ইকামত হলো জামাতে ফরয নামাজ শুরু করার আগে কাতারবদ্ধ মুসল্লিদের সালাতে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়ে উচ্চারিত সুনির্দিষ্ট কিছু আরবী বাক্য। ইসলামে জামাতে সালাত আদায়ের ক্ষেত্রে ইকামত দেওয়া পুরুষদের জন্য সুন্নাতে মুয়াক্কাদায়ে কিফায়া। আযানের মাধ্যমে যেমন মসজিদের বাইরে থাকা মানুষদের আহ্বান জানানো হয়, তেমনি ইকামতের মাধ্যমে উপস্থিত মুসল্লিদের কাতার সোজা করে নামাজে দাঁড়ানোর চূড়ান্ত সংকেত দেওয়া হয়। তবে অনেক সময় মুয়াজ্জিন কিংবা সাধারণ মুসল্লিগণ ইকামতের সময় কিছু অসতর্কতামূলক ভুল করে বসেন, যা সুন্নাহ পদ্ধতির পরিপন্থী। এই নিবন্ধে ইকামতের সঠিক নিয়ম ও ইকামতের সময় করা সাধারণ কিছু ভুল নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।
ইকামতের গুরুত্ব ও সুন্নাহসম্মত পদ্ধতি
ইসলামী শরীয়তে ইকামতের গুরুত্ব অপরিসীম। আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর যুগে আযানের শব্দ দুবার করে এবং ইকামতের শব্দ একবার করে (জোড়ায় জোড়ায় তবে কিছু বাক্য এককভাবে) বলার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। ইকামতের শব্দগুলো আযানের তুলনায় কিছুটা দ্রুত কিন্তু স্পষ্ট উচ্চারণে মেলা খতম করে বলা সুন্নাত। আযানের মতো ইকামতের শব্দগুলোর মাঝে দীর্ঘ বিরতি দেওয়া অনুচিত। ইকামত দেওয়ার সময় মুয়াজ্জিন বা ইকামতদাতার ওযু অবস্থায় থাকা সুন্নাত এবং কিবলামুখী হয়ে দাঁড়ানো আবশ্যক।
জামাতে ইকামতের সময় সাধারণ কিছু ভুলত্রুটি
জামাতে নামাজের প্রস্তুতি পর্ব বা ইকামতের সময় সাধারণত যেসকল ভুলত্রুটি পরিলক্ষিত হয়, তা নিচে আলোচনা করা হলো:
১. অতিরিক্ত তাড়াহুড়ো করে শব্দ অস্পষ্ট করা
অনেকে মনে করেন ইকামত মানেই খুব দ্রুত পড়তে হবে। এই ধারণার বশবর্তী হয়ে অনেক মুয়াজ্জিন এত দ্রুত বাক্যগুলো উচ্চারণ করেন যে, আরবী হরফ ও হরকত সঠিকভাবে আদায় হয় না। ফকীহগণের মতে, ইকামত আযানের চেয়ে কিছুটা দ্রুত পড়া সুন্নাত হলেও এত দ্রুত পড়া মাকরূহ যার ফলে শব্দ অস্পষ্ট বা বিকৃত হয়ে যায়। প্রতিটি বাক্য স্পষ্ট ও বোধগম্য হওয়া আবশ্যক।
২. ইকামতের শব্দাবলীর ভুল উচ্চারণ
আযানের মতো ইকামতের শব্দগুলোও তাওকীফী বা অপরিবর্তনীয়। অনেকে ইকামতের সময় আরবী ব্যাকরণগত ভুল করেন। যেমন—'কাদ কামাতিস সালাহ' বলার সময় 'সালাহ' শব্দের সোয়াদ (ص) অক্ষরটিকে সীন (س) এর মতো উচ্চারণ করা কিংবা 'হাইয়া আলাল ফালাহ' শব্দের 'ফালাহ' (الفَلَاح)-এর শেষে বড় 'হা' (ح) উচ্চারণ না করে ছোট 'হা' (ه) উচ্চারণ করা। এতে বাক্যের অর্থ বিকৃত হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।
৩. ইকামতের সময় অযথা কথাবার্তা বা অমনোযোগিতা
ইকামত শুরু হওয়ার পর মুসল্লিদের জন্য মনোযোগ সহকারে তা শ্রবণ করা এবং মনে মনে তার উত্তর দেওয়া সুন্নাত। কিন্তু অনেক সময় দেখা যায় ইকামত চলাকালেও মুসল্লিরা নিজেদের মধ্যে ফিসফিস করে কথা বলেন, মোবাইল ফোন বন্ধ করার পরিবর্তে অন্য কাজে মগ্ন থাকেন কিংবা দ্বীনি আলোচনা চালিয়ে যান। ইকামত শুরু হলে জিকির ও উত্তর দেওয়া ছাড়া অন্য যেকোনো কথা বলা ফকীহগণের মতে মাকরূহ।
