বিতর নামাজের ছোট দোয়া: সহিহ সুন্নাহ সমর্থিত কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অপশন

আব্দুর রহমান
আব্দুর রহমান
১২ জুল, ২০২৬সালাত

বিতর নামাজ রাতের শেষভাগের একটি অতীব গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। এই সালাতের একটি বিশেষ আমল হলো দোয়া কুনুত পাঠ করা। অনেকেই মনে করেন দোয়া কুনুত হিসেবে কেবল একটি সুদীর্ঘ দোয়াই নির্দিষ্ট, যা মুখস্থ করা অনেকের জন্য কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। তবে বিশুদ্ধ হাদিসের ভাণ্ডার বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, রাসুলুল্লাহ (সা.) বিতর নামাজে পড়ার জন্য একাধিক সংক্ষিপ্ত ও অর্থবহ দোয়া শিখিয়েছেন। এই নিবন্ধে বিতর নামাজের জন্য কয়েকটি ছোট ও সহিহ দোয়া আরবি, উচ্চারণ ও অর্থসহ বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।

বিতর নামাজে দোয়া কুনুত পাঠের গুরুত্ব ও হুকুম

বিতর সালাতে দোয়া পাঠ করা অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ আমল। ফকিহদের একাংশের মতে বিতরের দোয়া ওয়াজিব এবং অধিকাংশের মতে এটি সুন্নাতে মুয়াক্কাদা। রাসুলুল্লাহ (সা.) নিয়মিত বিতর নামাজ আদায় করতেন এবং রাতের সালাতকে বেজোড় সংখ্যার মাধ্যমে শেষ করার নির্দেশ দিয়েছেন। বিতরের শেষ রাকাতে আল্লাহর দরবারে বিনয় ও নম্রতার সাথে প্রার্থনা করার মাধ্যমে বান্দার আধ্যাত্মিক সংযোগ মজবুত হয়। দীর্ঘ দোয়া মুখস্থ না থাকলে ছোট ছোট সুন্নাহসম্মত দোয়ার মাধ্যমেও এই আমলটি সুন্দরভাবে সম্পন্ন করা যায়।

বিতর নামাজের সহিহ ও ছোট দোয়া সমূহ

উইতর নামাজে কুনুত হিসেবে পড়ার জন্য রাসুলুল্লাহ (সা.) এবং সাহাবায়ে কেরাম থেকে প্রমাণিত কয়েকটি বিশুদ্ধ ও সংক্ষিপ্ত দোয়া নিচে তুলে ধরা হলো:

১. 'আল্লাহুম্মাহদিনী' দোয়া (হাসান ইবনে আলী রা. কর্তৃক বর্ণিত)

এই দোয়াটি উইতরের কুনুত হিসেবে সবচেয়ে প্রসিদ্ধ এবং বিশুদ্ধতম। রাসুলুল্লাহ (সা.) স্বয়ং তাঁর দৌহিত্র হাসান (রা.)-কে উইতরের নামাজে পড়ার জন্য এই দোয়াটি শিখিয়েছিলেন।

اللَّهُمَّ اهْدِنِي فِيمَنْ هَدَيْتَ، وَعَافِنِي فِيمَنْ عَافَيْتَ، وَتَوَلَّنِي فِيمَنْ تَوَلَّيْتَ، وَبَارِكْ لِي فِيمَا أَعْطَيْتَ، وَقِنِي شَرَّ مَا قَضَيْتَ، فَإِنَّكَ تَقْضِي وَلَا يُقْضَى عَلَيْكَ، وَإِنَّهُ لَا يَذِلُّ مَنْ وَالَيْتَ، وَلَا يَعِزُّ مَنْ عَادَيْتَ، تَبَارَكْتَ رَبَّنَا وَتَعَالَيْتَ

উচ্চারণ: আল্লাহুম্মাহদিনী ফীমান হাদাইত, ওয়া আফিনী ফীমান আফাইত, ওয়া তাওয়াল্লানী ফীমান তাওয়াল্লাইত, ওয়া বারিক লী ফীমা আত্বাইত, ওয়া ক্বিনী শাররা মা ক্বাদাইত, ফাইন্নাকা তাক্বদ্বী ওয়া লা ইয়ুক্বদ্বা আলাইক, ওয়া ইন্নাহু লা ইয়াযিল্লু মাও ওয়ালাইত, ওয়া লা ইয়াউইযযু মান আদাইত, তাবারাক্তা রাব্বানা ওয়া তাআলাইত।

