ইসলামী পরিভাষায় 'রুকইয়া' বলতে কুরআন মাজীদের আয়াত, আল্লাহর নাম ও গুণাবলি কিংবা রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর শেখানো দোয়া পাঠ করে ফুঁ দেওয়ার মাধ্যমে রোগ-ব্যাধি, বদনজর, যাদু-টোনা এবং জিনের আছর থেকে আল্লাহর কাছে আরোগ্য ও সুরক্ষা কামনা করাকে বোঝায়। একে সাধারণ ভাষায় ঝাড়ফুঁক বলা হলেও, এর মূল ভিত্তি হলো আল্লাহর ওপর অবিচল আস্থা ও তাওহীদ। রুকইয়ার দুআ মূলত সেই শক্তিশালী আধ্যাত্মিক উপায়, যা একজন মুমিনকে দৃশ্যমান ও অদৃশ্য সব ধরণের অনিষ্ট থেকে হেফাজত করে। এটি কেবল একটি চিকিৎসা পদ্ধতিই নয়, বরং সুন্নাহসম্মত একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। তবে মনে রাখতে হবে, রুকইয়া কোনো অলৌকিক যাদু নয়, বরং এটি একটি বৈধ মাধ্যম মাত্র; আর প্রকৃত আরোগ্যকারী একমাত্র মহান আল্লাহ তাআলা।
ইসলামে রুকইয়ার গুরুত্ব ও বৈধতার শর্তসমূহ
ইসলামে রুকইয়া করার অনুমতি ও নির্দেশনা সরাসরি রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহ দ্বারা প্রমাণিত। তবে যেকোনো ঝাড়ফুঁক ইসলামে গ্রহণযোগ্য নয়। জাহেলী যুগে মানুষ বিভিন্ন কুফরি কালাম ও শিরকী মন্ত্রের মাধ্যমে ঝাড়ফুঁক করত, যা ইসলাম কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছে। আলেমদের সর্বসম্মত অভিমত অনুযায়ী, রুকইয়া বৈধ হওয়ার জন্য তিনটি আবশ্যকীয় শর্ত রয়েছে। প্রথমত, এতে অবশ্যই আল্লাহর কালাম (কুরআন), তাঁর নাম বা গুণাবলি অথবা সুন্নাহর দোয়া থাকতে হবে। দ্বিতীয়ত, এটি স্পষ্ট ও বোধগম্য আরবি বা এমন ভাষায় হতে হবে যার অর্থ সম্পূর্ণ শিরকমুক্ত। তৃতীয়ত, এই দৃঢ় বিশ্বাস রাখতে হবে যে, রুকইয়ার নিজস্ব কোনো ক্ষমতা নেই, বরং আল্লাহর হুকুম ও ইচ্ছাতেই কেবল এটি কার্যকর হয়। এই শর্তগুলো পূরণ হলে রুকইয়া অত্যন্ত বরকতময় এবং আধ্যাত্মিক ও মানসিক প্রশান্তির এক অনন্য উৎস হিসেবে কাজ করে।
কুরআনের আয়াত দিয়ে রুকইয়ার প্রধান দুআসমূহ
১. সূরা আল-ফাতিহা (সর্বোত্তম রুকইয়া)
সূরা আল-ফাতিহাকে 'সূরা আশ-শিফা' বা আরোগ্যের সূরা বলা হয়। সাহাবি আবু সাঈদ আল-খুদরী (রা.) এই সূরা পড়ে এক গোত্রপ্রধানের বিষাক্ত বিচ্ছুর কামড়ের চিকিৎসা করেছিলেন এবং সে সুস্থ হয়ে গিয়েছিল, যা পরবর্তীতে আল্লাহর রাসূল (সা.) অনুমোদন করেন।
