রুকইয়াহ (الرقية) হলো আল্লাহ তাআলার কালাম তথা পবিত্র কুরআনের আয়াত এবং রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহ দ্বারা প্রমাণিত বিশুদ্ধ দুআসমূহের মাধ্যমে ঝাড়ফুঁক করা। এটি বদনজর (Evil Eye), জাদুটোনা, জিনের উপদ্রব এবং বিভিন্ন শারীরিক ও মানসিক অসুস্থতা থেকে আত্মরক্ষা ও নিরাময়ের একটি অত্যন্ত কার্যকর শরয়ী মাধ্যম। ইসলামে শিরকমুক্ত ও সুন্নাহ সম্মত উপায়ে রুকইয়াহ করা কেবল বৈধই নয়, বরং এটি একটি প্রশংসনীয় ইবাদত। এই নিবন্ধে কুরআন ও সহীহ হাদীস থেকে সংকলিত প্রধান প্রধান রুকইয়ার দুআ, সেগুলোর আরবী পাঠ, সঠিক উচ্চারণ ও অর্থ বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো।
ইসলামে রুকইয়ার গুরুত্ব ও বৈধতার শর্তাবলী
জাহেলী যুগে মানুষ বিভিন্ন কুফরী কালাম ও শিরকী মন্ত্রের মাধ্যমে ঝাড়ফুঁক করত, যা ইসলামে সম্পূর্ণ হারাম করা হয়েছে। তবে কুরআন ও সহীহ হাদীসের মাধ্যমে রুকইয়াহ করা সুন্নাহ দ্বারা প্রমাণিত। শরীয়তে রুকইয়াহ কবুল হওয়ার জন্য প্রধানত তিনটি শর্ত রয়েছে: প্রথমত, রুকইয়ার বাক্যগুলো আল্লাহর কালাম, তাঁর নাম বা গুণাবলী দ্বারা হতে হবে। দ্বিতীয়ত, আরবী ভাষায় বা স্পষ্ট ও বোধগম্য ভাষায় হতে হবে। তৃতীয়ত, এই বিশ্বাস রাখতে হবে যে রুকইয়াহ নিজস্ব কোনো ক্ষমতায় আরোগ্য দান করে না, বরং আরোগ্য আসে একমাত্র মহান আল্লাহর হুকুমে।
কুরআন ও সুন্নাহ থেকে নির্বাচিত প্রধান রুকইয়ার দুআসমূহ
পবিত্র কুরআন ও সহীহ হাদীসে অনেক আয়াত ও দুআ রয়েছে যা রুকইয়ার জন্য অত্যন্ত কার্যকরী। নিচে বহুল ব্যবহূত ও প্রামাণ্য কিছু আমল তুলে ধরা হলো:
১. সূরা আল-ফাতিহা
সূরা আল-ফাতিহা কুরআনের অন্যতম প্রধান রুকইয়ার সূরা। সাহাবী আবূ সাঈদ আল-খুদরী (রা.) এক গোত্রপ্রধানের বিচ্ছুর কামড়ের চিকিৎসায় এই সূরা পড়ে ফুঁ দিয়েছিলেন এবং আল্লাহর ইচ্ছায় সে সুস্থ হয়েছিল, যা পরবর্তীতে আল্লাহর রাসূল (সা.) অনুমোদন করেন।
উচ্চারণ: আলহামদু লিল্লাহি রাব্বিল আলামীন। আর-রাহমানির রাহীম। মালিকি ইয়াউমিদ্দীন। ইয়্যাকা নাবুদু ওয়া ইয়্যাকা নাস্তায়ীন। ইহদিনাস সিরাতাল মুস্তাকীম। সিরাতাল্লাযীনা আনআমতা আলাইহিম, গাইরিল মাগদূবি আলাইহিম ওয়ালাদ্দাল্লীন।
