সালাতে অবৈধ দুআ: নামাযে যে ধরনের প্রার্থনা এড়িয়ে চলবেন

আব্দুর রহমান
আব্দুর রহমান
১২ জুল, ২০২৬সালাত

সালাত বা নামায হলো মুমিনের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। সালাতের মূল লক্ষ্যই হলো আল্লাহর দরবারে বিনয় ও একাগ্রতার সাথে নিজের হাজত বা প্রার্থনা পেশ করা। তবে সালাতের ভেতরে দুআ করার কিছু নির্দিষ্ট নিয়ম, আদব এবং সীমাবদ্ধতা রয়েছে। অনেকেই না বুঝে সালাতের মধ্যে এমন কিছু শব্দ বা বাক্য উচ্চারণ করেন, যা শরিয়তের দৃষ্টিতে গ্রহণযোগ্য নয়। নামাযের মধ্যে নির্দিষ্ট স্থান ও নিয়ম বহির্ভূত অবৈধ বা নিষিদ্ধ দুআ পাঠ করলে সালাত ত্রুটিপূর্ণ হতে পারে, এমনকি হানাফি মাজহাবসহ একাধিক ফিকহি দৃষ্টিকোণ থেকে সালাত বাতিলও হয়ে যেতে পারে। তাই শুদ্ধ ও মকবুল সালাত আদায়ের জন্য নামাযে কোন ধরনের দুআ এড়িয়ে চলতে হবে, তা জানা প্রতিটি মুসলিমের জন্য আবশ্যক।

সালাতে অবৈধ বা নিষিদ্ধ দুআ বলতে কী বোঝায়?

সালাতের ভেতরে যে সমস্ত প্রার্থনা বা শব্দ উচ্চারণ করার ব্যাপারে শরিয়তে স্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা রয়েছে অথবা যা সালাতের মূল কাঠামোর সাথে সাংঘর্ষিক, সেগুলোকে অবৈধ বা নিষিদ্ধ দুআ বলা হয়। ইসলামী ফিকহের পরিভাষায়, সালাতের মধ্যে এমন কোনো ভাষা বা শব্দের ব্যবহার করা যাবে না যা সাধারণ মানুষের কথাবার্তার (কালামুন নাস) সমগোত্রীয়। সালাতের ভেতরে কেবল তাসবিহ, তাহমিদ, কুরআন তিলাওয়াত এবং কুরআন-সুন্নাহয় বর্ণিত মা'ছুর দুআ পাঠ করার অনুমতি রয়েছে। এর বাইরে মানুষের সাধারণ বাক্যালাপের মতো করে দুনিয়াবি কোনো স্বার্থ বা বস্তু চাওয়া সালাতের পবিত্রতা ও বিধানের পরিপন্থী।

সালাতের দুআ সম্পর্কিত কুরআন ও হাদিসের নির্দেশনা

রাসূলুল্লাহ (সা.) সালাতের ভেতরে পঠিতব্য জিকির ও দুআর পরিধি স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করে দিয়েছেন। কোনো ব্যক্তি যেন সালাতের ভেতরে সাধারণ মানুষের মতো কথাবার্তা বা নিজের খেয়ালখুশিমতো প্রার্থনা জুড়ে না দেয়, সে ব্যাপারে কঠোর সতর্কতা এসেছে।

মুয়াবিয়া ইবনুল হাকাম আস-সুলামী (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:

إِنَّ هَذِهِ الصَّلاَةَ لاَ يَصْلُحُ فِيهَا شَيْءٌ مِنْ كَلاَمِ النَّاسِ إِنَّمَا هُوَ التَّسْبِيحُ وَالتَّكْبِيرُ وَقِرَاءَةُ الْقُرْآنِ

অনুবাদ: “নিশ্চয়ই এই সালাতে মানুষের সাধারণ কথাবার্তার কোনো কিছু উপযুক্ত নয়। সালাত হলো কেবল তাসবিহ (আল্লাহর পবিত্রতা ঘোষণা), তাকবির (আল্লাহর মহানত্ব ঘোষণা) এবং কুরআন তিলাওয়াতের সমষ্টি।”

এই হাদিসটি অত্যন্ত সুষ্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, সালাতের ভেতরে মানুষের তৈরি কোনো বাক্য বা সাধারণ কথোপকথনের মতো করে কিছু বলা যাবে না। (তথ্যসূত্র: সহিহ মুসলিম, হাদিস ৫৩৭ - plain text format)।

