বিয়ের দোয়া: ইসলামিক বৈবাহিক জীবনের সহজ ও সম্পূর্ণ গাইড

আব্দুর রহমান
আব্দুর রহমান
১২ জুল, ২০২৬বিবাহ

ইসলামে বিবাহ কেবল দুটি মানুষের সামাজিক বন্ধনই নয়, বরং এটি একটি পবিত্র ইবাদত এবং মহান আল্লাহর অন্যতম বড় নিয়ামত। একটি সুখী, শান্তিময় ও বরকতময় দাম্পত্য জীবন গঠনে দোয়ার ভূমিকা অপরিসীম। বিবাহের সিদ্ধান্ত নেওয়া থেকে শুরু করে বিয়ের মজলিস, বাসর রাত এবং পরবর্তী বৈবাহিক জীবনের প্রতিটি ধাপে রাসুলুল্লাহ (সা.) আমাদের চমৎকার সব দোয়া ও আমল শিখিয়েছেন। এই নিবন্ধে আমরা পবিত্র কুরআন ও সহিহ হাদিসের আলোকে বিয়ের বিভিন্ন সময়ের প্রয়োজনীয় দোয়া, সেগুলোর সঠিক উচ্চারণ ও অর্থসহ একটি সম্পূর্ণ নির্দেশিকা আলোচনা করব।

বিয়ের দোয়া ও আমলের গুরুত্ব

বিবাহিত জীবনের সুখ, শান্তি ও স্থায়িত্ব সম্পূর্ণরূপে আল্লাহর রহমতের ওপর নির্ভরশীল। শয়তান সবসময় চেষ্টা করে একটি সুন্দর পরিবারকে ভেঙে দিতে। তাই বিয়ের শুরু থেকেই আল্লাহর কাছে বরকত ও নিরাপত্তা চাওয়া অত্যন্ত জরুরি। দোয়ার মাধ্যমে নবদম্পতি আল্লাহর বিশেষ হেফাজত লাভ করে এবং তাদের পারস্পরিক ভালোবাসা বৃদ্ধি পায়। তবে মনে রাখতে হবে, দোয়া কবুলের জন্য হালাল উপার্জন এবং শরিয়তের বিধিবিধান মেনে চলা আবশ্যক শর্ত।

১. বিয়ের পূর্বে বা উত্তম জীবনসঙ্গী পাওয়ার দোয়া

যাঁরা বিবাহের প্রস্তুতি নিচ্ছেন বা একটি সৎ ও চরিত্রবান জীবনসঙ্গী খুঁজছেন, তাঁদের জন্য পবিত্র কুরআনে একটি চমৎকার দোয়া শিখিয়ে দেওয়া হয়েছে। এই দোয়াটি নিয়মিত পাঠ করা অত্যন্ত ফলপ্রসূ:

رَبَّنَا هَبْ لَنَا مِنْ أَزْوَاجِنَا وَذُرِّيَّاتِنَا قُرَّةَ أَعْيُنٍ وَاجْعَلْنَا لِلْمُتَّقِينَ إِمَامًا

উচ্চারণ: রাব্বানা হাব লানা মিন আজওয়াজিনা ওয়া জুররিয়্যাতিনা কুররাতা আ’ইউনিওঁ ওয়াজআলনা লিলমুত্তাকীনা ইমামা।

অনুবাদ: হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের স্ত্রী ও সন্তানদের মধ্য থেকে আমাদের জন্য চোখের শীতলতা দান করো এবং আমাদের মুত্তাকিদের জন্য আদর্শ বানাও। (সূরা আল-ফুরকান, আয়াত ৭৪)।

২. বিয়ের মজলিসে নবদম্পতিকে অভিনন্দন জানানোর দোয়া

বিবাহ সম্পন্ন হওয়ার পর উপস্থিত আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধুবান্ধবদের উচিত বর-কনেকে অভিনন্দন জানানো এবং তাদের জন্য বরকতের দোয়া করা। জাহেলি যুগে লোকেরা বলতো ‘তোমাদের মিলন সুখে ও সন্তুষ্টিতে হোক’, কিন্তু রাসুলুল্লাহ (সা.) তা পরিবর্তন করে এই বরকতময় দোয়াটি শিখিয়েছেন:

بَارَكَ اللَّهُ لَكَ وَبَارَكَ عَلَيْكَ وَجَمَعَ بَيْنَكُمَا فِي خَيْرٍ

উচ্চারণ: বারাকাল্লাহু লাকা ওয়া বারাকা আলাইকা ওয়া জামাআ বায়নাকুমা ফী খাইর।

অনুবাদ: আল্লাহ তোমাকে বরকত দিন, তোমার ওপর বরকত নাজিল করুন এবং তোমাদের উভয়কে কল্যাণের সাথে একত্রিত করুন।

আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী করীম (সা.) কোনো মানুষকে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার পর অভিনন্দন জানালে এই দোয়াটি পড়তেন। (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস ২১৩০; আল-আলবানি কর্তৃক সহিহ প্রমাণিত)।

