সালাত বা নামায হলো বান্দার সাথে মহান আল্লাহর এক নিবিড় ও গভীর সংযোগ। সালাতের কিছু অংশ যেমন উচ্চস্বরে কিরাত পাঠের মাধ্যমে প্রকাশ পায়, তেমনি এর একটি বড় অংশ জুড়ে রয়েছে আল্লাহর সাথে বান্দার অতি গোপন ও নীরব কথোপকথন। তাকবীরে তাহরীমা থেকে শুরু করে ডানে-বামে সালাম ফেরানো পর্যন্ত নামাযের প্রায় প্রতিটি রোকনেই কিছু নির্দিষ্ট তাসবিহ ও দুআ নীরবে পাঠ করতে হয়। সালাতে এই নীরব দুআসমূহ ধীরস্থিরভাবে ও অনুধাবন সহকারে পাঠ করা নামাযের খুশু-খুযু (মনোযোগ ও বিনয়) বৃদ্ধির অন্যতম প্রধান মাধ্যম। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহ অনুসরণে নামাযের কোন কোন অবস্থানে কী কী দুআ নীরবে পাঠ করতে হবে, তা শরয়ী দলিলসহ এই নিবন্ধে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।
সালাতে নীরব দুআ পাঠের গুরুত্ব ও তাৎপর্য
সালাতের ভেতরে নীরব ইবাদত বা চুপিচুপি আল্লাহর প্রশংসা করা মনকে শান্ত করে এবং নামাযে শয়তানের ওয়াসওয়াসা থেকে মুক্ত থাকতে সাহায্য করে। রাসুলুল্লাহ (সা.) ফরয ও নফল উভয় সালাতেই এই নীরব দুআ ও তাসবিহসমূহ অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে আদায় করতেন। তবে মনে রাখতে হবে, নামাযে ‘নীরব’ বা ‘সিররি’ পাঠের অর্থ এই নয় যে কেবল মনে মনে চিন্তা করা; বরং ওলামায়ে কেরামের মতে, জিহ্বা ও ঠোঁট নাড়িয়ে এমনভাবে নিম্নস্বরে উচ্চারণ করতে হবে যেন অন্তত নিজের কান পর্যন্ত সেই আওয়াজ পৌঁছায় (যদি চারপাশ কোলাহলমুক্ত থাকে)।
সালাতের বিভিন্ন অবস্থানে নীরব দুআ ও তাসবিহসমূহ
১. তাকবীরে তাহরীমার পর (সানা)
নামাযে দাঁড়িয়ে তাকবীরে তাহরীমা বলে হাত বাঁধার পর প্রথম রাকাতে কিরাত শুরুর পূর্বে নীরবে সানা পাঠ করা সুন্নাত।
উচ্চারণ: সুবহানাকাল্লাহুম্মা ওয়া বিহামদিকা, ওয়া তাবারাকাসমুকা, ওয়া তা‘আলা জাদ্দুকা, ওয়া লা ইলাহা গাইরুক।
অনুবাদ: হে আল্লাহ! আমি আপনার পবিত্রতা ঘোষণা করছি এবং আপনার প্রশংসা করছি। আপনার নাম বরকতময়, আপনার মহত্ত্ব অত্যুচ্চ এবং আপনি ব্যতীত কোনো সত্য ইলাহ নেই।
এই দুআটি সানা হিসেবে অত্যন্ত প্রসিদ্ধ এবং সুনান গ্রন্থে সহিহ সূত্রে প্রমাণিত। (বিস্তারিত দেখুন: জামিউত তিরমিযী, হাদিস ২৪২)।
২. রুকুতে পাঠ করার তাসবিহ
রুকুতে গিয়ে পিঠ সোজা ও স্থির করার পর অত্যন্ত বিনয়ের সাথে নিম্নোক্ত তাসবিহটি নীরবে কমপক্ষে তিনবার পাঠ করা সুন্নাত। একাকী নামাযী চাইলে এটি আরও বেশি বার (যেমন ৫, ৭ বা ৯ বার) বৃদ্ধি করতে পারেন।