অনুবাদ: হে আল্লাহ! তুমি যাদের হেদায়েত করেছ আমাকে তাদের অন্তর্ভুক্ত করো, যাদের তুমি ক্ষমা ও নিরাপত্তা দান করেছ আমাকে তাদের দলভুক্ত করো, যাদের তুমি অভিভাবক হয়েছ আমারও অভিভাবক হয়ে যাও। তুমি আমাকে যা দান করেছ তাতে বরকত দাও। তুমি যে ফয়সালা করেছ তার অনিষ্ট থেকে আমাকে রক্ষা করো। নিশ্চয়ই তুমি চূড়ান্ত ফয়সালাকারী, তোমার ওপর কেউ ফয়সালা করতে পারে না। তুমি যার বন্ধু হয়েছ সে কখনো অপমানিত হয় না, আর তুমি যার সাথে শত্রুতা করেছ সে কখনো সম্মানিত হতে পারে না। হে আমাদের রব! তুমি বরকতময় ও সুউচ্চ। (সুনানে তিরমিযী, হাদিস ৪৬৪, ইমাম তিরমিযী একে হাসান বলেছেন)।

২. 'আল্লাহুম্মা ইন্নি আউযু বিরিদাকা' দোয়া (আলী রা. কর্তৃক বর্ণিত)

এটি অত্যন্ত চমৎকার ও সংক্ষিপ্ত একটি দোয়া, যা আলী (রা.) থেকে বর্ণিত। রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁর উইতরের শেষভাগে এই দোয়ার মাধ্যমে আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা করতেন।

اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِرِضَاكَ مِنْ سَخَطِكَ، وَبِمُعَافَاتِكَ مِنْ عُقُوبَتِكَ، وَأَعُوذُ بِكَ مِنْكَ، لَا أُحْصِي ثَنَاءً عَلَيْكَ أَنْتَ كَمَا أَثْنَيْتَ عَلَى نَفْسِكَ

উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা ইন্নি আউযু বিরিদাকা মিন সাখাতিকা, ওয়া বিমুআফাতিকা মিন উকুবাতিকা, ওয়া আউযু বিকা মিনকা, লা উহসী ছানাআন আলাইকা আনতা কামা আসনাইতা আলা নাফসিকা।

অনুবাদ: হে আল্লাহ! আমি তোমার অসন্তুষ্টি থেকে তোমার সন্তুষ্টির মাধ্যমে আশ্রয় চাই, তোমার শাস্তি থেকে তোমার ক্ষমার মাধ্যমে আশ্রয় প্রার্থনা করি। আমি তোমার কাছে তোমারই আশ্রয় চাই। তোমার প্রশংসা গুনে আমি শেষ করতে পারব না; তুমি ঠিক তেমনই, যেমনটি তুমি নিজের প্রশংসা নিজে করেছ। (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস ১৪২৭, আল-আলবানি একে সহিহ বলেছেন)।

৩. প্রচলিত দীর্ঘ দোয়া কুনুত (ইবনে মাসউদ রা. এর আমল)

হানাফি মাযহাবে সাধারণত যে দীর্ঘ দোয়া কুনুতটি পড়া হয় (আল্লাহুম্মা ইন্না নাস্তাইনুকা...), সেটি প্রখ্যাত সাহাবি আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.)-এর আমল ও বর্ণনা দ্বারা প্রমাণিত। এটিও পড়া সম্পূর্ণ জায়েজ এবং ফজিলতপূর্ণ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস ১৪২৫)। তবে যারা এটি পড়তে পারেন না, তারা ওপরের দুটি ছোট দোয়ার যেকোনো একটি অনায়াসে পড়তে পারেন।

দোয়া কুনুত আদায়ের সঠিক পদ্ধতি ও সময়

উইতর নামাজে দোয়া কুনুত পড়ার স্থান নিয়ে ফকিহদের মধ্যে ইজতিহাদগত মতপার্থক্য রয়েছে। হানাফি ফিকহ অনুযায়ী, তৃতীয় রাকাতে রুকুতে যাওয়ার পূর্বে তাকবির বলে হাত কান পর্যন্ত উঠিয়ে পুনরায় হাত বেঁধে এই দোয়া পড়তে হয়। অন্যদিকে শাফিঈ ও হাম্বলি মাযহাবের নিয়ম অনুযায়ী, রুকু থেকে উঠে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে হাত বুক পর্যন্ত তুলে এই দোয়া পাঠ করা হয়। সুন্নাহর আলোকে উভয় পদ্ধতিই জায়েজ এবং দলিল দ্বারা প্রমাণিত। যদি কোনো ব্যক্তির মাসনূন দোয়াগুলোর একটিও মুখস্থ না থাকে, তবে তিনি সাময়িকভাবে পবিত্র কোরআনে বর্ণিত যেকোনো সাধারণ দোয়া (যেমন: রাব্বানা আতিনা ফিদ্দুনিয়া...) পড়েও নামাজের ওয়াজিব বা সুন্নতের দায়িত্ব আদায় করতে পারেন।