উচ্চারণ: বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম। আলহামদু লিল্লাহি রাব্বিল আলামীন। আর-রাহমানির রাহীম। মালিকি ইয়াওমিদ্দীন। ইয়্যাকা না’বুদু ওয়া ইয়্যাকা নাসতাইন। ইহদিনাস-সিরাতাল মুস্তাকীম। সিরাতাল্লাযীনা আন’আমতা আলাইহিম, গাইরিল মাগদূবি আলাইহিম ওয়ালাদ্দাল্লীন।
অনুবাদ: পরম করুণাময় অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে (শুরু করছি)। সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য, যিনি বিশ্বজগতের প্রতিপালক। যিনি পরম করুণাময়, অতি দয়ালু। যিনি বিচার দিবসের মালিক। আমরা কেবল আপনারই ইবাদত করি এবং কেবল আপনারই সাহায্য প্রার্থনা করি। আমাদের সরল পথ প্রদর্শন করুন। তাদের পথ, যাদের আপনি নিয়ামত দান করেছেন; তাদের পথ নয় যারা আপনার ক্রোধভাজন হয়েছে এবং যারা পথভ্রষ্ট হয়েছে।
প্রাসঙ্গিক উৎস: এই সূরার মাধ্যমে রুকইয়া করার সুস্পষ্ট প্রমাণ রয়েছে সহীহ বুখারী, হাদিস ৫০০৭-এ। এটি যেকোনো সাধারণ অসুস্থতা ও বিষাক্ত দংশনের ক্ষেত্রে অত্যন্ত কার্যকর।
২. আয়াতুল কুরসি (সর্বোচ্চ সুরক্ষার আয়াত)
কুরআন মাজীদের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ আয়াত হলো আয়াতুল কুরসি। এটি পাঠ করলে আল্লাহর পক্ষ থেকে বিশেষ একজন হেফাজতকারী ফেরেশতা নিযুক্ত করা হয় এবং শয়তান কোনো ক্ষতি করতে পারে না।
উচ্চারণ: আল্লাহু লা ইলাহা ইল্লা হুওয়াল হাইয়্যুল কাইয়্যুম। লা তা’খুযুহু সিনাতুঁও ওয়ালা নাওম। লাহু মা ফিস-সামাওয়াতি ওয়ামা ফিল আরদ। মান যাল্লাযী ইয়াশফাউ ‘ইনদাহু ইল্লা বিইযনিহ। ইয়া’লামু মা বাইনা আইদীহিম ওয়ামা খালফাহুম। ওয়ালা ইউহীতূনা বিশাইয়িম-মিন ‘ইলমিহী ইল্লা বিমা শাআ। ওয়াসি‘আ কুরসিয়্যুহুস-সামাওয়াতি ওয়াল আরদ, ওয়ালা ইয়াউদুহু হিফজুহুমা, ওয়া হুওয়াল ‘আলিয়্যুল ‘আজীম।
অনুবাদ: আল্লাহ, তিনি ছাড়া কোনো সত্য মাবুদ নেই। তিনি চিরঞ্জীব, সর্বসত্তার ধারক। তাঁকে তন্দ্রা ও নিদ্রা স্পর্শ করে না। আসমানসমূহে যা রয়েছে এবং জমিনে যা রয়েছে সবই তাঁর। কে সে, যে তাঁর অনুমতি ছাড়া তাঁর নিকট সুপারিশ করবে? তাদের সামনে ও পেছনে যা কিছু আছে সবই তিনি জানেন। আর তাঁর ইচ্ছার বাইরে তাঁর জ্ঞানের কিছুই তারা পরিবেষ্টন করতে পারে না। তাঁর কুরসি আসমান ও জমিন জুড়ে পরিব্যাপ্ত এবং এ দুটির রক্ষণাবেক্ষণ তাঁকে ক্লান্ত করে না। আর তিনি সুউচ্চ, মহামহিম।
প্রাসঙ্গিক উৎস: সূরা আল-বাকারা, আয়াত ২৫৫। ঘুমানোর পূর্বে এটি পাঠ করার ফজিলত সহীহ বুখারী, হাদিস ৫০০৮-এ বর্ণিত হয়েছে।
