মানবজীবনে সুখ-দুঃখ এবং নানা প্রতিকূলতা আসবেই। কঠিন বিপদের মুহূর্তে মহান আল্লাহর সাহায্য লাভ করার জন্য পবিত্র কুরআনে বেশ কিছু দুয়া বর্ণিত হয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম একটি শক্তিশালী ও বরকতময় আমল হলো নবী ইউনুস (আ.)-এর দুয়া, যা 'দুয়া ইউনুস' নামে বিশেষভাবে পরিচিত। ঘোর অন্ধকারে যখন মানুষের সব পথ বন্ধ হয়ে যায়, তখন এই দুয়া আল্লাহর রহমতের দরজা খুলে দেয়।
দুয়া ইউনুস (আ.) এর মূল পাঠ, উচ্চারণ ও অর্থ
হযরত ইউনুস (আ.) যখন মাছের পেটে ঘোর অন্ধকারে নিমজ্জিত ছিলেন, তখন তিনি আকুল হয়ে মহান আল্লাহর কাছে এই দুয়াটি করেছিলেন। পবিত্র কুরআনের সূরা আল-আম্বিয়া, আয়াত ৮৭-এ এই দুয়াটি উল্লেখ করা হয়েছে।
উচ্চারণ: লা ইলাহা ইল্লা আনতা সুবহানাকা ইন্নি কুনতু মিনাজ-জোয়ালিমীন।
অনুবাদ: আপনি ব্যতীত কোনো সত্য উপাস্য নেই; আপনি পবিত্র ও মহান। নিশ্চয়ই আমি অপরাধীদের (অন্যায়কারীদের) অন্তর্ভুক্ত ছিলাম।
দুয়া ইউনুসের ঐতিহাসিক পটভূমি
হযরত ইউনুস (আ.)-কে ইরাকের নিনেভা নগরীর অধিবাসীদের হেদায়েতের জন্য পাঠানো হয়েছিল। দীর্ঘকাল দাওয়াত দেওয়ার পরও যখন তাঁর কওম ঈমান আনল না, তখন তিনি আল্লাহর চূড়ান্ত আদেশের অপেক্ষা না করেই ক্ষোভে নগরী ত্যাগ করেন। পথিমধ্যে তিনি একটি সমুদ্রগামী জাহাজে চড়েন। মাঝনদীতে জাহাজটি ঝড়ের কবলে পড়লে আরোহীদের জীবন বাঁচাতে লটারির ব্যবস্থা করা হয়। পরপর তিনবার লটারিতে হযরত ইউনুস (আ.)-এর নাম আসে।
নিয়তি মেনে তাঁকে সাগরে ফেলে দেওয়া হলে আল্লাহর নির্দেশে এক বিশাল মাছ তাঁকে গিলে ফেলে। মাছের পেটের সেই নিশ্ছিদ্র অন্ধকারে নিজের ভুল বুঝতে পেরে তিনি আল্লাহর দরবারে এই তাওহীদ, তাসবীহ ও ইস্তিগফার সম্বলিত মোনাজাত করেন। তাঁর এই ব্যাকুল প্রার্থনা আল্লাহর দরবারে কবুল হয় এবং মাছটি তাঁকে অক্ষত অবস্থায় সমুদ্রতীরে উগরে দেয়।
দুয়া ইউনুসের ফজিলত ও গুরুত্ব
রাসূলুল্লাহ (সা.) এই দুয়ার বিশেষ ফজিলত বর্ণনা করেছেন। বিপদে পড়ে এই দুয়া পাঠ করলে মহান আল্লাহ অবশ্যই সেই বিপদ দূর করেন।
হযরত সা'দ ইবনে আবি ওক্কাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, মাছের পেটে ইউনুস (আ.) যে দুয়া করেছিলেন, কোনো মুসলিম ব্যক্তি যদি কোনো সংকটে পড়ে তা পাঠ করে, তবে আল্লাহ অবশ্যই তার ডাক কবুল করবেন। — জামে তিরমিযী, হাদিস ৩৫০৫ (হাদিসটি সহীহ)
অনেক সময় একটি প্রচলিত উক্তি শোনা যায় যে, 'দুয়া হলো মুমিনের অস্ত্র।' এটি একটি সুন্দর আধ্যাত্মিক ধারণা হলেও, রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুনির্দিষ্ট সুন্নাহর আলোকে দুয়া ইউনুসের আমলটিই সংকটের সময় বান্দার জন্য সবচেয়ে বড় আশ্রয় ও ইবাদত হিসেবে প্রমাণিত।
দুয়া কবুলের সুনির্দিষ্ট শর্তাবলী
ইসলামী আকীদা ও শরিয়তের নিয়ম অনুযায়ী, আল্লাহ তাআলা বান্দার দুয়া অবশ্যই শোনেন এবং উত্তম উপায়ে তার জবাব দেন। তবে দুয়া কবুল হওয়ার জন্য কিছু আবশ্যিক শর্ত রয়েছে। যদি কোনো ব্যক্তি হারাম খাবার গ্রহণ করে, আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করে কিংবা কোনো পাপ কাজের জন্য দুয়া করে, তবে তা কবুল হয় না। পাশাপাশি, দুয়া করার পর অধৈর্য হওয়া যাবে না। পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাসের সাথে আল্লাহর কাছে চাইতে হবে।
দুয়া ইউনুস থেকে শিক্ষণীয় বিষয়
- তাওহীদের স্বীকৃতি: দুয়ার শুরুতেই আল্লাহর একত্ববাদের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে, যা ইমানের মূল ভিত্তি।
- আল্লাহর পবিত্রতা ঘোষণা: 'সুবহানাকা' শব্দের মাধ্যমে স্বীকার করা হয় যে আল্লাহ সমস্ত ত্রুটি ও অন্যায় থেকে পবিত্র।
- নিজের অপরাধ স্বীকার: নিজের ভুল বা পাপ স্বীকার করে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়া (ইস্তিগফার) দুয়া কবুলের অন্যতম প্রধান মাধ্যম।
- মানসিক প্রশান্তি: এই দুয়া কোনো চিকিৎসার বিকল্প নয়, তবে কঠিন মনস্তাত্ত্বিক চাপ ও উদ্বেগের সময় এটি মুমিনের অন্তরে গভীর আধ্যাত্মিক শক্তি ও সান্ত্বনা জোগায়।
তথ্যসূত্র
কুরআনের আয়াত
- সূরা আল-আম্বিয়া, ২১:৮৭ — মাছের পেটে নবী ইউনুস (আ.) এর প্রার্থনা ও বিপদমুক্তির বর্ণনা।
হাদিস
- জামে তিরমিযী, হাদিস ৩৫০৫ (তাহকীক: আল-আলবানী, সহীহ) — দুয়া ইউনুস পাঠে বিপদ দূর হওয়ার ঘোষণা।

