ইসলামে নিকাহ বা বিবাহ কেবল দুটি মনের লৌকিক মিলন কিংবা সামাজিক চুক্তি নয়, বরং এটি একটি পবিত্র ইবাদত এবং রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সুন্নাহ। একটি নতুন দাম্পত্য জীবনের সূচনা তখনই বরকতময় ও সফল হয়, যখন তার ভিত্তি তৈরি হয় মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি ও রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর নির্দেশিত পন্থার ওপর। বিবাহ বন্ধনকে শয়তানের অনিষ্ট থেকে রক্ষা করতে এবং জীবনে সুখ-শান্তি বজায় রাখতে ইসলামে বিশেষ কিছু দোয়া ও আমলের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বিবাহের বরকত লাভে নবদম্পতির জন্য উপস্থিত অতিথিদের দোয়া করা একটি সুন্নাহ সম্মত আমল। রাসুলুল্লাহ (সা.) বিবাহের মজলিসে বর-কনের জন্য বিশেষ শব্দে বরকতের দোয়া করতেন। এই নিবন্ধে আমরা নিকাহর মূল দোয়া, তার বিশুদ্ধ আরবি, বাংলা উচ্চারণ, অর্থ, বিয়ের খুতবা এবং এ সংক্রান্ত শরিয়তের গুরুত্বপূর্ণ আদবগুলো বিস্তারিত আলোচনা করব।
নিকাহর সুন্নাহ সম্মত দোয়া (বরকতের দোয়া)
বিবাহের চুক্তি (ঈজাব ও কবুল) সম্পন্ন হওয়ার পর নবদম্পতির কল্যাণ ও বরকত কামনা করে দোয়া করা সুন্নাত। রাসুলুল্লাহ (সা.) বিবাহ উপলক্ষে বর-কনেকে অভিনন্দন জানানোর সময় একটি বিশেষ দোয়া পাঠ করতেন।
উচ্চারণ: বারাকাল্লাহু লাকা, ওয়া বারাকা আলাইকা, ওয়া জামা‘আ বাইনাকুমা ফী খাইর।
অনুবাদ: আল্লাহ তোমার জন্য বরকত দান করুন, তোমার ওপর বরকত নাজিল করুন এবং তোমাদের উভয়কে কল্যাণের সাথে একত্রিত করুন।
এই বরকতময় দোয়াটি সুনান আবু দাউদ, হাদিস ২১৩০ এবং সূনান আত-তিরমিযী, হাদিস ১০৯১-এ বর্ণিত হয়েছে। ইমাম তিরমিযী হাদিসটিকে হাসান সহীহ বলে উল্লেখ করেছেন।
বিয়ের খুতবা এবং এর তাৎপর্য
নিকাহ অনুষ্ঠানের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সুন্নাহ হলো 'খুতবাতুন নিকাহ' বা বিবাহের খুতবা পাঠ করা। বিবাহ পড়ানোর ঠিক পূর্ব মুহূর্তে উপস্থিত মজলিসে এই খুতবা প্রদান করা হয়। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) আমাদের প্রয়োজনের সময় (যেমন বিয়ের মজলিসে) খুতবা প্রদানের একটি নিয়ম শিখিয়েছেন, যা 'খুতবাতুল হাজাহ' নামেও পরিচিত।
এই খুতবায় আল্লাহর প্রশংসা ও দরূদ পাঠের পর পবিত্র কুরআনের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ আয়াত পাঠ করা হয়। আয়াতগুলো হলো: সূরা আল-ইমরান, আয়াত ১০২, সূরা আন-নিসা, আয়াত ১ এবং সূরা আল-আহযাব, আয়াত ৭০-৭১। এই আয়াতগুলোতে মূলত তাকওয়া (খোদাভীতি), মানুষের সৃষ্টিতত্ত্ব, আত্মীয়তার বন্ধন রক্ষা এবং সত্য কথা বলার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যা একটি সুখী দাম্পত্য জীবনের মূল চালিকাশক্তি।