৩. আল-মুআউবিযাত (সূরা ইখলাস, সূরা ফালাক ও সূরা নাস)
রাসূলুল্লাহ (সা.) প্রতি রাতে ঘুমানোর আগে এই তিন সূরা পড়ে নিজের দুই হাতে ফুঁ দিয়ে পুরো শরীরে হাত বুলাতেন। বিশেষ করে সূরা ফালাক ও নাস যাদু-টোনা ও হিংসুকের হিংসা থেকে বাঁচার জন্য অবতীর্ণ হয়েছে।
সূরা আল-ইখলাস:
সূরা আল-ফালাক:
সূরা আন-নাস:
প্রাসঙ্গিক উৎস: সূরা আল-ইখলাস, সূরা আল-ফালাক এবং সূরা আন-নাস। অসুস্থতার সময় এগুলো পড়ে ফুঁ দেওয়ার আমল সহীহ মুসলিম, হাদিস ২২০৫-এ উল্লেখ আছে।
হাদিস থেকে প্রমাণিত রুকইয়ার বিশেষ দোয়াসমূহ
১. কঠিন ব্যাধি ও অনিষ্ট থেকে আশ্রয়ের দোয়া
রাসূলুল্লাহ (সা.) এই দোয়ার মাধ্যমে মারাত্মক সব শারীরিক ও মানসিক ব্যাধি থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করতেন।
উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা ইন্নী আউযু বিকা মিনাল বারাসি ওয়াল জুনূনি ওয়াল জুযামি ওয়া মিন সাইয়্যিইল আসকাম।
অনুবাদ: হে আল্লাহ! আমি আপনার নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করছি শ্বেত রোগ, উন্মাদনা (মানসিক বিকৃতি), কুষ্ঠ রোগ এবং সব ধরনের কঠিন ও দূরারোগ্য ব্যাধি থেকে।
প্রাসঙ্গিক উৎস: সুনান আবু দাউদ, হাদিস ১৫৫৪ (আল-আলবানী কর্তৃক সহীহ গ্রেডিং প্রাপ্ত)।
২. শারীরিক ব্যথানাশক রুকইয়া
শরীরের কোনো স্থানে ব্যথা হলে ডান হাত ব্যথার জায়গায় রেখে ৩ বার 'বিসমিল্লাহ' এবং ৭ বার নিচের দোয়াটি পড়তে হয়।
উচ্চারণ: আউযু বিল্লাহি ওয়া কুদরাতিহী মিন শাররি মা আজিদু ওয়া উহাযিরু।
অনুবাদ: আল্লাহর এবং তাঁর কুদরতের আশ্রয় চাচ্ছি সেই অনিষ্ট থেকে যা আমি অনুভব করছি এবং যার ভয় করছি।
প্রাসঙ্গিক উৎস: সহীহ মুসলিম, হাদিস ২২০২ (উসমান ইবনুল আস রা. কর্তৃক বর্ণিত)।
সুন্নাহসম্মত উপায়ে রুকইয়া করার সঠিক নিয়ম ও আদব
রুকইয়ার পূর্ণ কার্যকারিতা পাওয়ার জন্য কিছু সুন্নাহসম্মত নিয়ম ও আদব মেনে চলা জরুরি। প্রথমত, রুকইয়া করার পূর্বে অজু করে নেওয়া উত্তম এবং স্থানটি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন হওয়া বাঞ্ছনীয়। দ্বিতীয়ত, পূর্ণ ইখলাস এবং এই বিশ্বাস নিয়ে বসতে হবে যে আরোগ্য কেবল আল্লাহর পক্ষ থেকেই আসে। তৃতীয়ত, আয়াত বা দোয়াগুলো পড়ার সময় নিজের দুই হাত একত্রে মিলিয়ে ফুঁ দিয়ে সারা শরীরে হাত বুলানো যায়, অথবা সরাসরি আক্রান্ত ব্যক্তি বা পানির পাত্রে ফুঁ দেওয়া যায়। সেই পানি পান করা বা তা দিয়ে গোসল করাও সুন্নাহ দ্বারা প্রমাণিত। রুকইয়া নিজে নিজের জন্য করা (Self-Ruqyah) সবচেয়ে উত্তম ও নিরাপদ, কারণ এতে ইখলাস ও আল্লাহর প্রতি তাওয়াক্কুল সবচেয়ে বেশি থাকে।