উচ্চারণ: সুবহানা রাব্বিয়াল ‘আযীম।
অনুবাদ: আমার মহান প্রতিপালকের পবিত্রতা ঘোষণা করছি।
হাদিস শরিফে রাসুলুল্লাহ (সা.) রুকুতে এই তাসবিহটি দীর্ঘ সময় ধরে আদায় করতেন বলে প্রমাণিত। (তথ্যসূত্র: সহিহ মুসলিম, হাদিস ৭৭২ - plain text format)।
৩. রুকু থেকে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে (কওমা) পঠিত দুআ
রুকু থেকে মাথা তোলার সময় ইমাম এবং একাকী নামাযী বলবেন: ‘সামি‘আল্লাহু লিমান হামিদাহ’ (আল্লাহ তার প্রশংসা শোনেন যে তাঁর প্রশংসা করে)। এরপর সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে মুক্তাদিসহ সকলেই নীরবে এই দুআটি পাঠ করবেন:
উচ্চারণ: রাব্বানা ওয়া লাকাল হামদ, হামদান কাছীরান ত্বইয়্যিবাম মুবারাকান ফীহ।
অনুবাদ: হে আমাদের প্রতিপালক! আপনার জন্যই সমস্ত প্রশংসা—এমন প্রশংসা যা অগণিত, পবিত্র এবং বরকতময়।
সালাতের কওমা অবস্থায় এই দীর্ঘ দুআটি পাঠ করার বিশেষ ফজিলত রয়েছে, যা পাঠ করার সাথে সাথে ফেরেশতারা তা লিপিবদ্ধ করার জন্য প্রতিযোগিতা করেন। (বিস্তারিত দেখুন: সহিহ বুখারী, হাদিস ৭৯৯)।
৪. সেজদার তাসবিহ ও দুআ
সেজদায় গিয়ে শরীরের অঙ্গসমূহ স্থির হওয়ার পর অত্যন্ত একাগ্রতার সাথে এই তাসবিহটি নীরবে কমপক্ষে তিনবার পাঠ করবেন:
উচ্চারণ: সুবহানা রাব্বিয়াল আ‘লা।
অনুবাদ: আমার সর্বোচ্চ প্রতিপালকের পবিত্রতা ঘোষণা করছি।
রাসুলুল্লাহ (সা.) ফরয সালাতের সেজদায় এই তাসবিহ পড়তেন। (তথ্যসূত্র: সহিহ মুসলিম, হাদিস ৭৭২ - plain text format)। তবে নফল নামাযের সেজদায় এই তাসবিহ শেষ করে অন্যান্য সহিহ মাসনুন আরবি দুআ পাঠ করাও সুন্নাত দ্বারা প্রমাণিত।
৫. দুই সেজদার মধ্যবর্তী বৈঠকের (জলসা) দুআ
প্রথম সেজদা থেকে উঠে সোজা হয়ে বসার পর দ্বিতীয় সেজদায় যাওয়ার পূর্বে মাঝখানের এই সংক্ষিপ্ত বৈঠকে নীরবে এই ক্ষমা প্রার্থনার দুআটি পাঠ করা সুন্নাত। অনেকে তাড়াহুড়া করে এই বৈঠকটি দ্রুত শেষ করেন, যা অনুচিত।
উচ্চারণ: রব্বিগফিরলী, রব্বিগফিরলী।
অনুবাদ: হে আমার রব! আমাকে ক্ষমা করুন, হে আমার রব! আমাকে ক্ষমা করুন।
রাসুলুল্লাহ (সা.) দুই সেজদার মাঝখানে বসে এই দুআটি পাঠ করে জলসাকে দীর্ঘ করতেন। ( can be checked at: সুনান ইবনে মাজাহ, হাদিস ৮৯৭)।
৬. শেষ বৈঠকের তাশাহহুদ (আত্তাহিয়্যাতু)