References

Quranic Ayahs

Hadith

দোয়া কুনুত কি শুধু একটিই, নাকি ছোট দোয়াও পড়া যায়?

দোয়া কুনুত কোনো একটি নির্দিষ্ট দোয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। হানাফি মাযহাবে প্রচলিত দীর্ঘ দোয়ার পাশাপাশি রাসুলুল্লাহ (সা.) থেকে প্রমাণিত অত্যন্ত চমৎকার ও সংক্ষিপ্ত দোয়া (যেমন: 'আল্লাহুম্মাহদিনী...' বা 'আল্লাহুম্মা ইন্নি আউযু...') উইতরের কুনুত হিসেবে পড়া সম্পূর্ণ জায়েজ এবং সুন্নাহসম্মত।

ছোট দোয়া বা কুনুত সম্পূর্ণ ভুলে গেলে নামাজ কি ভেঙে যাবে?

দোয়া কুনুত ভুলে গেলে নামাজ ভঙ্গ বা বাতিল হয় না। হানাফি মাযহাব অনুযায়ী যেহেতু কুনুত পড়া ওয়াজিব, তাই এটি ভুলে গেলে নামাজের শেষ বৈঠকে সাহু সিজদা (সেজদায়ে সাহু) দেওয়া আবশ্যক। সাহু সিজদা দিলে নামাজ পরিপূর্ণ শুদ্ধ হয়ে যাবে। আর শাফিঈ ও হাম্বলি মতে এটি সুন্নত হওয়ায় সাহু সিজদা ছাড়াই নামাজ হয়ে যায়, তবে দেওয়াটা উত্তম।

দোয়া কুনুত পড়ার সময় হাত তোলার নিয়ম কী?

পদ্ধতিগত পার্থক্যের কারণে হাত তোলার নিয়মও ভিন্ন। হানাফি পদ্ধতিতে রুকুর পূর্বে কুনুত পড়ার আগে একবার হাত কান পর্যন্ত উঠিয়ে তাকবির বলে আবার নাভির নিচে হাত বেঁধে নিঃশব্দে দোয়া পড়া হয়। আর শাফিঈ ও হাম্বলি পদ্ধতিতে রুকু থেকে উঠে হাত বুক পর্যন্ত তুলে দোয়ার মতো করে স্বাভাবিকভাবে ধরে কুনুত পাঠ করা হয়।

উপসংহার

ইসলামী শরিয়ত মানবজাতির জন্য অত্যন্ত সহজ এবং সাবলীল। উইতর নামাজে দোয়া কুনুত পাঠের ক্ষেত্রে দীর্ঘ দোয়ার পাশাপাশি সংক্ষিপ্ত ও সহিহ সুন্নাহভিত্তিক দোয়াগুলো পড়া আমাদের জন্য অত্যন্ত সহজ অপশন। যারা দীর্ঘ দোয়া মুখস্থ করতে হিমশিম খাচ্ছেন, তারা আজই রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর শেখানো এই ছোট ছোট দোয়াগুলো শিখে নিয়মিত আমল করতে পারেন। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সুন্নাহ মোতাবেক ইবাদত করার তৌফিক দান করুন। আমীন।

আব্দুর রহমান

আব্দুর রহমান

এসইও স্পেশালিস্ট ও কনটেন্ট রাইটার

আব্দুর রহমান একজন এসইও স্পেশালিস্ট এবং ইসলামিক কনটেন্ট রাইটার। তিনি ফিকহ, দৈনন্দিন ইবাদত, নামাজ, পারিবারিক দিকনির্দেশনা এবং বাস্তব মুসলিম জীবনধারা নিয়ে সহজ প্রবন্ধ লেখেন, যাতে পাঠকরা প্রতিদিনের জীবনে ইসলাম অনুসরণ করতে পারেন।

আপডেট থাকুন

আমাদের সর্বশেষ আপডেট ও রিলিজ মিস করবেন না