দৈনন্দিন জীবনের নানা ব্যস্ততা, মানসিক চাপ এবং ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা থেকে মানুষের মনে উদ্বেগ বা অস্থিরতার সৃষ্টি হতে পারে। ইসলামে এই ধরনের মানসিক ক্লান্তি ও দুশ্চিন্তা থেকে মুক্তির জন্য একটি চমৎকার আধ্যাত্মিক নিরাময় ব্যবস্থা রয়েছে, যা 'রুকইয়াহ' (শরিয়তসম্মত ঝাড়ফুঁক) নামে পরিচিত। রুকইয়াহ হলো পবিত্র কুরআনের আয়াত, রাসুলুল্লাহ ﷺ এর শেখানো দোয়া এবং আল্লাহর সুন্দর সুন্দর নাম ব্যবহার করে আত্মিক ও শারীরিক রোগব্যাধি নিরাময়ের একটি পদ্ধতি। এই নিবন্ধে আমরা উদ্বেগ ও দুশ্চিন্তা দূর করার জন্য কুরআন ও সহিহ সুন্নাহ থেকে প্রমাণিত রুকইয়াহর সঠিক নিয়ম, দোয়া ও এর আদবসমূহ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।
উদ্বেগ উপশমে রুকইয়াহর গুরুত্ব ও তাৎপর্য
মানসিক অস্থিরতা ও অমূলক ভয় অনেক সময় শয়তানের প্ররোচনা (ওয়াসওয়াসা) কিংবা দুর্বল ঈমানি অবস্থার কারণে তীব্র রূপ ধারণ করতে পারে। রুকইয়াহর মূল ভিত্তি হলো আল্লাহর ওপর পূর্ণ ভরসা (তাওয়াক্কুল) স্থাপন করা। যখন কোনো মুমিন ব্যক্তি আল্লাহর কালাম তিলাওয়াত করে নিজের ওপর ফুঁ দেয়, তখন তার অন্তরে এক অভাবনীয় প্রশান্তি নেমে আসে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন যে, তিনি কুরআনকে মুমিনদের জন্য আরোগ্য ও রহমতস্বরূপ নাজিল করেছেন। তবে মনে রাখা প্রয়োজন, ইসলামে রুকইয়াহকে একটি শক্তিশালী আধ্যাত্মিক সান্ত্বনা এবং আল্লাহর সাহায্য চাওয়ার মাধ্যম হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তীব্র মানসিক অসুস্থতার ক্ষেত্রে রুকইয়াহর পাশাপাশি অভিজ্ঞ চিকিৎসক বা সাইকোলজিস্টের পরামর্শ গ্রহণ করা সুন্নাহর পরিপন্থী নয়, বরং এটিও ইসলাম নির্দেশিত চিকিৎসারই অংশ।
রুকইয়াহ করার পূর্বশর্ত ও ইসলামি আদবসমূহ
রুকইয়াহর মাধ্যমে সর্বোচ্চ উপকার পেতে এবং এর কার্যকারিতা বৃদ্ধি করতে কিছু গুরুত্বপূর্ণ আদব বা শর্ত মেনে চলা আবশ্যক। প্রথমত, পূর্ণ পবিত্রতা অর্জন করতে হবে অর্থাৎ সুন্দরভাবে ওযু করে নিতে হবে। দ্বিতীয়ত, সম্ভব হলে কিবলামুখী হয়ে বসা উত্তম। তৃতীয়ত, সম্পূর্ণ মনোযোগ, অন্তরের একাগ্রতা এবং খুশু-খুযু বজায় রাখতে হবে। চতুর্থত, মনে এই দৃঢ় বিশ্বাস রাখতে হবে যে, আরোগ্য দাতা একমাত্র আল্লাহ তাআলা; রুকইয়াহ কেবল একটি উসিলা মাত্র। পরিশেষে, যেকোনো ধরনের শিরকি তাবিজ, কবজ বা কুফরি মন্ত্র ও অজ্ঞাত ভাষা ব্যবহার করা থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকতে হবে।
উদ্বেগ ও অস্থিরতা দূর করার ধারাবাহিক রুকইয়াহ পদ্ধতি
১. সূরা আল-ফাতিহা তিলাওয়াত করা
সূরা আল-ফাতিহাকে 'সূরাতুশ শিফা' বা আরোগ্যের সূরা বলা হয়। মানসিক অস্থিরতা ও অন্তরের ভয় দূর করতে এই সূরাটি অত্যন্ত কার্যকর। মনোযোগের সাথে এই সূরাটি ৭ বার (অথবা বিজোড় সংখ্যায়) পাঠ করে নিজের হাত অথবা বুকে ফুঁ দেওয়া যেতে পারে।
