রুকইয়া হলো পবিত্র কুরআনের আয়াত, আল্লাহর নাম ও রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর শেখানো সহীহ দোয়া পাঠ করে ফুঁ দেওয়ার মাধ্যমে আল্লাহর নিকট রোগমুক্তি কিংবা নিরাপত্তা আশ্রয় চাওয়া। ইসলামে এটি একটি সম্পূর্ণ বৈধ ও সুন্নাহসম্মত মাধ্যম। আমাদের ঘরবাড়িকে জিন-শয়তানের কুপ্রভাব, বদনজর ও যাদু-টোনার আছর থেকে সুরক্ষিত রাখতে বাড়ির রুকইয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নিয়মিত সুন্নাহসম্মত জিকির ও দোয়া চর্চার মাধ্যমে বাড়িকে যেকোনো আধ্যাত্মিক ক্ষতি থেকে নিরাপদ রাখা সম্ভব। এই নিবন্ধে আমরা সহীহ দলিলসহ বাড়ির রুকইয়ার আয়াত ও দোয়াগুলো বিস্তারিত তুলে ধরব।
রুকইয়া কী এবং কেন বাড়ির জন্য এটি প্রয়োজন?
রুকইয়া (الرقية) শব্দের অর্থ ঝাড়ফুঁক বা আল্লাহর কালামের মাধ্যমে চিকিৎসা করা। ঘর হলো মানুষের শান্তি ও ইবাদতের মূল কেন্দ্র। কিন্তু অসতর্কতার কারণে অনেক সময় ঘর শয়তান বা ক্ষতিকর জিনের আখড়ায় পরিণত হতে পারে। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “তোমরা তোমাদের ঘরগুলোকে কবর বানিও না। যে ঘরে সূরা আল-বাকারাহ পাঠ করা হয়, সে ঘর থেকে শয়তান পালিয়ে যায়।” (সহীহ মুসলিম, হাদিস ৭৮০)। তাই সুন্নাহর নির্দেশনা মেনে ঘরকে পবিত্র ও নিরাপদ রাখতে রুকইয়ার আমল অপরিহার্য।
বাড়ির রুকইয়ার জন্য কুরআনের নির্বাচিত আয়াতসমূহ
১. আয়াতুল কুরসি (সূরা আল-বাকারাহ, আয়াত ২৫৫)
আয়াতুল কুরসি হলো পবিত্র কুরআনের সর্বশ্রেষ্ঠ আয়াত। রাতে ঘুমানোর আগে এটি পাঠ করলে আল্লাহর পক্ষ থেকে একজন রক্ষক নিযুক্ত হন এবং শয়তান সেই ঘরের নিকটবর্তী হতে পারে না।
অনুবাদ: আল্লাহ, তিনি ব্যতীত কোনো সত্য ইলাহ নেই; তিনি চিরঞ্জীব, সর্বসত্তার ধারক। তাঁকে তন্দ্রা ও নিদ্রা স্পর্শ করে না। আসমান ও জমিনে যা কিছু আছে সবই তাঁর। কে সে, যে তাঁর অনুমতি ছাড়া তাঁর নিকট সুপারিশ করবে? তাদের সামনে ও পেছনে যা কিছু আছে তা তিনি জানেন। আর যা তিনি ইচ্ছে করেন তা ছাড়া তাঁর জ্ঞানের কোনো কিছু তারা পরিবেষ্টন করতে পারে না। তাঁর কুরসি আসমান ও জমিন জুড়ে পরিব্যাপ্ত এবং এ দুটির সংরক্ষণ তাঁর জন্য কঠিন নয়। আর তিনি পরম উচ্চ, মহান (সূরা আল-বাকারাহ, আয়াত ২৫৫)।
২. সূরা আল-বাকারাহর শেষ দুই আয়াত (২৮৫-২৮৬)
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “যে ব্যক্তি রাতে সূরা আল-বাকারাহর শেষ দুটি আয়াত পাঠ করবে, তা তার সুরক্ষার জন্য যথেষ্ট হবে” (সহীহ বুখারী, হাদিস ৫০০৮)।
৩. সূরা আল-ইখলাস, আল-ফালাক ও আন-নাস (মুআউবিজাতাইন)
আব্দুল্লাহ ইবনে খুবাইব (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “তুমি সকাল-সন্ধ্যায় তিনবার সূরা ইখলাস, ফালাক ও নাস পাঠ করবে; এটি তোমাকে সব ধরনের অনিষ্ট থেকে রক্ষা করার জন্য যথেষ্ট হবে” (সুনানে তিরমিজি, হাদিস ৩৫৭৫)।
বাড়ির সুরক্ষায় রাসুল (সা.)-এর শেখানো সহীহ দোয়া
১. ঘরে প্রবেশের সুন্নাহ দোয়া
জাবের ইবনে আব্দুল্লাহ (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী করীম (সা.) বলেছেন, যখন কোনো ব্যক্তি তার ঘরে প্রবেশকালে এবং খাবার গ্রহণের সময় আল্লাহর নাম স্মরণ করে (বিসমিল্লাহ বলে), তখন শয়তান তার সঙ্গীদের বলে, “তোমাদের জন্য কোনো আবাসন ও রাতের খাবার নেই” (সহীহ মুসলিম, হাদিস ২০১৮)। ঘরে প্রবেশের সময় এই দোয়াটি পড়া উত্তম:
উচ্চারণ: বিসমিল্লাহি ওয়ালাজনা, ওয়া বিসমিল্লাহি খারাজনা, ওয়া আলাল্লাহি রাব্বিনা তাওয়াক্কালনা।