বাসর রাতে স্ত্রীর মাথায় হাত রেখে বরের দোয়া
বিবাহ সম্পন্ন হওয়ার পর বাসর রাতে যখন স্বামী তার স্ত্রীর কাছে প্রথম পদার্পণ করবে, তখন স্ত্রীর কপালের সামনের অংশের চুলে (ঝুঁটিতে) হাত রেখে বরকতের দোয়া করা সুন্নাত। এটি দাম্পত্য জীবনের শুরুতে পারস্পরিক ভালোবাসা ও কল্যাণ নিশ্চিত করে।
উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা ইন্নি আস্আলুকা খাইরাহা ওয়া খাইরা মা জাবালতাহা আলাইহি, ওয়া আউযুবিকা মিন শাররিহা ওয়া মিন শাররি মা জাবালতাহা আলাইহি।
অনুবাদ: হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে তার মঙ্গল এবং আপনি তাকে যে উত্তম চরিত্রের ওপর সৃষ্টি করেছেন তা প্রার্থনা করছি। আর আমি আপনার কাছে তার অনিষ্ট এবং আপনি তাকে যে মন্দ চরিত্রের ওপর সৃষ্টি করেছেন তা থেকে আশ্রয় চাচ্ছি।
এই আমল ও দোয়াটি সুনান আবু দাউদ, হাদিস ২১৬০ এবং সুনান ইবনে মাজাহ, হাদিস ১৯১৮-এ বর্ণিত হয়েছে (আল-আলবানী এটিকে হাসান গ্রেড দিয়েছেন)।
নিকাহ ও দাম্পত্য জীবনের সাধারণ কিছু ভুলত্রুটি
আমাদের সমাজ ব্যবস্থায় বিয়ের মতো একটি পবিত্র ইবাদত পালন করতে গিয়ে বেশ কিছু গুনাহ এবং ভুলত্রুটি প্রকাশ পায়, যা থেকে বেঁচে থাকা প্রত্যেক মুমিনের দায়িত্ব:
- **লৌকিকতা ও অপচয়:** সামাজিক মর্যাদা প্রদর্শনের উদ্দেশ্যে বিয়েতে অতিরিক্ত আলোকসজ্জা, গান-বাজনা এবং বেহিসেবি অর্থ অপচয় করা আল্লাহর রহমত থেকে বঞ্চিত হওয়ার অন্যতম কারণ।
- **পর্দার খেলাপ:** বিয়ের প্যান্ডেলে বা অনুষ্ঠানে নারী-পুরুষের অবাধ মিশ্রণ শরিয়ত পরিপন্থী কাজ।
- **যৌতুক প্রথা:** বরের পক্ষ থেকে কনে পক্ষের কাছে কোনো ধরনের অর্থ বা সামগ্রী দাবি করা ইসলামে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ এবং এটি জুলুমের শামিল।
রেফারেন্স
কুরআনুল কারীম
- সূরা আন-নিসা, ০৪:০১ — খুতবায়ে নিকাহে পঠিত প্রথম আয়াত (মানব সৃষ্টির মূল ও তাকওয়ার নির্দেশ)।
- সূরা আল-আহযাব, ৩৩:৭০ — খুতবায়ে নিকাহে পঠিত সত্য বলার নির্দেশ সম্বলিত আয়াত।
হাদিস শরিফ
- সুনান আবু দাউদ, হাদিস ২১৩০ (অধ্যায়: নিকাহ) — নবদম্পতির জন্য রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর বরকতের দোয়া।
- সূনান আত-তিরমিযী, হাদিস ১০৯১ (অধ্যায়: নিকাহ) — বিবাহোত্তর অভিনন্দন ও দোয়া সংক্রান্ত বর্ণনা।
- সুনান আবু দাউদ, হাদিস ২১৬০ — বাসর রাতে স্ত্রীর মাথায় হাত রেখে বরের পড়ার দোয়া।

