সালাওয়াত ইব্রাহিমিয়া (যা আমাদের সমাজে সাধারণত 'দরূদে ইব্রাহিম' নামে পরিচিত) ইসলামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি জিকির ও ইবাদত। এটি এমন একটি বিশেষ দরূদ যা প্রত্যেক ফরজ, ওয়াজিব, সুন্নত ও নফল নামাজের শেষ বৈঠকে তাশাহহুদ বা আত্তাহিয়্যাতু পড়ার পর পাঠ করা অত্যন্ত জরুরি। এই দরূদে মহান আল্লাহ তাআলার কাছে তাঁর প্রিয়তম রাসুল হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং তাঁর পরিবার-পরিজনের জন্য রহমত ও বরকত প্রার্থনা করা হয়। নিচে সহিহ হাদিসের আলোকে সালাওয়াত ইব্রাহিমিয়ার বিশুদ্ধ আরবি, বাংলা উচ্চারণ, অর্থ, নামাজে এর বিধান ও অপরিসীম ফজিলত বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।
সালাওয়াত ইব্রাহিমিয়ার আরবি ও উচ্চারণ
নামাজ নিখুঁত ও কবুল হওয়ার জন্য সালাওয়াত ইব্রাহিমিয়ার প্রতিটি শব্দের বিশুদ্ধ উচ্চারণ জানা প্রতিটি মুসলিমের জন্য আবশ্যক। নিচে সহিহ বুখারির বর্ণনা অনুযায়ী এর মূল পাঠ দেওয়া হলো:
আরবি টেক্সট
বাংলা উচ্চারণ
অনুবাদ/উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা সাল্লি আলা মুহাম্মাদিওঁ ওয়া আলা আলি মুহাম্মাদিন, কামা সাল্লাইতা আলা ইবরাহীমা ওয়া আলা আলি ইবরাহীমা ইন্নাকা হামীদুম মাজীদ। আল্লাহুম্মা বারিক আলা মুহাম্মাদিওঁ ওয়া আলা আলি মুহাম্মাদিন, কামা বারাকতা আলা ইবরাহীমা ওয়া আলা আলি ইবরাহীমা ইন্নাকা হামীদুম মাজীদ।
বাংলা অর্থ
অনুবাদ: হে আল্লাহ! আপনি মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এবং তাঁর বংশধর ও অনুসারীদের ওপর রহমত বর্ষণ করুন, যেমন আপনি রহমত বর্ষণ করেছেন ইব্রাহিম (আলাইহিস সালাম) ও তাঁর বংশধরদের ওপর। নিশ্চয়ই আপনি পরম প্রশংসিত ও মহিমান্বিত। হে আল্লাহ! আপনি মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এবং তাঁর বংশধর ও অনুসারীদের ওপর বরকত নাজিল করুন, যেমন আপনি বরকত নাজিল করেছেন ইব্রাহিম (আলাইহিস সালাম) ও তাঁর বংশধরদের ওপর। নিশ্চয়ই আপনি পরম প্রশংসিত ও মহিমান্বিত।
সালাওয়াত ইব্রাহিমিয়ার শব্দার্থ ও আধ্যাত্মিক ব্যাখ্যা
এই মহান দরূদটির প্রধানত দুটি অংশ রয়েছে। প্রথম অংশে আল্লাহর কাছে প্রিয় নবী (সা.)-এর জন্য 'সালাত' তথা বিশেষ রহমত ও ফেরেশতাদের মজলিসে তাঁর উচ্চ মর্যাদা ঘোষণার প্রার্থনা করা হয়, যা হযরত ইব্রাহিম (আ.)-এর প্রতি করা হয়েছিল। দ্বিতীয় অংশে 'বারাকাত' তথা নবীজির দ্বীন, উম্মত এবং তাঁর পবিত্র স্মৃতির চিরস্থায়ী কল্যাণ ও প্রবৃদ্ধি কামনা করা হয়। এখানে আল্লাহর দুটি সুন্দর গুণবাচক নাম ব্যবহার করা হয়েছে—'হামিদ' (যিনি সৃষ্টিজগতের সমস্ত প্রশংসার একমাত্র মালিক) এবং 'মাজিদ' (যিনি পরম গৌরব ও সুমহান মর্যাদার অধিকারী)। নামাজের মধ্যে এই দুটি নামের স্মরণের মাধ্যমে বান্দার তাওহিদ ও রিসালাতের প্রতি আনুগত্য পূর্ণতা পায়।
নামাজে সালাওয়াত ইব্রাহিমিয়া পড়ার সঠিক নিয়ম ও বিধান
নামাজে এই দরূদটি পড়ার ক্ষেত্রে ইসলামী শরিয়তে সুনির্দিষ্ট নিয়ম রয়েছে, যা জানা জরুরি:
