দরুদে ইব্রাহিম: সালাতে পড়ার নিয়ম, সহিহ আরবি ও বাংলা অর্থ

আব্দুর রহমান
আব্দুর রহমান
১২ জুল, ২০২৬সালাত

নামাজ বা সালাত হলো মুমিনের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দৈনন্দিন ইবাদত। সালাতকে নিখুঁত ও আল্লাহর দরবারে গ্রহণযোগ্য করতে এর প্রতিটি রুকন ও ওয়াজিব বিধান সুন্নাহ মোতাবেক আদায় করা আবশ্যক। নামাজের শেষ বৈঠকে তাশাহহুদ বা আত্তাহিয়্যাতু পাঠ করার পর একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আমল হলো আল্লাহর রাসুল (সা.)-এর প্রতি দরুদ পাঠ করা। এই দরুদটি ইসলামী শরিয়তে 'দরুদে ইব্রাহিম' নামে পরিচিত। নিচে এই দরুদের সহিহ আরবি পাঠ, বিশুদ্ধ উচ্চারণ, অর্থ এবং সালাতে এর আইনি বিধান ও ফজিলত নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।

সালাতে দরুদে ইব্রাহিম পাঠের আইনি বিধান

নামাজের শেষ বৈঠকে তাশাহহুদ পাঠের পর রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ওপর দরুদ পাঠ করা হানাফী মাজহাবের নির্ভরযোগ্য মতানুযায়ী সুন্নতে মুয়াক্কাদা, তবে কোনো কোনো ফকীহ (যেমন ইমাম শাফেয়ী ও ইমাম আহমাদ) একে নামাজের অন্যতম ফরজ বা রুকন হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তাই নামাজের পূর্ণতা ও শুদ্ধতার জন্য শেষ বৈঠকে এটি পাঠ করা অত্যন্ত জরুরি। কাব ইবনে উজরা (রা.) থেকে বর্ণিত, সাহাবিগণ রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে জিজ্ঞাসা করলেন, "হে আল্লাহর রাসুল! আপনার ওপর কীভাবে দরুদ পাঠ করতে হবে?" তখন তিনি এই দরুদে ইব্রাহিম শিক্ষা দেন (সহীহ বুখারী, হাদিস ৬৩৫৭)।

দরুদে ইব্রাহিমের সহিহ আরবি, উচ্চারণ ও অর্থ

হাদিস গ্রন্থে বর্ণিত সবচেয়ে বিশুদ্ধ ও নির্ভরযোগ্য শব্দবিন্যাসটি নিচে উপস্থাপন করা হলো:

اللَّهُمَّ صَلِّ عَلَى مُحَمَّدٍ وَعَلَى آلِ مُحَمَّদٍ كَمَا صَلَّيْتَ عَلَى إِبْرَاهِيمَ وَعَلَى آلِ إِبْرَاهِيمَ إِنَّكَ حَمِيدٌ مَجِيدٌ، اللَّهُمَّ بَارِكْ عَلَى مُحَمَّدٍ وَعَلَى آلِ مُحَمَّদٍ كَمَا بَارَكْتَ عَلَى إِبْرَاهِيمَ وَعَلَى آلِ إِبْرَاهِيمَ إِنَّكَ حَمِيدٌ مَجِيدٌ


উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা সাল্লি আলা মুহাম্মাদিন ওয়া আলা আলি মুহাম্মাদিন, কামা সাল্লাইতা আলা ইব্রাহিমা ওয়া আলা আলি ইব্রাহিমা, ইন্নাকা হামিদুম মাজিদ। আল্লাহুম্মা বারিক আলা মুহাম্মাদিন ওয়া আলা আলি মুহাম্মাদিন, কামা বারাকতা আলা ইব্রাহিমা ওয়া আলা আলি ইব্রাহিমা, ইন্নাকা হামিদুম মাজিদ।

অনুবাদ: হে আল্লাহ! আপনি মুহাম্মদ ও মুহাম্মদের বংশধরদের ওপর রহমত বর্ষণ করুন, যেমন আপনি রহমত বর্ষণ করেছিলেন ইব্রাহিম ও ইব্রাহিমের বংশধরদের ওপর। নিশ্চয়ই আপনি প্রশংসিত ও মহিমান্বিত। হে আল্লাহ! আপনি মুহাম্মদ ও মুহাম্মদের বংশধরদের ওপর বরকত নাজিল করুন, যেমন আপনি বরকত নাজিল করেছিলেন ইব্রাহিম ও ইব্রাহিমের বংশধরদের ওপর। নিশ্চয়ই আপনি প্রশংসিত ও মহিমান্বিত।

হাদিসের সূত্র: এই বিশুদ্ধ রূপটি ইমাম বুখারী ও ইমাম মুসলিম বর্ণনা করেছেন (সহীহ বুখারী, হাদিস ৬৩৫৭; সহিহ মুসলিম, হাদিস ৯০৭)।

