতেজ করে এবং নবী (সা.) ও উম্মতের নেক বান্দাদের জন্য কল্যাণ প্রার্থনা করে।
তাশাহহুদ আদায়ের ক্ষেত্রে সাধারণ কিছু ভুল
আমাদের সমাজে অনেক মুসল্লি না বুঝে তাশাহহুদ পড়ার সময় কিছু সাধারণ ভুল করে থাকেন, যা সংশোধন করা প্রয়োজন:
- উচ্চারণের বিকৃতি: অনেকে তাড়াহুড়ো করে পড়তে গিয়ে 'আত্তাহিয়্যাতু' শব্দের তাশদিদ বাদ দিয়ে 'আত্তাহিয়াতু' বলেন, যা অর্থগত পরিবর্তন ঘটাতে পারে।
- আঙুল ওঠানোর ভুল সময় ও নিয়ম: অনেকে মনে করেন কেবল 'ইল্লাল্লাহু' বলার সময়ই আঙুল চট করে উঠিয়ে নামিয়ে ফেলতে হবে। অথচ সহিহ সুন্নাহ অনুযায়ী, ইশারার প্রক্রিয়াটি তাওহিদের সাক্ষ্যের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত বজায় রাখা উত্তম।
- অস্থিরতা প্রকাশ: বসা অবস্থায় শরীর অতিরিক্ত নাড়াচড়া করা বা এদিক-ওদিক তাকানো সুন্নাহ পরিপন্থী। দৃষ্টি সর্বদা নিজের ইশারাকারী আঙুলের দিকে নিবদ্ধ রাখতে হবে।
References
Quranic Ayahs
- সূরা আন-নিসা, ৪:১০৩ — নামাজ যথাসময়ে আদায় করার গুরুত্ব ও নির্দেশ।
Hadith
- সহীহ বুখারী, হাদিস ৮৩১ (অধ্যায়: আজান) — ইবনে মাসউদ (রা.) কর্তৃক বর্ণিত তাশাহহুদের মূল শব্দ এবং রাসুলুল্লাহ (সা.) এর তাশাহহুদ শিক্ষা দেওয়ার বিবরণ।
- সহীহ মুসলিম, হাদিস ৪০২ — তাশাহহুদ পাঠের গুরুত্ব এবং এর ফজিলত সংক্রান্ত বর্ণনা।
- সুনানে আবু দাউদ, হাদিস ৯৬৮ — তাশাহহুদে বসার সময় আঙুল দিয়ে ইশারা করার সঠিক পদ্ধতি।