উচ্চারণ: বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম। আলহামদু লিল্লাহি রাব্বিল আলামিন। আর-রাহমানির রাহিম। মালিকি ইয়াওমিদ্দিন। ইয়্যাকা না'বুদু ওয়া ইয়্যাকা নাস্তা'ইন। ইহদিনাস সিরাতাল মুস্তাকিম। সিরাতাল্লাজিনা আন'আমতা আলাইহিম গাইরিল মাগদুবি আলাইহিম ওয়ালাদ দাল্লিন।
অনুবাদ: পরম করুণাময়, অতি দয়ালু আল্লাহর নামে। সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য, যিনি বিশ্বজগতের প্রতিপালক। যিনি পরম করুণাময়, অতি dয়ালু। যিনি বিচার দিবসের মালিক। আমরা কেবল তোমারই ইবাদত করি এবং কেবল তোমারই সাহায্য চাই। আমাদের সরল পথ দেখাও। তাদের পথ, যাদের তুমি নিয়ামত দিয়েছ; তাদের পথ নয় যারা গযবপ্রাপ্ত এবং যারা পথভ্রষ্ট।
এই সূরার আরোগ্যকারী গুণের কথা সহীহ বুখারী, হাদিস ৫৭৩৬ থেকে প্রমাণিত, যেখানে সাহাবিগণ এই সূরা পড়ে ঝাড়ফুঁক করেছিলেন এবং রাসুলুল্লাহ ﷺ তা অনুমোদন করেছিলেন।
২. আয়াতুল কুরসি পাঠ করা
কুরআন মাজিদের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ আয়াত হলো আয়াতুল কুরসি (সূরা আল-বাকারার ২৫৫ নম্বর আয়াত)। এটি শয়তানের সব ধরনের অনিষ্ট, ওয়াসওয়াসা এবং অমূলক ভয়ভীতি থেকে সুরক্ষার জন্য একটি অজেয় দুর্গ। বিশেষ করে সকাল-সন্ধ্যায় এবং ঘুমানোর আগে এটি পাঠ করা অত্যন্ত ফলদায়ক।
উচ্চারণ: আল্লাহু লা ইলাহা ইল্লা হুওয়াল হাইয়্যুল কাইয়্যুম। লা তা'খুযুহু সিনাতুও ওয়ালা নাউম। লাহু মা ফিস সামাওয়াতি ওয়া মা ফিল আরদ। মান যাল্লাজি ইয়াশফাউ ইনদাহু ইল্লা বিইজনিহি। ইয়া'লামু মা বাইনা আইদিহিম ওয়া মা খালফাহুম। ওয়ালা ইউহিতুনা বিশাইইম মিন ইলমিহি ইল্লা বিমা শাআ। ওয়াসিআ কুরসিয়্যুহুস সামাওয়াতি ওয়াল আরদ। ওয়ালা ইয়াউদুহু হিফজুহুমা ওয়া হুওয়াল আলিয়্যুল আজিম।
অনুবাদ: আল্লাহ, তিনি ছাড়া কোনো সত্য ইলাহ নেই। তিনি চিরঞ্জীব, সর্বসত্তার ধারক। তাঁকে তন্দ্রা ও নিদ্রা স্পর্শ করে না। আসমানসমূহে যা রয়েছে ও জমিনে যা রয়েছে সব তাঁরই। কে সে, যে তাঁর অনুমতি ছাড়া তাঁর কাছে সুপারিশ করবে? তাদের সামনে ও পেছনে যা কিছু আছে সবই তিনি জানেন। আর তারা তাঁর জ্ঞানের কোনো কিছু পরিবেষ্টন করতে পারে না, তবে তিনি যতটুকু ইচ্ছা করেন তা ছাড়া। তাঁর কুরসি আসমান ও জমিন পরিব্যাপ্ত এবং এ দুটোর রক্ষণাবেক্ষণ তাঁকে ক্লান্ত করে না। আর তিনি সর্বোচ্চ, মহান।
রাসুলুল্লাহ ﷺ আমাদের শিখিয়েছেন যে, রাতে ঘুমানোর আগে আয়াতুল কুরসি পাঠ করলে আল্লাহর পক্ষ থেকে একজন রক্ষক নিযুক্ত হন এবং ভোর পর্যন্ত শয়তান কাছে আসতে পারে না (সহীহ বুখারী, হাদিস ২৩১১)।
৩. আল-মুআউওয়িযাত (সূরা ইখলাস, ফালাক ও নাস) ৩ বার করে পাঠ করা
উদ্বেগ, বিষণ্ণতা, বদনজর ও মনের ভেতরের অস্থিরতা দূর করার জন্য এই শেষ তিন সূরার কোনো বিকল্প নেই। রাসুলুল্লাহ ﷺ প্রতি রাতে ঘুমানোর আগে এই তিন সূরা পড়ে দুই হাতে ফুঁ দিয়ে পুরো শরীরে হাত বুলাতেন।
সূরা আল-ইখলাস