দরুদে ইব্রাহিমের ফজিলত ও গুরুত্ব

সালাতের ভেতরে কিংবা বাইরে দরুদ পাঠের ফজিলত অপরিসীম। আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল আস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে বলতে শুনেছেন, "যে ব্যক্তি আমার ওপর একবার দরুদ পাঠ করবে, আল্লাহ তাআলা তার ওপর দশবার রহমত নাজিল করবেন" (সহিহ মুসলিম, হাদিস ৯০৮)। এছাড়া দরুদ পাঠের মাধ্যমে বান্দার মোনাজাত ও দোয়া আল্লাহর দরবারে দ্রুত কবুল হয়। ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) বলেন, "নিশ্চয়ই দোয়া আকাশ ও পৃথিবীর মাঝখানে ঝুলন্ত অবস্থায় থাকে, তার কোনো কিছুই ওপরে আরোহণ করে না যতক্ষণ না তুমি তোমার নবীর ওপর দরুদ পাঠ করো" (সুনানে তিরমিজি, হাদিস ৪৮৬, ইমাম আল-অ্যালবানি কর্তৃক হাসানgraded)।

সালাতে দরুদ পাঠের সঠিক সময় ও নিয়মাবলী

নামাজে দরুদে ইব্রাহিম পাঠের সুনির্দিষ্ট কিছু নিয়ম রয়েছে, যা প্রতিটি মুসলিমের জেনে রাখা উচিত:

  • শেষ বৈঠক: দুই রাকাত, তিন রাকাত কিংবা চার রাকাতবিশিষ্ট নামাজের একদম শেষ বৈঠকে তাশাহহুদ (আত্তাহিয়্যাতু) পুরো শেষ করার পর দরুদে ইব্রাহিম পাঠ করতে হয়।
  • প্রথম বৈঠকে নিষেধাজ্ঞা: তিন বা চার রাকাতবিশিষ্ট নামাজের প্রথম বৈঠকে (যেমন মাগরিবের দ্বিতীয় রাকাতে বা যোহরের দ্বিতীয় রাকাতে) তাশাহহুদের পর দরুদ পড়া যাবে না। ভুলবশত প্রথম বৈঠকে দরুদ পড়ে ফেললে হানাফী ফিকহ অনুযায়ী নামাজের শেষে সাহু সেজদা দেওয়া ওয়াজিব।
  • দরুদের পর আমল: সালাতের শেষ বৈঠকে দরুদে ইব্রাহিম পাঠ শেষ করার পর সালাম ফিরানোর আগে নিজের জন্য গুনা মাফের মাসনুন দোয়া (দোয়া মাসুরা) পাঠ করা সুন্নাত।

আমলের ক্ষেত্রে সাধারণ ভুলত্রুটি ও সতর্কতা

অনেকেই না বুঝে নামাজে দরুদ পাঠের সময় কিছু ভুল করে থাকেন, যা বর্জন করা আবশ্যক:

  • উচ্চারণ বিকৃত করা: তাড়াহুড়ো করে পড়ার সময় অনেকে 'সাল্লি'-কে 'সালি' বা 'বারিক'-কে 'বারি' উচ্চারণ করেন, যা সম্পূর্ণ ভুল। আরবির হরফ ও হরকত সঠিকভাবে আদায় করতে হবে।
  • নামাজের বাইরে অন্য দরুদ: নামাজের শেষ বৈঠকে কেবল হাদিসে বর্ণিত দরুদে ইব্রাহিমই পাঠ করতে হবে। নামাজের বাইরে প্রচলিত অন্যান্য মনগড়া বা সংক্ষিপ্ত দরুদ সালাতের শেষ বৈঠকে পাঠ করলে নামাজের সুন্নাত আদায় হবে না।
  • বাংলা উচ্চারণের ওপর নির্ভরতা: নামাজের ভেতরের সমস্ত জিকর মূল আরবিতে উচ্চারণ করা আবশ্যক। সাময়িকভাবে যারা আরবি পারেন না, তারা বাংলা উচ্চারণ দেখে শিখতে পারেন, তবে দ্রুততম সময়ে মূল আরবি উচ্চারণ আয়ত্ত করা ওয়াজিব।

উপসংহার

দরুদে ইব্রাহিম মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর প্রতি ভালোবাসার এক অনন্য নিদর্শন। নামাজের শেষ বৈঠকে ধীরস্থিরভাবে অর্থ উপলব্ধি করে এই দরুদ পাঠ করলে অন্তরে খুশু-খুজু সৃষ্টি হয় এবং সালাত আল্লাহর দরবারে মকবুল হয়। আমাদের প্রত্যেকের উচিত দরুদের প্রতিটি শব্দের সঠিক উচ্চারণ ও অর্থ জেনে নেওয়া এবং দৈনন্দিন জীবনে সালাতকে আরও জীবন্ত ও মর্যাদাপূর্ণ করা। আল্লাহ আমাদের সবাইকে সুন্নাহ মোতাবেক আমল করার তাওফিক দিন। আমীন।