- শেষ বৈঠক: দুই, তিন বা চার রাকাত বিশিষ্ট যেকোনো নামাজের শেষ রাকাতে, তাশাহহুদ বা আত্তাহিয়্যাতু পড়ার পরপরই এই দরূদ পড়া সুন্নতে মুয়াক্কাদা (হানাফি মাজহাব মতে) এবং অনেক ইমামের (যেমন ইমাম শাফেয়ী ও ইমাম আহমাদ) মতে এটি নামাজের অন্যতম রুকন বা ফরজ, যা না পড়লে নামাজই হবে না। তাই নামাজ শুদ্ধ করার স্বার্থে এটি কখনোই বাদ দেওয়া যাবে না।
- প্রথম বৈঠক: তিন বা চার রাকাত বিশিষ্ট নামাজের দ্বিতীয় রাকাতে (প্রথম বৈঠকে) কেবল তাশাহহুদ পড়ে দাঁড়িয়ে যেতে হবে। প্রথম বৈঠকে ভুলবশত সালাওয়াত ইব্রাহিমিয়ার প্রথমাংশ (যেমন 'আল্লাহুম্মা সাল্লি আলা মুহাম্মাদ' পর্যন্ত) বা সম্পূর্ণ পড়ে ফেললে হানাফি মাজহাব অনুযায়ী নামাজের শেষে সাহু সিজদা দেওয়া ওয়াজিব।
- বসার অবস্থা: দরূদ পড়ার সময় আলাদা কোনো নিয়মে হাত নাড়াতে হয় না। তাশাহহুদ পড়ার সময় হাত যেভাবে উরুর ওপর রাখা হয়েছিল এবং শাহাদাত আঙুল দিয়ে যেভাবে তাওহিদের ইশারা বজায় রাখা হয়েছিল, ঠিক সেভাবেই স্থির থেকে শান্তভাবে দরূদ পাঠ করতে হবে।
সালাওয়াত ইব্রাহিমিয়া পাঠের অপরিসীম ফজিলত
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওপর দরূদ পাঠ করার সওয়াব ও মর্যাদা অপরিসীম। নামাজের বাইরে এবং বিশেষ করে জুমার দিনে এই দরূদ পাঠের বিশেষ তাগিদ রয়েছে। হাদিসে বর্ণিত ফজিলতগুলো নিম্নরূপ:
- দশটি রহমত লাভ: রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি আমার প্রতি একবার দরূদ পাঠ করবে, মহান আল্লাহ তার ওপর দশটি রহমত নাজিল করবেন। সহীহ মুসলিম, হাদিস ৩৮৪
- গুনাহ মাফ ও মর্যাদা বৃদ্ধি: সুনানে নাসায়ির সহিহ সনদে বর্ণিত হাদিস অনুযায়ী, একবার দরূদ শরীফ পাঠ করলে আল্লাহ বান্দার দশটি গুনাহ খাতা মাফ করে দেন এবং আল্লাহর দরবারে তার মর্যাদা দশ গুণ বৃদ্ধি করে দেন।
- দোয়া কবুলের মাধ্যম: যেকোনো মুনাজাত বা দোয়ার শুরুতে এবং শেষে আল্লাহর প্রশংসার সাথে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ওপর দরূদ পাঠ করলে সেই দোয়া আল্লাহর দরবারে দ্রুত কবুল হয়।
সালাওয়াত ইব্রাহিমিয়া আদায়ের ক্ষেত্রে সাধারণ কিছু ভুল
অনেকে তাড়াহুড়ো করে নামাজ আদায়ের সময় কিছু সাধারণ ভুল করে থাকেন, যা বর্জন করা উচিত:
- অশুদ্ধ উচ্চারণ ও তাশদিদ বাদ দেওয়া: 'সাল্লি' শব্দের লামের ওপর তাশদিদ না দিয়ে সাধারণ 'সলি' বলা কিংবা 'বারেক' শব্দের উচ্চারণ বিকৃত করা। এতে দোয়ার মূল অর্থ ব্যাহত হতে পারে।
- শব্দ বাদ দেওয়া: দ্রুত পড়তে গিয়ে অনেকে 'আলি মুহাম্মাদ' (মুহাম্মাদের পরিবার)-এর 'আলি' শব্দ বা বাক্যের মাঝের অংশ বাদ দিয়ে যান। ধীরস্থিরভাবে প্রতিটি শব্দ স্পষ্ট উচ্চারণ করা সুন্নাহ।
References
Quranic Ayahs
- সূরা আল-আহজাব, ৩৩:৫৬ — মুমিনদের প্রতি নবী করিম (সা.)-এর ওপর সালাত ও সালাম প্রেরণের ঐশ্বরিক নির্দেশ।
Hadith
- সহীহ বুখারী, হাদিস ৬Check৫৭ (অধ্যায়: দাওয়াত) — সাহাবিদের প্রশ্নের জবাবে রাসুলুল্লাহ (সা.) কর্তৃক সালাওয়াত ইব্রাহিমিয়া শিক্ষা দেওয়ার বিবরণ।
- সহীহ মুসলিম, হাদিস ৪০৬ — নামাজে তাশাহহুদের পর দরূদ পাঠের পদ্ধতি ও শব্দমালা।
- সহীহ মুসলিম, হাদিস ৩৮৪ — একবার দরূদ পাঠ করলে দশবার রহমত বর্ষণের ফজিলত।
- সুনানে নাসায়ী, হাদিস ১২৯৭ (অধ্যায়: সাহু) — দরূদ পাঠের মাধ্যমে দশটি গুনাহ মাফ ও দশটি মর্যাদা বৃদ্ধির সহিহ বিবরণ।