অনুবাদ: আল্লাহর নামে আমরা প্রবেশ করলাম, আল্লাহর নামে আমরা বের হলাম এবং আমাদের রব আল্লাহর ওপরই আমরা ভরসা করলাম (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস ৫০৯৬)।
২. ঘর থেকে বের হওয়ার দোয়া
ঘর থেকে বের হওয়ার সময় দোয়া পড়লে শয়তান মানুষের থেকে দূরে সরে যায় এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে বিশেষ নিরাপত্তা লাভ হয়।
উচ্চারণ: বিসমিল্লাহি তাওয়াক্কালতু আলাল্লাহি, ওয়ালা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ।
অনুবাদ: আল্লাহর নামে, আল্লাহর ওপর ভরসা করলাম। আল্লাহ ছাড়া কোনো শক্তি ও ক্ষমতা নেই (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস ৫০৯৫)।
৩. শয়তান ও বিষাক্ত প্রাণীর ক্ষতি থেকে বাঁচার দোয়া
খাওলা বিনতে হাকিম (রা.) বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে বলতে শুনেছি, যে ব্যক্তি কোনো স্থানে অবতরণ বা অবস্থান করার পর এই দোয়াটি পাঠ করবে, সেখান থেকে প্রস্থান করা পর্যন্ত কোনো কিছুই তার ক্ষতি করতে পারবে না (সহীহ মুসলিম, হাদিস ২৭০৮)। এটি ঘরের সুরক্ষার জন্য অত্যন্ত কার্যকরী।
উচ্চারণ: আউজু বিকালিমাতিল্লাহিত তাম্মাতি মিন শাররি মা খালাক।
অনুবাদ: আমি আল্লাহর নিখুঁত বাণীসমূহের আশ্রয়ে তাঁর সৃষ্ট সব কিছুর অনিষ্ট থেকে রক্ষা চাচ্ছি।
৪. সন্তানদের বদনজর ও শয়তান থেকে রক্ষার দোয়া
ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) হাসান ও হুসাইন (রা.)-কে শয়তানের অনিষ্ট থেকে রক্ষা করতে আল্লাহর কাছে এই দোয়ার মাধ্যমে আশ্রয় প্রার্থনা করতেন:
উচ্চারণ: উইজুকুমা বিকালিমাতিল্লাহিত তাম্মাতি মিন কুল্লি শায়তানিও ওয়া হাম্মাহ, ওয়া মিন কুল্লি আইনিল লাম্মাহ।
অনুবাদ: আমি তোমাদের দুজনকে আল্লাহর পরিপূর্ণ বাণীসমূহের আশ্রয়ে সমর্পণ করছি সব শয়তান, বিষাক্ত জীবজন্তু এবং সব ক্ষতিকর ও কুদৃষ্টির অনিষ্ট থেকে (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস ৩৫২৪; আল-আলবানি কর্তৃক সহীহ সাব্যস্ত)।
বাড়িতে সুন্নাহসম্মত রুকইয়া করার ব্যবহারিক নিয়ম
বাড়ির রুকইয়া করার জন্য কোনো কাল্পনিক বা বিদআতি পদ্ধতি অবলম্বনের প্রয়োজন নেই। ইসলামের নির্দেশনা অত্যন্ত সহজ ও বাস্তবসম্মত। প্রতিদিন সকাল ও সন্ধ্যায় সূরা ইখলাস, ফালাক ও নাস তিনবার করে পাঠ করে নিজের হাতের তালুতে ফুঁ দিয়ে পুরো শরীরে হাত বুলিয়ে নিন এবং ঘরে বরকতের নিয়ত করুন। ঘরে নিয়মিত সূরা আল-বাকারাহ নিজে তিলাওয়াত করুন অথবা পরিবারের কেউ তা পাঠ করুন। এছাড়া ঘরে প্রবেশ ও বের হওয়ার সময় দোয়া পাঠের অভ্যাস গড়ে তুলুন। মনে রাখতে হবে, রুকইয়ার মূল ভিত্তি হলো আল্লাহর ওপর অবিচল তাওয়াক্কুল (ভরসা) এবং পূর্ণ ইখলাস।
তথ্যসূত্র
কুরআনের আয়াত
- সূরা আল-বাকারাহ, ২:২৫৫ — আয়াতুল কুরসি, যা শয়তানের আক্রমণ প্রতিরোধ করে।
- সূরা আল-বাকারাহ, ২:২৮৫-২৮৬ — সূরার শেষ দুই আয়াত।
হাদিস
- সহীহ মুসলিম, হাদিস ৭৮০ (অধ্যায়: মুসাফিরদের সালাত) — সূরা বাকারাহ পাঠে শয়তানের পলায়ন।
- সহীহ বুখারী, হাদিস ৫০০৮ — রাতে সূরা বাকারাহর শেষ দুই আয়াতের ফজিলত।
- সুনানে তিরমিজি, হাদিস ৩৫৭৫ — সকাল-সন্ধ্যায় তিন সূরার আমল।
- সহীহ মুসলিম, হাদিস ২০১৮ — ঘরে প্রবেশের সময় বিসমিল্লাহ বলার গুরুত্ব।
- সুনানে আবু دাউদ, হাদিস ৫০৯৬ — ঘরে প্রবেশের দোয়া।
- সুনানে আবু دাউদ, হাদিস ৫০৯৫ — ঘর থেকে বের হওয়ার দোয়া।
- সহীহ মুসলিম, হাদিস ২৭০৮ — আল্লাহর পূর্ণ বাণীসমূহের মাধ্যমে আশ্রয় প্রার্থনা।
- সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস ৩৫২৪ — সন্তানদের সুরক্ষায় রাসুল (সা.)-এর দোয়া।

