দৈনন্দিন জীবনে আমরা অনেক সময় মানসিক চাপ, কোনো কঠিন কাজ বা মানুষের সামনে কথা বলার ক্ষেত্রে জড়তা অনুভব করি। এ ধরনের পরিস্থিতিতে অন্তরের প্রশান্তি, কাজের সহজতা এবং সাবলীলভাবে নিজের বক্তব্য উপস্থাপনের জন্য একটি অত্যন্ত শক্তিশালী ও বরকতময় প্রার্থনা হলো—‘রাব্বি ইশরাহ লি সাদরি’। এটি মূলত পবিত্র কুরআনে বর্ণিত হযরত মুসা (আলাইহিস সালাম)-এর একটি ঐতিহাসিক দুআ, যা তিনি ফিরাউনের দরবারে তাওহীদের দাওয়াত নিয়ে যাওয়ার আগে আল্লাহর কাছে করেছিলেন।
এই দুআটি নিয়মিত পাঠের মাধ্যমে আল্লাহর রহমতে অন্তরের সংকীর্ণতা দূর হয় এবং যেকোনো কঠিন পরিস্থিতিতে স্থির থাকা সহজ হয়। নিচে এই মহান দুআটির আরবি, বাংলা উচ্চারণ, অর্থ, গুরুত্ব ও আমলের নিয়মসমূহ বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।
রাব্বি ইশরাহ লি সাদরি দুআ: আরবি, উচ্চারণ ও অর্থ
সুরা ত্বা-হা-এর ২৫ থেকে ২৮ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা হযরত মুসা (আঃ)-এর এই প্রার্থনাটি হুবহু উল্লেখ করেছেন। দুআটি ছোট হলেও এর পরিধি এবং গভীরতা অত্যন্ত ব্যাপক।
আরবি টেক্সট
বাংলা উচ্চারণ
উচ্চারণ: রাব্বিশ রাহলি সাদরি, ওয়া ইয়াচ্ছির লি আমরি, ওয়াহলুল উকদাতাম মিল লিসানি, ইয়াফকাহু কাওলি।
বাংলা অনুবাদ
অনুবাদ: হে আমার প্রতিপালক! আমার বক্ষ প্রশস্ত করে দিন। এবং আমার কাজ সহজ করে দিন। আর আমার জিহ্বার জড়তা দূর করে দিন, যাতে তারা আমার কথা বুঝতে পারে।
কুরআনিক প্রেক্ষাপট ও গুরুত্ব
যখন আল্লাহ তাআলা হযরত মুসা (আঃ)-কে তৎকালীন সবচেয়ে বড় জালেম ও উদ্ধত শাসক ফিরাউনের কাছে দ্বীনের দাওয়াত নিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দিলেন, তখন মুসা (আঃ) আল্লাহর কাছে এই প্রার্থনাগুলো করেছিলেন। তিনি প্রথমত আল্লাহর কাছে ‘বক্ষ প্রশস্ত’ বা অন্তরের প্রসারণ চেয়েছেন, কারণ যেকোনো বড় দায়িত্ব পালনের জন্য মানসিক শক্তি ও অসীম ধৈর্যের প্রয়োজন। দ্বিতীয়ত, তিনি কাজ সহজ হওয়ার এবং তৃতীয়ত, নিজের মুখের জড়তা দূর হওয়ার দুআ করেন, যাতে ফিরাউনের দরবারে তিনি স্পষ্টভাবে তাওহীদের বাণী পৌঁছে দিতে পারেন। আল্লাহ তাআলা তাঁর এই দুআ কবুল করেছিলেন, যার বিবরণ পবিত্র কুরআনে বর্ণিত রয়েছে।
এই দুআটি কখন এবং কেন পড়বেন?