৪. কাতার সোজা করতে অতিরিক্ত বিলম্ব করা
ইকামত শুরু হওয়ার সাথে সাথেই মুসল্লিদের কাতার সোজা করার প্রস্তুতি নেওয়া উচিত। অনেক জামাতে দেখা যায় ইকামত শেষ হয়ে যাওয়ার পরও মুসল্লিরা কাতার সোজা করেন না বা ইমাম সাহেবকে দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে কাতার ঠিক করার তাগিদ দিতে হয়। সুন্নাহ হলো, ইমামের তাকবিরে তাহরিমার পূর্বেই কাতার সম্পূর্ণ সোজা, সুবিন্যস্ত ও ফাঁকমুক্ত করা।
৫. ইকামতের ভুল জবাব দেওয়া
ইকামত শোনার সময় মুয়াজ্জিন যা বলেন, শ্রোতাও তা-ই মনে মনে বলবে। তবে 'হাইয়া আলাস সালাহ' ও 'হাইয়া আলাল ফালাহ' বলার সময় শ্রোতা বলবে 'লা হাওলা ওয়া লা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ'। কোনো কোনো দুর্বল বর্ণনার ওপর ভিত্তি করে অনেকে 'কাদ কামাতিস সালাহ' এর জবাবে 'আক্বামাহাল্লাহু ওয়া আদামাহা' বলে থাকেন; তবে মুহাদ্দিসগণের তাহকীক অনুযায়ী এই সংক্রান্ত হাদিসটি অত্যন্ত দুর্বল (দ্বয়ীফ)। তাই বিশুদ্ধ মত হলো, 'কাদ কামাতিস সালাহ' এর জবাবে হুবহু 'কাদ কামাতিস সালাহ' বলাই সুন্নাহসম্মত।
৬. ইমামের অনুমতি ছাড়া ইকামত শুরু করা
মুয়াজ্জিন বা অন্য কারো জন্য ইমামের সংকেত বা উপস্থিতি নিশ্চিত না হয়ে নিজের ইচ্ছামতো ইকামত শুরু করা অনুচিত। হাদিস শরীফে এসেছে, আযান দেওয়ার অধিকার মুয়াজ্জিনের আর ইকামত শুরু করার মূল সিদ্ধান্ত বা অধিকার ইমামের। ইমাম যখন নামাজের জন্য প্রস্তুত হয়ে কাতারমুখী হবেন বা সংকেত দেবেন, তখনই ইকামত শুরু করা সুন্নাহ।
ইকামত সংক্রান্ত কিছু গুরুত্বপূর্ণ শরয়ী মাসআলা
একাকী ফরয নামাজ আদায়ের সময়ও পুরুষদের জন্য ইকামত দেওয়া মুস্তাহাব ও ফযিলতপূর্ণ আমল, বিশেষ করে সফর অবস্থায় বা নির্জন স্থানে। নারীদের নিজস্ব নামাজের জামাত হোক বা একাকী নামাজ, তাদের জন্য আযান ও ইকামতের কোনো বিধান নেই, বরং তাদের কণ্ঠস্বরের পর্দা বজায় রাখার খাতিরে এটি করতে নিষেধ করা হয়েছে। ইকামতের পর ইমাম সাহেব কাতার সোজা করার জন্য যতটুকু সময় প্রয়োজন ততটুকু অপেক্ষা করবেন এবং কাতার সোজা নিশ্চিত হলে অনতিবিলম্বে তাকবিরে তাহরিমা বলে সালাত শুরু করবেন। ইকামতের পর দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হয়ে গেলে বা কোনো কারণে দীর্ঘক্ষণ কথা বললে পূর্বের ইকামত বাতিল হয়ে যায় এবং পুনরায় ইকামত দিতে হয়।
রেফারেন্স
কুরআনের আয়াত
- সূরা আল-বাক্বারাহ, ২:৪৩ — জামাতের সাথে রুকু ও সালাত কায়েম করার সাধারণ নির্দেশ।
হাদিস
- সহীহ বুখারী, হাদিস ৬০৫ (অধ্যায়: আযান) — বিলাল (রা.)-কে ইকামতের শব্দ জোড়ায় ও বিজোড়ায় বলার নির্দেশ সংক্রান্ত হাদিস।
- সহীহ মুসলিম, হাদিস ৩৭৮ (অধ্যায়: সালাত) — ইকামতের বাক্যসমূহের তারতীব ও সুন্নাহ পদ্ধতি।
- সুনানে আবু দাউদ, হাদিস ৫৩৭ — ইমামের অনুমতি ও প্রস্তুতি সাপেক্ষে ইকামত দেওয়ার নিয়ম।