অনুবাদ: সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর, যিনি সৃষ্টিজগতের রব। পরম করুণাময়, অসীম দয়ালু। বিচার দিবসের মালিক। আমরা একমাত্র আপনারই ইবাদত করি এবং একমাত্র আপনারই কাছে সাহায্য চাই। আমাদের সরল পথ দেখান। তাদের পথ, যাদের আপনি নিয়ামত দিয়েছেন; তাদের পথ নয় যারা গযবপ্রাপ্ত এবং পথভ্রষ্ট। (সূরা আল-ফাতিহা, আয়াত ১-৭)
২. আয়াতুল কুরসী (সূরা আল-বাকারাহ, আয়াত ২৫৫)
আয়াতুল কুরসী শয়তান ও জিনের আক্রমণ থেকে আত্মরক্ষার জন্য সবচেয়ে শক্তিশালী আয়াত। নিয়মিত এটি পাঠ করলে আল্লাহর পক্ষ থেকে একজন সুরক্ষাকারী ফেরেশতা নিয়োজিত থাকে।
উচ্চারণ: আল্লাহু লা ইলাহা ইল্লা হুওয়াল হাইয়্যুল কাইয়্যূম। লা তা’খুযুহু সিনাতুওঁ ওয়ালা নাওম। লাহু মা ফিসসামাওয়াতি ওয়ামা ফিল আরদ। মান যাল্লাযী ইয়াশফাউ ‘ইন্দাহু ইল্লা বিইযনিহ। ইয়া’লামু ما বাইনা আইদীহিম ওয়ামা খালফাহুম। ওয়ালা ইউহীতূনা বিশাইইম মিন ‘ইলমিহী ইল্লা বিমা শা-আ। ওয়াসিআ কুরসিয়্যুহুস সামাওয়াতি ওয়াল আরদ, ওয়ালা ইয়াউদুহু হিফযুহুমা, ওয়া হুওয়াল ‘আলিয়্যুল ‘আযীম।
অনুবাদ: আল্লাহ, তিনি ছাড়া কোনো সত্য ইলাহ নেই। তিনি চিরঞ্জীব, সর্বসত্তার ধারক। তাঁকে তন্দ্রা ও নিদ্রা স্পর্শ করে না। আসমানসমূহে যা রয়েছে এবং জমিনে যা আছে সব তাঁরই। কে সে, যে তাঁর অনুমতি ছাড়া তাঁর কাছে সুপারিশ করবে? তাদের সামনে ও পেছনে যা কিছু আছে তা তিনি জানেন। আর তাঁর ইচ্ছার বাইরে তাঁর জ্ঞানের কিছুই তারা পরিবেষ্টন করতে পারে না। তাঁর কুরসী আসমানসমূহ ও জমিনকে পরিব্যাপ্ত করে আছে; আর এ দুটির রক্ষণাবেক্ষণ তাঁকে ক্লান্ত করে না। আর তিনি সর্বোচ্চ, মহান। (সূরা আল-বাকারাহ, আয়াত ২৫৫)
৩. মুআব্বিযাতাঈন (সূরা আল-ফালাক ও সূরা আন-নাস)
জাদুটোনা, কুদৃষ্টি ও হিংসুকের হিংসা থেকে রক্ষা পেতে রাসুলুল্লাহ (সা.) প্রতি রাতে ঘুমানোর আগে ও সকাল-সন্ধ্যায় সূরা আল-ইখলাসসহ এই দুটি সূরা ৩ বার পাঠ করে হাত ফু দিয়ে পুরো শরীরে বুলাতেন। (সূরা আল-ফালাক ও সূরা আন-নাসের জন্য দেখুন: সূরা আল-ফালাক, আয়াত ১-৫ এবং সূরা আন-নাস, আয়াত ১-৬)।
৪. আকস্মিক বিপদ ও ক্ষতি থেকে বাঁচার সুন্নাহ দুআ
উচ্চারণ: বিসমিল্লাহিল্লাযী লা ইয়াদুররু মাআসমিহী শাইউন ফিল আরদি ওয়ালা ফিসসামায়ি ওয়া হুওয়াস সামীউল আলীম।