এছাড়াও আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সা.) তাকে তাশাহহুদ শেখানোর পর বলেন, এরপর নামাযী ব্যক্তি তার পছন্দমতো যেকোনো মাসনুন বা মা'ছুর দুআ বেছে নিয়ে তা পাঠ করতে পারে। এ প্রসঙ্গে সহিহ বুখারির একটি রেওয়ায়াত বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, যেখানে নামাযের শেষ বৈঠকে দরূদ পাঠের পর উত্তম দুআসমূহ চয়ন করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। (বিস্তারিত দেখুন: সহিহ বুখারী, হাদিস ৮৩৫)।

ফিকহ ও চার মাজহাবের আলোকে সালাতে দুআর বিধান

সালাতের মধ্যে কোন ধরনের দুআ পড়া যাবে এবং কোন ভাষা ব্যবহার করা যাবে, এ বিষয়ে ফকিহগণের মধ্যে সুনির্দিষ্ট ও সূক্ষ্ম মতামত রয়েছে। বিশেষ করে সেজদায় বা শেষ বৈঠকে দুআ করার ক্ষেত্রে মাজহাবসমূহের অবস্থান নিম্নরূপ:

  • হানাফি মাজহাব: হানাফি ফিকহের নির্ভরযোগ্য ফতোয়া অনুযায়ী, সালাতের মধ্যে কেবল কুরআন ও সুন্নাহয় বর্ণিত দুআসমূহ (আদ-দুআউল মা'ছুর) অথবা এমন শব্দে দুআ করা জায়েজ যা কুরআনের আয়াত বা হাদিসের শব্দের সাথে হুবহু বা অর্থগতভাবে মিল রাখে। সালাতে এমন কোনো বস্তু বা বিষয় আল্লাহর কাছে চাওয়া যাবে না, যা মানুষের কাছেও চাওয়া সম্ভব (যেমন: “হে আল্লাহ, আমাকে আজ বিরিয়ানি খাইয়ে দাও” বা “আমাকে অমুক গাড়িটি কিনে দাও”)। মানুষের তৈরি বা সাধারণ কথাবার্তার মতো করে এমন দুনিয়াবি বিষয়ে আরবিতে বা অন্য কোনো ভাষায় দুআ করলে হানাফি মাজহাব মতে সালাত ভেঙে যাবে।
  • শাফেয়ী ও মালেকি মাজহাব: ইমাম শাফেয়ী ও ইমাম মালিক (রহ.)-এর মতে, সালাতের শেষ বৈঠকে বা সেজদার মধ্যে দ্বীন ও দুনিয়ার যেকোনো কল্যাণকর বিষয়ে দুআ করা জায়েজ, তবে তা অবশ্যই আরবি ভাষায় হতে হবে। আরবি ভাষা জানার পর অন্য কোনো ভাষায় ইচ্ছাকৃতভাবে নামাযের ভেতর দুআ করলে সালাত বাতিল হয়ে যাবে।
  • হাম্বলি মাজহাব: ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল (রহ.)-এর মতে, সালাতে সুন্নাহসম্মত মা'ছুর দুআ পড়াই আবশ্যক। তবে কেউ যদি দুনিয়াবি কোনো বৈধ হাজতের জন্য আরবিতে দুআ করে, তবে তা মাকরুহ হলেও সালাত একেবারে বাতিল হবে না। তবে অনারবি বা নিজের মাতৃভাষায় নামাযের ভেতরে দুআ করার ব্যাপারে চার মাজহাবের ইমামগণই কঠোরভাবে নিষেধ করেছেন (জরুরি ও অপারগ অবস্থা ব্যতীত)।

সালাতে যে সমস্ত দুআ ও পদ্ধতি সম্পূর্ণ পরিহার করতে হবে

নামাযের মধ্যে নিজের সালাতকে ত্রুটিমুক্ত রাখতে এবং ফকিহদের সর্বসম্মত নিয়ম অনুসরণের জন্য নিম্নোক্ত বিষয়গুলো ও দুআসমূহ সম্পূর্ণ পরিহার করা ওয়াজিব:

১. অনারবি বা নিজের মাতৃভাষায় দুআ করা

অনেকে সেজদায় গিয়ে বাংলায় বা নিজের আঞ্চলিক ভাষায় দীর্ঘ দুআ বা মোনাজাত শুরু করেন। এটি সালাতের মৌলিক কাঠামোর সম্পূর্ণ পরিপন্থী। সালাত একটি সুনির্দিষ্ট ইবাদত যার ভাষা একমাত্র আরবি। অপারগতা বা আরবি একেবারেই না জানার ব্যতিক্রমী ক্ষেত্র ছাড়া, সাধারণ অবস্থায় নামাযের ভেতরে অনারবি ভাষায় দুআ করা নিষিদ্ধ। মনের আকুতি প্রকাশের জন্য নামাযের বাইরে, বিশেষ করে নফল নামায শেষে বা সাধারণ সময়ে মোনাজাতে নিজের ভাষা ব্যবহার করা উচিত।

২. দুনিয়াবি ও তুচ্ছ বিষয়ের স্পষ্ট উল্লেখ (মানুষের কথার সদৃশ)

যেমনটি পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে, সালাতের ভেতরে এমন শব্দে প্রার্থনা করা যা মানুষের স্বাভাবিক কথাবার্তার মতো শোনায়, তা সালাতকে নষ্ট করে। যদি কেউ দুনিয়াবি ক্ষণস্থায়ী বস্তু বা কোনো নির্দিষ্ট বৈষয়িক সুবিধা হুবহু মানুষের মতো করে উচ্চারণ করে চায়, তবে হানাফি ফিকহ অনুযায়ী তার সালাত ফাসেদ হয়ে যাবে। দুনিয়ার কল্যাণ চাইতে হলে কুরআনে বর্ণিত ব্যাপক অর্থবোধক দুআ পড়তে হবে, যেমন: “রব্বানা আতিনা ফিদ-দুনিয়া হাসানাহ...” (সূরা আল-বাকারাহ, আয়াত ২০১)।

৩. বিদআতি ও মনগড়া দুআ পাঠ

রাসূলুল্লাহ (সা.) বা সাহাবায়ে কেরাম থেকে প্রমাণিত নয়, এমন কোনো মনগড়া বা বানোয়াট দুআ সালাতের ভেতরে শামিল করা যাবে না। অনেকে বিভিন্ন চটি বই বা লোকমুখে প্রচলিত ভিত্তিহীন শব্দমালা সালাতের রুকু, সেজদা বা বৈঠকে পাঠ করেন। ইবাদতের ক্ষেত্রে রাসুল (সা.)-এর সুন্নাহর হুবহু অনুসরণ নিশ্চিত করা আবশ্যক।

৪. নামাযের রোকন বা পঠিতব্য দোয়ার বিকৃতি ঘটানো

সালাতের তাসবিহ বা দুআসমূহ পড়ার সময় এমন কোনো ভুল উচ্চারণ বা সুর তৈরি করা যাবে না যার ফলে আরবির মূল অর্থ বিকৃত হয়ে যায় বা কুফরি অর্থ প্রকাশ পায়। ভুল উচ্চারণে অর্থ অনভিপ্রেতভাবে বদলে গেলে সালাত নষ্ট হয়ে যায়।

সালাতে সঠিক ও সুন্নাহসম্মত দুআ করার নিয়ম

সালাতকে ত্রুটিমুক্ত এবং আল্লাহর দরবারে কবুলযোগ্য করার জন্য একজন মুমিনের করণীয় হলো রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর শেখানো পদ্ধতি অক্ষরে অক্ষরে অনুসরণ করা। নামাযের ভেতরে প্রধানত দুটি স্থানে দুআ করার ব্যাপারে সহিহ হাদিসে উৎসাহিত করা হয়েছে:

  1. সেজদার মধ্যে: সেজদা হলো বান্দার জন্য আল্লাহর সবচেয়ে নিকটবর্তী হওয়ার স্থান। এখানে রাসুল (সা.) বেশি বেশি দুআ করতে বলেছেন। তবে সেই দুআগুলো অবশ্যই হাদিস দ্বারা প্রমাণিত আরবি দুআ হতে হবে। যেমন: “আল্লাহুম্মাগফিরলী জাম্বী কুল্লাহু, দিক্কাহু ওয়া জিল্লাহু...” (সুনান আবু দাউদ, হাদিস ৮৭৮)।
  2. তাশাহহুদ ও দরূদের পর (সালাম ফেরানোর পূর্বে): নামাযের শেষ বৈঠকে আত্তাহিয়্যাতু ও দরূদ পড়ার পর সালাম ফেরানোর আগে দুআ কবুল হওয়ার অন্যতম প্রধান সময়। এখানে রাসুল (সা.)-এর শেখানো বিখ্যাত দুআটি পড়া অত্যন্ত সওয়াবের কাজ: “আল্লাহুম্মা ইন্নী জলামতু নাফসী জুলমান কাছীরা...” (সহিহ বুখারী, হাদিস ৮৩৪)।

প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)

১. নফল নামাযের সেজদায় কি বাংলায় দুআ করা যাবে?

