উইতর নামাজে দোয়া কুনুত: চার মাযহাবের নিয়ম ও সহিহ দলিল

আব্দুর রহমান
আব্দুর রহমান
১২ জুল, ২০২৬সালাত

উইতর নামাজ ইসলামের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি ইবাদত। এই নামাজের একটি বিশেষ আমল হলো দোয়া কুনুত। তবে উইতরে দোয়া কুনুত কখন এবং কীভাবে পড়তে হবে, তা নিয়ে ফিকহবিদদের মধ্যে কিছু পদ্ধতিগত ভিন্নতা রয়েছে। হানাফি মাযহাবে রুকুতে যাওয়ার আগে এটি পড়া হয়, আবার শাফিঈ মাযহাবে রুকুর পরে পড়ার নিয়ম রয়েছে। এই নিবন্ধে চার মাযহাবের অনুসৃত নিয়ম, বিশুদ্ধ দলিল এবং দোয়া কুনুত সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ বিধি-বিধান আলোচনা করা হলো।

দোয়া কুনুত কী?

আভিধানিক অর্থে 'কুনুত' (قُنُوت) শব্দের অর্থ বিনয় প্রকাশ করা, অনুগত হওয়া, নীরব থাকা বা ইবাদতে একনিষ্ঠ হওয়া। শরিয়তের পরিভাষায়, নামাজের একটি নির্দিষ্ট স্থানে আল্লাহর প্রশংসা, কৃতজ্ঞতা এবং তাঁর কাছে বিশেষ প্রার্থনা সংবলিত দোয়াকে দোয়া কুনুত বলা হয়। উইতর নামাজে এই দোয়া পড়া অত্যন্ত সওয়াবের কাজ, যা বান্দাকে আল্লাহর অতি নিকটবর্তী করে।

দোয়া কুনুতের আরবি, উচ্চারণ ও অর্থ

উইতরের নামাজে রাসুলুল্লাহ (সা.) সুনির্দিষ্ট কিছু দোয়া শিখিয়েছেন। হানাফি মাযহাবে সাধারণত একটি সুপরিচিত দোয়া পড়া হয়, যা প্রখ্যাত সাহাবি ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত। দোয়াটি নিচে দেওয়া হলো:

اللَّهُمَّ إِنَّا نَسْتَعِينُكَ وَنَسْتَغْفِرُكَ وَنُؤْمِنُ بِكَ وَنتَوَكَّلُ عَلَيْكَ وَنُثْنِي عَلَيْكَ الْخَيْرَ وَنَشْكُرُكَ وَلَا نَكْفُرُكَ وَنَخْلَعُ وَنَتْرُكُ مَنْ يَفْجُرُكَ، اللَّهُمَّ إِيَّاكَ نَعْبُدُ وَلَكَ نُصَلِّي وَنَسْجُدُ وَإِلَيْكَ نَسْعَى وَنَحْفِدُ نَرْجُو رَحْمَتَكَ وَنَخْشَى عَذَابَكَ إِنَّ عَذَابَكَ بِالْكُفَّارِ مُلْحِقٌ

উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা ইন্না নাস্তাইনুকা ওয়া নাস্তাগফিরুকা ওয়া নু'মিনু বিকা ওয়া নাতাওয়াক্কালু আলাইকা ওয়া নুছনি আলাইকাল খাইরা ওয়া নাশকুরুকা ওয়া লা নাকফুরুকা ওয়া নাখলাউ ওয়া নাতরুকু মাই ইয়াফজুরুক। আল্লাহুম্মা ইয়্যাকা নাবুদু ওয়া লাকা নুসল্লি ওয়া নাসজুদু ওয়া ইলাইকা নাসআ ওয়া নাহফিদু নারজু রাহমাতাকা ওয়া নাখশা আজাবাকা ইন্না আজাবাকা বিল কুফফারি মুলহিক্ব।

অনুবাদ: হে আল্লাহ! আমরা তোমারই সাহায্য চাই, তোমারই কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করি, তোমার ওপর ঈমান রাখি, তোমার ওপর ভরসা করি এবং তোমার উত্তম প্রশংসা করি। আমরা তোমার কৃতজ্ঞতা আদায় করি, অকৃতজ্ঞ হই না। যারা তোমার নাফরমানি করে, তাদের আমরা পরিত্যাগ করি। হে আল্লাহ! আমরা কেবল তোমারই ইবাদত করি, তোমারই জন্য সালাত আদায় করি ও সিজদা করি। তোমারই দিকে আমরা ধাবিত হই এবং তোমারই সেবায় নিয়োজিত থাকি। আমরা তোমার রহমতের আশা করি ও তোমার শাস্তিকে ভয় করি। নিশ্চয়ই তোমার শাস্তি কাফিরদের ওপর আপতিত হবে।