অনুবাদ: আল্লাহর নামে, যাঁর নামের বরকতে আসমান ও জমিনের কোনো কিছুই কোনো ক্ষতি করতে পারে না, আর তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।
গুরুত্ব: সকাল ও সন্ধ্যায় ৩ বার এই দুআটি পাঠ করলে কোনো বিষাক্ত বস্তু বা আকস্মিক মুসিবত বান্দার ক্ষতি করতে পারে না, যা সুনানে আবূ দাউদে সহীহ সনদে বর্ণিত হয়েছে।
৫. সৃষ্টির যাবতীয় অনিষ্ট থেকে আশ্রয় প্রার্থনা
উচ্চারণ: আউযু বিকালিমাতিল্লাহিত তাম্মাতি মিন শাররি মা খালাক।
অনুবাদ: আমি আল্লাহর পরিপূর্ণ বাণীসমূহের অসিলায় তাঁর সৃষ্টির যাবতীয় অনিষ্ট থেকে আশ্রয় চাচ্ছি।
গুরুত্ব: সহীহ মুসলিমের বর্ণনা অনুযায়ী, এটি বদনজর ও ক্ষতিকারক কীটপতঙ্গ থেকে বাঁচার একটি অত্যন্ত পরীক্ষিত সুন্নাহ দুআ।
রুকইয়াহ করার সঠিক নিয়ম ও সাধারণ ভুলসমূহ
শরয়ী রুকইয়াহর মূল বিষয় হলো একাগ্রতা ও পূর্ণ ইখলাস। রুকইয়াহ করার সময় আয়াত বা দুআগুলো পড়ে নিজের শরীরে অথবা আক্রান্ত ব্যক্তির শরীরে হালকা বাতাসসহ ফুঁ দিতে হবে। পানি বা তেলের ওপর ফুঁ দিয়ে তা ব্যবহার করাও সালাফদের আমল দ্বারা প্রমাণিত। তবে সমাজে প্রচলিত কিছু ভুল ধারণা যেমন—রুকইয়াহ কেবল উগ্র বা উন্মাদ জিনে ধরা রোগীর জন্যই প্রযোজ্য, তা সঠিক নয়। সাধারণ শারীরিক অসুস্থতা বা মানসিক অবসাদের জন্যও এটি একটি চমৎকার আধ্যাত্মিক আরাম ও নিরাময়ের উৎস। তবে রুকইয়ার পাশাপাশি বৈজ্ঞানিক ও ডাক্তারি চিকিৎসা গ্রহণ করাও সুন্নাহর অংশ; দুআ ও দাওয়াই (ওষুধ) উভয়টির সমন্বয়ই ইসলামের শিক্ষা।
রেফারেন্স
কুরআন
- সূরা আল-ফাতিহা, ১:১-৭ — আরোগ্যকারী ও রুকইয়ার মূল সূরা।
- সূরা আল-বাকারাহ, ২:২৫৫ — আয়াতুল কুরসীর মাধ্যমে শয়তান থেকে সার্বক্ষণিক সুরক্ষা।
- সূরা আল-ফালাক, ১১৩:১-৫ — কুদৃষ্টি ও জাদুর ক্ষতি থেকে বাঁচার নির্দেশ।
হাদিস
- সহীহ বুখারী, হাদিস ৫০০৮ (অধ্যায়: কিতাবু ফাদাইলিল কুরআন) — সূরা ফাতিহার মাধ্যমে রুকইয়াহ করার অনুমোদন।
- সহীহ মুসলিম, হাদিস ২১৮৮ (অধ্যায়: কিতাবুস সালাম) — বদনজর লাগার সত্যতা এবং রুকইয়ার বৈধতা।
- সহীহ মুসলিম, হাদিস ২৭০৯ (অধ্যায়: জিকির ও দুআ) — আল্লাহর নিখুঁত বাণীর মাধ্যমে আশ্রয় লাভের সুন্নাহ।