যদিও এই দুআটি একটি নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে করা হয়েছিল, তবে এর কার্যকারিতা সর্বজনীন। একজন মুমিন ব্যক্তি তার জীবনের যেকোনো কঠিন বা গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে এই দুআর মাধ্যমে আল্লাহর সাহায্য চাইতে পারেন:
- মানসিক প্রশান্তি ও দুশ্চিন্তা মুক্তিতে: যখন মন অতিরিক্ত অস্থির বা সংকুচিত হয়ে পড়ে, তখন এই দুআটি অন্তরে আত্মবিশ্বাস ও প্রশান্তি ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করে।
- পরীক্ষা ও ইন্টারভিউয়ের পূর্বে: যেকোনো পরীক্ষা, ইন্টারভিউ কিংবা চাকুরির ভাইভার আগে মনকে শান্ত রাখতে এবং জড়তা কাটাতে এই দুআটি অত্যন্ত উপযোগী।
- বক্তব্য ও উপস্থাপনার সময়: মানুষের সামনে কথা বলা, কোনো বিষয়ে প্রেজেন্টেশন বা বক্তব্য দেওয়ার সময় যাদের মুখে জড়তা আসে বা ভয় কাজ করে, তারা এই দুআটির মাধ্যমে উপকৃত হতে পারেন।
- কঠিন কোনো কাজের শুরুতে: দৈনন্দিন জীবনের যেকোনো জটিল কাজ বা সিদ্ধান্ত গ্রহণের আগে আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে এই দুআটি পড়া উচিত।
ইসলামিক আদব ও আমলের নিয়ম
পবিত্র কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে দুআ কবুলের কিছু সাধারণ শর্ত ও আদব রয়েছে। এই দুআটি আমল করার ক্ষেত্রে নিচের বিষয়গুলো লক্ষ্য রাখা উত্তম:
- অর্থ ও মর্ম অনুধাবন করা: দুআটি পড়ার সময় শুধু মুখে উচ্চারণ না করে, এর অর্থ অন্তরে লালন করা উচিত। আমি আল্লাহর কাছে কী চাচ্ছি—তা জানা থাকলে দুআর একাগ্রতা বৃদ্ধি পায়।
- ইখলাস ও একনিষ্ঠতা: আল্লাহ অবশ্যই আমার মনের সংকীর্ণতা দূর করবেন এবং কাজ সহজ করবেন—এই দৃঢ় বিশ্বাস নিয়ে দুআ করতে হবে।
- পবিত্রতা অর্জন: যেকোনো সময় দুআটি পড়া জায়েজ হলেও ওজু অবস্থায় কিবলামুখী হয়ে দুআ করা উত্তম। তবে নারীদের বিশেষ দিনগুলোতে (ঋতুস্রাবকালীন) কুরআন স্পর্শ না করে মুখে বা স্মৃতি থেকে দুআ হিসেবে এটি পাঠ করায় কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই।
- সংখ্যা ও নিয়ম: শরিয়তে এই দুআটি পড়ার জন্য নির্দিষ্ট কোনো সংখ্যা (যেমন ৩, ৭ বা ২১ বার) বাধ্যতামূলক করা হয়নি। আপনি আপনার প্রয়োজন অনুযায়ী যেকোনো সময় ও যেকোনো সংখ্যায় এটি আমল করতে পারেন।
দুআ কবুলের শর্তসমূহ
ইসলামি আকিদা অনুযায়ী, আল্লাহ তাআলা বান্দার বৈধ দুআ অবশ্যই শুনেন এবং কবুল করেন, যতক্ষণ না বান্দা কোনো পাপ কাজ বা আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করার দুআ করে এবং তাড়াহুড়ো না করে। পাশাপাশি বান্দার খাদ্য, পানীয় এবং উপার্জনকে সম্পূর্ণ হালাল হতে হবে, যা দুআ কবুলের অন্যতম প্রধান শর্ত।
তথ্যসূত্র
কুরআনের আয়াতসমূহ
- সূরা ত্বা-হা, ২০:২৫-২৮ — হযরত মুসা (আঃ) এর বক্ষ প্রশস্তকরণ, কাজ সহজীকরণ ও জিহ্বার জড়তা দূরীকরণের ঐতিহাসিক দুআ।
হাদিস শরিফ
- সহীহ মুসলিম, হাদিস ২৭০২ — দুআ কবুলের শর্তাবলি এবং তাড়াহুড়ো না করার নির্দেশ।