এছাড়াও রাসুলুল্লাহ (সা.) হাসান ইবনে আলী (রা.)-কে একটি দোয়া শিখিয়েছিলেন, যা শাফিঈ ও হাম্বলি মাযহাবে বেশি পঠিত হয়: "আল্লাহুম্মাহদিনি ফীমান হাদাইত..." (সূনানে তিরমিযী, হাদিস ৪৬৪, ইমাম তিরমিযী একে হাসান বলেছেন)।

মাযহাব ভেদে দোয়া কুনুত পড়ার সময় ও বিধান

উইতর নামাজে দোয়া কুনুত পড়ার স্থান ও সময় নিয়ে চার প্রধান মাযহাবের ফকিহদের মধ্যে নিম্নোক্ত বিশ্লেষণ পাওয়া যায়:

১. হানাফি মাযহাব

হানাফি ফিকহ অনুযায়ী, উইতর নামাজের তৃতীয় রাকাতে রুকুতে যাওয়ার ঠিক আগে দোয়া কুনুত পড়া ওয়াজিব। কিরাত শেষ করার পর আল্লাহু আকবর বলে দুই হাত কান পর্যন্ত উঠিয়ে পুনরায় হাত বাঁধতে হয় এবং এরপর দোয়া কুনুত পড়তে হয়। এর সপক্ষে দলিল হলো, সাহাবি উবাই ইবনে কাব (রা.) বর্ণনা করেন যে, রাসুলুল্লাহ (সা.) উইতর নামাজে রুকুর পূর্বে কুনুত পড়তেন (সুনানে নাসায়ী, হাদিস ১৬৯৮)।

২. শাফিঈ মাযহাব

শাফিঈ মাযহাব মতে, উইতর নামাজে দোয়া কুনুত পড়া সুন্নত। তবে এটি বছরের সব দিন পড়তে হয় না, বরং কেবল রমজান মাসের শেষ ১৫ দিনের উইতর নামাজের শেষ রাকাতে রুকু থেকে মাথা তোলার পর (ইতিদাল অবস্থায়) হাত তুলে এই দোয়া পড়তে হয়। এর প্রধান দলিল হলো সাহাবি আনাস (রা.)-এর বর্ণনা, যেখানে উল্লেখ আছে যে আল্লাহর রাসুল (সা.) রুকুর পরে কুনুত পড়েছেন (সহীহ বুখারী, হাদিস ১০০২)।

৩. হাম্বলি মাযহাব

হাম্বলি ফিকহ অনুযায়ী, বছরের সব দিনই উইতর নামাজের শেষ রাকাতে দোয়া কুনুত পড়া সুন্নত। ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বলের মতে, রুকুর আগে বা পরে উভয় সময়েই কুনুত পড়া জায়েজ। তবে রুকুর পরে পড়া উত্তম এবং এটিই মাযহাবের প্রধান মত। রুকু থেকে উঠে হাত বুক পর্যন্ত তুলে আমিন আমিন বলে দোয়া করার নিয়ম রয়েছে এই মাযহাবে।

৪. মালিকি মাযহাব

মালিকি মাযহাবের প্রসিদ্ধ ও নির্ভরযোগ্য মতানুযায়ী, উইতর নামাজে নিয়মিত দোয়া কুনুত পড়া সুন্নতের পরিপন্থী বা মাকরূহ। তাদের মতে, কুনুত কেবল ফজরের নামাজে রুকুর আগে গোপনে পড়া مستحب (মুস্তাহাব)। তবে উম্মাহর ওপর কোনো বড় বিপদ বা সংকট দেখা দিলে (কুনুতে নাযিলা) যেকোনো ফরজ নামাজে রুকুর পরে দোয়া করা জায়েজ।

দোয়া কুনুতের আদব ও সাধারণ ভুল

দোয়া কুনুত আদায়ের সময় কিছু আদব বজায় রাখা উচিত, যা দোয়ার গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধি করে। যেমন—ধীরস্থিরভাবে অর্থ বুঝে দোয়া করা এবং তাড়াহুড়ো না করা। অনেক মানুষ মনে করেন উইতরে কেবল নির্দিষ্ট একটি দোয়াই পড়তে হবে, অন্য কিছু পড়লে নামাজ হবে না—এটি একটি ভুল ধারণা। শরিয়তসম্মত যেকোনো দোয়া দ্বারা কুনুতের উদ্দেশ্য সফল হয়, তবে সুন্নাহ সমর্থিত দোয়া পড়া সর্বোত্তম। এছাড়া কুনুতে নাযিলা ছাড়া সাধারণ কুনুতে ইমামের পেছনে মুক্তাদিদের উচ্চস্বরে কান্নাকাটি বা অতিরিক্ত শোরগোল করা অনুচিত।