রুকইয়া সংক্রান্ত কিছু সাধারণ ভুল ধারণা
আমাদের সমাজে রুকইয়া নিয়ে কিছু মারাত্মক ভুল ধারণা প্রচলিত রয়েছে। অনেকে মনে করেন রুকইয়া করলেই আধুনিক চিকিৎসা বা ডাক্তারের কাছে যাওয়া যাবে না। এটি সম্পূর্ণ ভুল; ইসলামে রুকইয়ার পাশাপাশি বৈজ্ঞানিক ও ডাক্তারি চিকিৎসা গ্রহণ করার স্পষ্ট নির্দেশ রয়েছে। রুকইয়া মূলত একটি আধ্যাত্মিক ও আত্মিক শক্তি যোগায়, যা মূল চিকিৎসার পরিপূরক হিসেবে কাজ করে। আরেকটি বড় ভুল হলো, বিভিন্ন নামধারী কবিরাজ বা জাদুকরের শরণাপন্ন হওয়া যারা কুফরি কালাম লিখে তাবিজ দেয় বা শরীয়তবিরোধী কাজ করে। এগুলো রুকইয়া নয়, বরং স্পষ্ট শিরক। রুকইয়ার নামে কোনো প্রকার অতিরিক্ত বাড়াবাড়ি বা অবৈজ্ঞানিক দাবি করা থেকে বিরত থাকতে হবে।
রুকইয়ার দুআ নিয়ে সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)
রুকইয়ার দুআ কি নিজে নিজের ওপর করা যায় নাকি অন্য কাউকে দিয়ে করাতে হয়?
অজু ছাড়া কি রুকইয়ার আয়াত বা দোয়াগুলো পড়া যাবে?
রুকইয়া করার পর কত দিনের মধ্যে ফলাফল বা আরোগ্য আশা করা যায়?
রেফারেন্সসমূহ
কুরআনের আয়াতসমূহ
- সূরা আল-ফাতিহা, ১:১-৭ — আরোগ্য ও সুরক্ষার সর্বোত্তম সূরা।
- সূরা আল-বাকারা, ২:২৫৫ — আয়াতুল কুরসি, শয়তান ও অনিষ্ট থেকে রাতের সুরক্ষার মাধ্যম।
- সূরা আল-ইখলাস, ১১২:১-৪ — তাওহীদের ঘোষণা ও অন্যতম সুরক্ষার সূরা।
- সূরা আল-ফালাক, ১১৩:১-৫ — হিংসা, যাদু ও অন্ধকারের অনিষ্ট থেকে আশ্রয়।
- সূরা আন-নাস, ১১৪:১-৬ — মানুষ ও জিনের শয়তানি কুমন্ত্রণা থেকে মুক্তি।
হাদিস শরীফ
- সহীহ বুখারী, হাদিস ৫০০৭ (অধ্যায়: কুরআনের فضائل) — সূরা ফাতিহা দ্বারা রুকইয়ার বিবরণ।
- সহীহ বুখারী, হাদিস ৫০০৮ — আয়াতুল কুরসির মাধ্যমে শয়তান থেকে রাতের সুরক্ষার প্রমাণ।
- সহীহ মুসলিম, হাদিস ২২০৫ — অসুস্থতায় মুআউবিযাত (সূরা ফালাক ও নাস) পড়ে ফুঁ দেওয়ার আমল।
- সহীহ মুসলিম, হাদিস ২২০২ — শরীরের ব্যথার স্থানে হাত রেখে দোয়ার নিয়ম।
- সুনান আবু দাউদ, হাদিস ১৫৫৪ (অধ্যায়: দোয়া) — কঠিন ও দূরারোগ্য ব্যাধি থেকে আশ্রয়ের দোয়া।