রেফারেন্স

হাদিস

  • সহীহ বুখারী, হাদিস ৬ badges৩৫৭ (অধ্যায়: দোয়া ও দাওয়াত) — কাব ইবনে উজরা (রা.) থেকে বর্ণিত দরুদে ইব্রাহিমের মূল রূপ।
  • সহিহ মুসলিম, হাদিস ৯০৭ (অধ্যায়: সালাত) — নামাজের শেষ বৈঠকে দরুদ পাঠের সুন্নাহ।
  • সহিহ মুসলিম, হাদিস ৯০৮ — একবার দরুদ পাঠে ১০টি রহমত লাভের ফজিলত।
  • সুনানে তিরমিজি, হাদিস ৪৮৬ — দরুদ ব্যতীত দোয়া ঝুলন্ত থাকার বিবরণ।

প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)

সালাতে দরুদে ইব্রাহিম পড়তে ভুলে গেলে কি নামাজ ভেঙে যাবে?

হানাফী মাজহাবের ফতোয়া অনুযায়ী, নামাজের শেষ বৈঠকে দরুদে ইব্রাহিম পাঠ করা সুন্নতে মুয়াক্কাদা, ওয়াজিব বা ফরজ নয়। অতএব, কেউ যদি ভুলবশত এটি পড়তে ভুলে গিয়ে সালাম ফিরিয়ে ফেলে, তবে তার নামাজ ভেঙে যাবে না এবং নামাজ শুদ্ধ হয়ে যাবে। তবে ইচ্ছাকৃতভাবে এটি বর্জন করা অত্যন্ত গুনাহের কাজ এবং এর ফলে নামাজের সওয়াব ও পূর্ণতা বিনষ্ট হয়।

নামাজের বাইরে কি দরুদে ইব্রাহিম পড়া যাবে?

হ্যাঁ, নামাজের বাইরেও যেকোনো সাধারণ সময়ে, বিশেষ করে জুমার দিনে, মোনাজাত বা দোয়ার শুরুতে ও শেষে দরুদে ইব্রাহিম পাঠ করা অত্যন্ত বরকতময় ও সর্বোত্তম দরুদ। তবে নামাজের বাইরে অন্যান্য সহিহ সংক্ষিপ্ত দরুদ (যেমন: সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) পাঠ করলেও দরুদ পাঠের সওয়াব অর্জিত হবে।

দরুদ পাঠের সময় 'সায়্যিদিনা' (Sayyidina) শব্দ যোগ করা কি নামাজের ভেতরে জায়েজ?

রাসুলুল্লাহ (সা.) সাহাবিদের নামাজের ভেতরে যে দরুদ শিক্ষা দিয়েছেন, তাতে 'সায়্যিদিনা' শব্দ ছিল না। তাই ফকীহদের বিশুদ্ধতম মতানুযায়ী, নামাজের ভেতরে হুবহু হাদিসের শব্দবিন্যাস বজায় রেখে 'সায়্যিদিনা' শব্দ যোগ না করে পড়াই উত্তম ও সুন্নতের অধিক নিকটবর্তী। তবে নামাজের বাইরে সম্মান প্রদর্শনার্থে রাসুল (সা.)-এর নামের আগে সায়্যিদিনা বলা সম্পূর্ণ জায়েজ।

নারীদের জন্য কি দরুদে ইব্রাহিম পাঠের নিয়ম আলাদা?

না, সালাতের জিকর, তাসবিহ ও দোয়ার ক্ষেত্রে নারী ও পুরুষের মাঝে কোনো বৈষম্য বা ভিন্নতা নেই। পুরুষদের মতো নারীদেরও নামাজের শেষ বৈঠকে তাশাহহুদের পর একইভাবে সম্পূর্ণ দরুদে ইব্রাহিম পাঠ করতে হবে।
আব্দুর রহমান

আব্দুর রহমান

এসইও স্পেশালিস্ট ও কনটেন্ট রাইটার

আব্দুর রহমান একজন এসইও স্পেশালিস্ট এবং ইসলামিক কনটেন্ট রাইটার। তিনি ফিকহ, দৈনন্দিন ইবাদত, নামাজ, পারিবারিক দিকনির্দেশনা এবং বাস্তব মুসলিম জীবনধারা নিয়ে সহজ প্রবন্ধ লেখেন, যাতে পাঠকরা প্রতিদিনের জীবনে ইসলাম অনুসরণ করতে পারেন।

আপডেট থাকুন

আমাদের সর্বশেষ আপডেট ও রিলিজ মিস করবেন না