নামাযের শেষ বৈঠকে (এবং তিন বা চার রাকাত বিশিষ্ট নামাযের প্রথম বৈঠকে) বসে নীরবে তাশাহহুদ পাঠ করা আবশ্যক বা ওয়াজিব।
উচ্চারণ: আত্তাহিয়্যাতু লিল্লাহি ওয়াসসালাওয়াতু ওয়াত্তাইয়্যিবাত। আসসালামু ‘আলাইকা আইয়ুহান নাবিয়্যু ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ। আসসালামু ‘আলাইনা ওয়া ‘আলা ইবাদিল্লাহিস স্বলিহীন। আশহাদু আল্লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মাদান ‘আবদুহু ওয়া রাসুলুহ।
অনুবাদ: সমস্ত মৌখিক, শারীরিক ও আর্থিক ইবাদত আল্লাহর জন্য। হে নবী! আপনার ওপর শান্তি, আল্লাহর রহমত ও বরকত বর্ষিত হোক। আমাদের ওপর এবং আল্লাহর সমস্ত নেক বান্দাদের ওপর শান্তি বর্ষিত হোক। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে আল্লাহ ছাড়া কোনো সত্য ইলাহ নেই এবং আমি আরও সাক্ষ্য দিচ্ছি যে মুহাম্মাদ (সা.) আল্লাহর বান্দা ও রাসুল।
হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে এই তাশাহহুদটি বর্ণিত হয়েছে। (বিস্তারিত দেখুন: সহিহ বুখারী, হাদিস ৮Transactions৩১)।
৭. সালামের পূর্বে ফিতনা থেকে আশ্রয়ের দুআ (দুআয়ে মাসূরা)
শেষ বৈঠকে তাশাহহুদ ও দরূদ শরিফ পাঠ শেষ করার পর সালাম ফেরানোর পূর্বে চার প্রকার কঠিন ফিতনা থেকে আল্লাহর কাছে নীরবে আশ্রয় চাওয়া সুন্নাত:
উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা ইন্নি আ‘উযু বিকা মিন ‘আযাবি জাহান্নাম, ওয়া মিন ‘আযাবিল ক্বাবরি, ওয়া মিন ফিতনাতিল মাহইয়া ওয়াল মামাত, ওয়া মিন শাররি ফিতনাতিল মাসীহিদ দাজ্জাল।
অনুবাদ: হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে আশ্রয় চাই জাহান্নামের আজাব থেকে, কবরের আজাব থেকে, জীবন ও মৃত্যুর ফিতনা থেকে এবং মসীহ দাজ্জালের ফিতনার অনিষ্ট থেকে।
নবী করীম (সা.) নামাযের শেষাংশে এই দুআটি পাঠ করার জন্য বিশেষ তাগিদ দিয়েছেন। (তথ্যসূত্র: সহিহ মুসলিম, হাদিস ৫৮৮ - plain text format)।
সালাতে নীরব দুআ পাঠের ক্ষেত্রে সাধারণ ভুলত্রুটি
নামাযের ভেতরে নীরব দুআ আদায় করার সময় সাধারণ মুসল্লিদের মধ্যে কিছু ভুল লক্ষ্য করা যায়, যা এড়িয়ে চলা আবশ্যক:
- অতিরিক্ত শব্দ করে পড়া: নীরব দুআ পড়ার সময় যদি পাশের মুসল্লির মনোযোগ বিঘ্নিত হয় এমন শব্দে উচ্চস্বরে পড়া হয়, তবে তা সুন্নাহর পরিপন্থী। ফরয নামাযে ইমামের পেছনে মুক্তাদিগণ সর্বদা সম্পূর্ণ নীরবে ঠোঁট নাড়িয়ে পাঠ করবেন।