উইতর নামাজের আধ্যাত্মিক গুরুত্ব

উইতর অর্থ বিজোড়। আল্লাহ তাআলা নিজে বিজোড় এবং তিনি বিজোড়কে ভালোবাসেন। এটি রাতের শেষভাগের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ইবাদত। রাসুলুল্লাহ (সা.) সফরের অবস্থায় বা ঘরে থাকাকালীন কখনোই উইতর নামাজ ত্যাগ করতেন না। দোয়া কুনুতের মাধ্যমে বান্দা তার নিজের অক্ষমতা স্বীকার করে আল্লাহর সার্বভৌমত্ব ও হেদায়েতের ওপর পূর্ণ আস্থা প্রকাশ করে, যা আত্মিক প্রশান্তি ও মানসিক শক্তি অর্জনের এক অনুপম মাধ্যম।

References

Quranic Ayahs

Hadith

দোয়া কুনুত না জানলে উইতর নামাজে কী পড়তে হবে?

দোয়া কুনুত মুখস্থ না থাকলে কোরআন বা হাদিসে বর্ণিত অন্য যেকোনো দোয়ার মাধ্যমে কুনুতের ওয়াজিব বা সুন্নতের দায়িত্ব আদায় হয়ে যাবে। যেমন তিনবার 'রাব্বানা আতিনা ফিদ দুনিয়া হাসানাতাও ওয়া ফিল আখিরাতি হাসানাতাও ওয়া কিনা আজাবান নার' অথবা তিনবার 'আল্লাহুম্মাগফিরলী' পড়া যেতে পারে। তবে দ্রুত সুন্নাহ সম্মত দোয়া কুনুত শিখে নেওয়া আবশ্যক।

ভুলবশত দোয়া কুনুত ছেড়ে দিলে করণীয় কী?

হানাফি মাযহাব অনুযায়ী উইতরে দোয়া কুনুত পড়া ওয়াজিব। তাই কেউ যদি ভুলবশত দোয়া কুনুত না পড়ে সরাসরি রুকুতে চলে যান, তবে নামাজ শেষে সাহু সিজদা (সেজদায়ে সাহু) দেওয়া ওয়াজিব। সাহু সিজদা দিলে নামাজ শুদ্ধ হয়ে যাবে। আর শাফিঈ বা হাম্বলি মাযহাবে এটি সুন্নত হওয়ায় সাহু সিজদা না দিলেও নামাজ বাতিল হবে না।

মুক্তাদি হিসেবে ইমামের পেছনে কুনুত পড়ার নিয়ম কী?

ইমাম যদি হানাফি নিয়ম অনুযায়ী রুকুর আগে কুনুত পড়েন, তবে মুক্তাদিও মনে মনে বা নিঃশব্দে দোয়া কুনুত পড়বেন। আর ইমাম যদি শাফিঈ বা হাম্বলি নিয়মে রুকুর পরে হাত তুলে উচ্চস্বরে দোয়া করেন, তবে মুক্তাদি হাত তুলে ইমামের দোয়ার সাথে নিম্নস্বরে 'আমীন' বলবেন।

উপসংহার

উইতর নামাজে দোয়া কুনুত পড়ার সময় ও পদ্ধতি নিয়ে চার মাযহাবের ফকিহদের ইজতিহাদ ও দলিলভিত্তিক ভিন্নতা রয়েছে। প্রতিটি মতেরই সুনির্দিষ্ট সাহাবিদের আমল ও হাদিসের ভিত্তি রয়েছে। একজন মুসলিম যে মাযহাব অনুসরণ করেন, সেই অনুযায়ী আমল করবেন এবং অন্য মাযহাবের নিয়মের প্রতি শ্রদ্ধা বজায় রাখবেন। মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত একাগ্রতা ও সুন্নাহ মোতাবেক আল্লাহর দরবারে ইবাদত পেশ করা।

আব্দুর রহমান

আব্দুর রহমান

এসইও স্পেশালিস্ট ও কনটেন্ট রাইটার

আব্দুর রহমান একজন এসইও স্পেশালিস্ট এবং ইসলামিক কনটেন্ট রাইটার। তিনি ফিকহ, দৈনন্দিন ইবাদত, নামাজ, পারিবারিক দিকনির্দেশনা এবং বাস্তব মুসলিম জীবনধারা নিয়ে সহজ প্রবন্ধ লেখেন, যাতে পাঠকরা প্রতিদিনের জীবনে ইসলাম অনুসরণ করতে পারেন।

আপডেট থাকুন

আমাদের সর্বশেষ আপডেট ও রিলিজ মিস করবেন না