জমহুর বা অধিকাংশ ফকিহদের মতে, ফরয হোক বা নফল, সালাতের ভেতরে আরবি ছাড়া অন্য কোনো ভাষায় ইচ্ছাকৃতভাবে দুআ করা জায়েজ নেই। হানাফি মাজহাব মতে এতে সালাত ভেঙে যাবে। অতএব, নিজের ভাষায় মনের আকুতি জানাতে চাইলে তা সালাতের বাইরে বা নামায শেষ করে সাধারণ মোনাজাতে করা উচিত।

২. সালাতে যদি ভুলবশত দুনিয়াবি কোনো কথা বা নিষিদ্ধ দুআ মুখ থেকে বের হয়ে যায়, তবে করণীয় কী?

যদি কেউ ভুলবশত বা অসতর্কতাবশত নামাযের ভেতরে এমন কিছু বলে ফেলে যা নামাযের অংশ নয়, তবে সালাতের শেষে ‘সেজদায়ে সাহু’ (ভুল সংশোধনের সেজদা) আদায় করতে হবে। তবে যদি কেউ জেনেশুনে ইচ্ছাকৃতভাবে মানুষের কথাবার্তার মতো দুনিয়াবি দুআ করে, তবে সালাত পুনরায় আদায় করতে হবে।

৩. কুরআনের আয়াত কি সেজদার মধ্যে দুআ হিসেবে পড়া যাবে?

রাসূলুল্লাহ (সা.) রুকু এবং সেজদার মধ্যে কুরআন তিলাওয়াত করতে স্পষ্টভাবে নিষেধ করেছেন (সহিহ মুসলিম)। তবে কুরআনের যে সমস্ত আয়াত মূলত দুআ বা প্রার্থনামূলক (যেমন: 'রব্বানা আতিনা...' বা 'রাব্বিজ আলনি...'), সেগুলো যদি তিলাওয়াতের নিয়তে না পড়ে একান্তই আল্লাহর কাছে দুআ ও কাকুতির নিয়তে সেজদায় পড়া হয়, তবে কোনো কোনো ফকিহর মতে তা জায়েজ, তবে তা পরিহার করে হাদিসে বর্ণিত সুনির্দিষ্ট সেজদার দুআগুলো পড়াই সবচেয়ে নিরাপদ ও সুন্নাহসম্মত।

রেফারেন্সসমূহ

কুরআনিক আয়াতসমূহ

হাদিস শরীফ

  • সহিহ বুখারী, হাদিস ৮৩৪ (অধ্যায়: আযান) — শেষ বৈঠকে সালাম ফেরানোর পূর্বে মা'ছুর দুআ পাঠের নিয়ম।
  • সহিহ বুখারী, হাদিস ৮৩৫ (অধ্যায়: আযান) — তাশাহহুদ শেষে নিজের পছন্দমতো মাসনুন দুআ চয়নের স্বাধীনতা।
  • সহিহ মুসলিম, হাদিস ৫৩৭ (অধ্যায়: মসজিদ ও সালাতের স্থান) — সালাতের ভেতরে মানুষের সাধারণ কথাবার্তা নিষিদ্ধ হওয়ার দলিল (Plain Text)।
  • সুনান আবু দাউদ, হাদিস ৮৭৮ (অধ্যায়: সালাত) — সেজদার মধ্যে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর পঠিত সহিহ দুআর বিবরণ।
আব্দুর রহমান

আব্দুর রহমান

এসইও স্পেশালিস্ট ও কনটেন্ট রাইটার

আব্দুর রহমান একজন এসইও স্পেশালিস্ট এবং ইসলামিক কনটেন্ট রাইটার। তিনি ফিকহ, দৈনন্দিন ইবাদত, নামাজ, পারিবারিক দিকনির্দেশনা এবং বাস্তব মুসলিম জীবনধারা নিয়ে সহজ প্রবন্ধ লেখেন, যাতে পাঠকরা প্রতিদিনের জীবনে ইসলাম অনুসরণ করতে পারেন।

আপডেট থাকুন

আমাদের সর্বশেষ আপডেট ও রিলিজ মিস করবেন না