- রুকু ও সেজদায় স্থিরতা (তুমানিনাহ) না রাখা: অনেকে রুকু বা সেজদায় গিয়ে তাসবিহ শেষ করার আগেই মাথা তুলে ফেলেন। নামাযের প্রতিটি রোকনে শরীর স্থির রাখা বা তুমানিনাহ বজায় রাখা ফরয/ওয়াজিব। তাসবিহ ধীরস্থিরভাবে শেষ করতে হবে।
- সেজদায় কুরআনের আয়াত তিলাওয়াত করা: রাসুলুল্লাহ (সা.) রুকু ও সেজদাতে কুরআনের আয়াত তিলাওয়াত করতে স্পষ্ট নিষেধ করেছেন (সহিহ মুসলিম)। তাই সেজদায় সাধারণ তিলাওয়াতের নিয়তে কুরআন পড়া মাকরুহ। তবে কুরআনে বর্ণিত কোনো দুআ যদি একান্তই প্রার্থনার নিয়তে পড়া হয়, তবে ফকিহদের একাংশের মতে তা জায়েজ, যদিও হাদিসের নির্দিষ্ট তাসবিহ পঠনই সর্বোত্তম।
প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)
১. সালাতের ভেতরে নীরব দুআ কি মনে মনে পড়লে আদায় হবে?
২. ফরয নামাযের সেজদায় কি নিজের ভাষায় (যেমন বাংলায়) নীরবে দুআ করা যাবে?
৩. মুক্তাদি কি ইমামের কিরাতের সময় নীরবে সানা পড়বেন?
রেফারেন্সসমূহ
কুরআনীয় আয়াতসমূহ
- সূরা আল-আরাফ, ৭:২০৫ — মনে মনে বা নিম্নস্বরে বিনয়ের সাথে আল্লাহর জিকির ও তাসবিহ করার সাধারণ নির্দেশ।
হাদিস শরীফ
- সহিহ বুখারী, হাদিস ৭九৯ (অধ্যায়: আযান) — রুকু থেকে মাথা তোলার পর কওমার মধ্যে দীর্ঘ ও বরকতময় নীরব দুআ পাঠের ফজিলত।
- সহিহ বুখারী, হাদিস ৮৩১ (অধ্যায়: আযান) — আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদের রেওয়ায়াতে নামাযের শেষ বৈঠকে তাশাহহুদ শিক্ষার বিবরণ।
- সহিহ মুসলিম, হাদিস ৭৭২ (অধ্যায়: মুসাফিরের সালাত) — রুকু ও সেজদার ভেতরে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুনির্দিষ্ট নীরব তাসবিহ আদায়ের বিবরণ (Plain Text)।
- সহিহ মুসলিম, হাদিস ৫৮৮ (অধ্যায়: মসজিদসমূহ ও সালাতের স্থান) — শেষ বৈঠকে সালাম ফেরানোর পূর্বে চার প্রকার কঠিন ফিতনা থেকে আশ্রয় প্রার্থনার তাগিদ (Plain Text)।
- সহিহ Muslim, হাদিস ৪৮২ (অধ্যায়: সালাত) — সেজদার অবস্থায় বান্দার রবের নিকটবর্তী হওয়া এবং বেশি বেশি দুআ করার গুরুত্ব (Plain Text)।
- জামিউত তিরমিযী, হাদিস ২৪২ (অধ্যায়: সালাত) — তাকবীরে তাহরীমার পর নীরবে সানা (সুবহানাকাল্লাহুম্মা) পাঠের সহিহ সুন্নাত।
- সুনান ইবনে মাজাহ, হাদিস ৮৯৭ (অধ্যায়: সালাত কায়েম) — দুই সেজদার মধ্যবর্তী জলসায় বসে ‘রব্বিগফিরলী’ দুআ পাঠের নিয়ম।