উচ্চারণ: কুল হুওয়াল্লাহু আহাদ। আল্লাহুস সামাদ। লাম ইয়ালিদ ওয়া লাম ইউলাদ। ওয়া লাম ইয়াকুল্লাহু কুফুওয়ান আহাদ।
অনুবাদ: বলুন, তিনিই আল্লাহ, একক। আল্লাহ অমুখাপেক্ষী। তিনি কাউকে জন্ম দেননি এবং তাঁকেও জন্ম দেওয়া হয়নি। আর তাঁর সমকক্ষ কেউ নেই।
সূরা আল-ফালাক
উচ্চারণ: কুল আউযু বিরাব্বিল ফালাক। মিন শাররি মা খালাক। ওয়া মিন শাররি গাসিকিন ইযা ওয়াকাব। ওয়া মিন শাররিন নাফফাসাতি ফিল উকাদ। ওয়া মিন শাররি হাসিদিন ইযা হাসাদ।
অনুবাদ: বলুন, আমি আশ্রয় প্রার্থনা করছি উষার রবের। তিনি যা সৃষ্টি করেছেন তার অনিষ্ট থেকে। আর অন্ধকার রাতের অনিষ্ট থেকে যখন তা সমাগত হয়। আর গ্রন্থিতে ফুঁৎকারদানকারিণীদের অনিষ্ট থেকে। আর হিংসুকের অনিষ্ট থেকে যখন সে হিংসা করে।
সূরা আন-নাস
উচ্চারণ: কুল আউযু বিরাব্বিন্নাস। মালিকিন্নাস। ইলাহিন্নাস। মিন শাররিল ওয়াসওয়াসিল খান্নাস। আল্লাজি ইউওয়াসউইসু ফি সুদুরিন্নাস। মিনাল জিন্নাতি ওয়ান নাস।
অনুবাদ: বলুন, আমি আশ্রয় প্রার্থনা করছি মানুষের রবের। মানুষের অধিপতির। মানুষের ইলাহের। আত্মগোপনকারী কুমন্ত্রণাদাতার অনিষ্ট থেকে। যে মানুষের অন্তরে কুমন্ত্রণা দেয়। জিনের মধ্য থেকে এবং মানুষের মধ্য থেকে।
প্রতিদিন সকাল ও সন্ধ্যায় এই তিন সূরা ৩ বার করে পাঠ করলে তা সব ধরনের অনিষ্ট থেকে সুরক্ষার জন্য যথেষ্ট হয় (সুনান আবু দাউদ, হাদিস ৫০৮২, আল-আলবানি কর্তৃক সহীহ প্রমাণিত)।
রুকইয়াহ করার সময় সাধারণ ভুলত্রুটি
অনেকেই রুকইয়াহ করার সময় কিছু অসচেতনতামূলক ভুল করে বসেন, যা পরিহার করা উচিত। যেমন— কুরআন তিলাওয়াতের সময় তাড়াহুড়ো করা এবং আয়াতের অর্থের দিকে মনোযোগ না দেওয়া। রুকইয়াহর পূর্ণ সুফল পেতে হলে ধীরস্থিরভাবে তিলাওয়াত করা আবশ্যক। এছাড়া, অনেকে শরিয়তসম্মত রুকইয়াহর সাথে বিভিন্ন বিদআতি আমল বা গণনা করার অবৈজ্ঞানিক পদ্ধতি যোগ করে ফেলেন, যা মোটেও কাম্য নয়। মনে রাখতে হবে, রুকইয়াহ কোনো জাদুকরি জাদুবিদ্যা নয়, এটি আল্লাহর কাছে সরাসরি আরজি পেশ করার একটি বিনম্র সুন্নাহ পদ্ধতি।
সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)
রুকইয়াহ কি মানসিক ও শারীরিক উভয় রোগের ক্ষেত্রে কাজ করে?
আমি কি নিজের রুকইয়াহ নিজে করতে পারি?
রুকইয়াহ করার সময় কি কোনো পানি বা তেলের ওপর ফুঁ দেওয়া যাবে?
রুকইয়াহ করার পাশাপাশি কি ডাক্তারের ওষুধ খাওয়া যাবে?
তথ্যসূত্র
কুরআনের আয়াতসমূহ
- সূরা আল-ইসরা, ১৭:৮২ — মুমিনদের জন্য কুরআনে আরোগ্য থাকার ঘোষণা।
হাদিস শরীফ
- সহীহ বুখারী, হাদিস ৫৭check৬ (অধ্যায়: চিকিৎসা) — সূরা আল-ফাতিহা দ্বারা রুকইয়াহর অনুমোদন।
- সহীহ বুখারী, হাদিস ২৩১১ (অধ্যায়: ওকালাহ) — আয়াতুল কুরসির মাধ্যমে শয়তান থেকে সুরক্ষার হাদিস।
- সুনান আবু দাউদ, হাদিস ৫০৮২ (অধ্যায়: আদব) — সকাল-সন্ধ্যায় তিন কুল (ইখলাস, ফালাক, নাস) পড়ার ফজিলত।
- সহীহ মুসলিম, হাদিস ২১৮৬ (অধ্যায়: সালাম ও চিকিৎসা) — ঝাড়ফুঁকে শিরক না থাকার শর্তে রুকইয়াহ করার সাধারণ অনুমতি।