৩. বাসর রাতে স্ত্রীর মস্তক স্পর্শ করে পড়ার দোয়া

বিয়ের পর প্রথম রাতে যখন স্বামী তার স্ত্রীর কাছে একান্তে যাবে, তখন সুন্নাহ হলো স্ত্রীর কপালের সম্মুখভাগের চুল (অলকগুচ্ছ) ডান হাত দিয়ে স্পর্শ করা, আল্লাহর নাম নেওয়া (বিসমিল্লাহ বলা) এবং এই দোয়াটি পাঠ করা:

اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ خَيْرَهَا وَخَيْرَ مَا جَبَلْتَهَا عَلَيْهِ وَأَعُوذُ بِكَ مِنْ شَرِّهَا وَشَرِّ مَا جَبَلْتَهَا عَلَيْهِ

উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা ইন্নি আসআলুকা খাইরাহা ওয়া খাইরা মা জাবালতাহা আলাইহি, ওয়া আউজু বিকা মিন শাররিহা ওয়া শাররি মা জাবালতাহা আলাইহি।

অনুবাদ: হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে তার কল্যাণ এবং আপনি তার স্বভাবের মধ্যে যে কল্যাণ সৃষ্টি করেছেন তা প্রার্থনা করছি। আর তার অমঙ্গল এবং আপনি তার স্বভাবের মধ্যে যে অমঙ্গল সৃষ্টি করেছেন তা থেকে আশ্রয় চাচ্ছি।

আমর ইবনে শুআইব (রহ.) তাঁর পিতা থেকে, তিনি তাঁর দাদা থেকে বর্ণনা করেন যে, নবী করীম (সা.) এই নির্দেশনা দিয়েছেন। (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস ২১১; আল-আলবানি কর্তৃক হাসান প্রমাণিত)।

৪. দাম্পত্য জীবনের সার্বিক কল্যাণের সাধারণ দোয়া

সংসার জীবনে সুখ-শান্তি বজায় রাখতে এবং সব ধরনের অনিষ্ট থেকে বাঁচতে প্রতিদিনের আমল হিসেবে পবিত্র কুরআনের এই বিখ্যাত দোয়াটি বেশি বেশি পড়া উচিত:

رَبَّنَا آتِنَا فِي الدُّنْيَا حَسَنَةً وَفِي الْآخِرَةِ حَسَنَةً وَقِنَا عَذَابَ النَّارِ

উচ্চারণ: রাব্বানা আতিনা ফিদ্দুনিয়া হাসানাতাওঁ ওয়া ফিল আখিরাতি হাসানাতাওঁ ওয়া কিনা আজাবান্নার।

অনুবাদ: হে আমাদের রব! আমাদের দুনিয়াতেও কল্যাণ দান করুন এবং আখিরাতেও কল্যাণ দান করুন এবং জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করুন। (সূরা আল-বাকারা, আয়াত ২০১)।

দোয়া ও বিবাহ সংক্রান্ত কিছু সাধারণ ভুল ও কুসংস্কার

আমাদের সমাজে বিয়ের সময় নানা রকম অনৈসলামিক রীতিনীতি ও কুসংস্কার দেখা যায়, যা বর্জন করা আবশ্যক। যেমন—অনেক সময় বর-কনেকে ঘিরে কুফরি বা জ্যোতিষ শাস্ত্রীয় মেলবন্ধন খোঁজা হয়, যা আকীদার পরিপন্থী। এছাড়া দোয়ার ক্ষেত্রে অনেকে মনে করেন কেবল হুজুর বা কাজী সাহেব দোয়া করলেই হবে, অথচ সুন্নাহ হলো বর-কনে নিজেরা এবং উপস্থিত প্রত্যেকেই আন্তরিকভাবে দোয়া করা। আরবি উচ্চারণ যেন বিকৃত না হয়, সেদিকেও লক্ষ্য রাখা জরুরি।

দাম্পত্য জীবন ও মানসিক প্রশান্তি

ইসলামিক জীবনধারা ও নিয়মতান্ত্রিক দোয়া-আমল দাম্পত্য জীবনে পারস্পরিক বোঝাপড়া ও আত্মিক শান্তি বজায় রাখতে দারুণ ভূমিকা রাখে। তবে একে কেবল আধ্যাত্মিক বিষয় হিসেবে সীমাবদ্ধ না রেখে, পরিবারে কোনো তীব্র মানসিক বা মনস্তাত্ত্বিক দূরত্বের সৃষ্টি হলে ইসলামি দিকনির্দেশনার পাশাপাশি অভিজ্ঞ ফ্যামিলি কাউন্সেলর বা পেশাদারদের সাহায্য নেওয়াও অত্যন্ত কার্যকর ও বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ।

অনুমোদিত রেফারেন্সসমূহ

কুরআন মাজিদ

হাদিস শরিফ

বিয়ের দোয়া কি কেবল আরবিতেই করতে হবে?

হাদিসে বর্ণিত সুন্নতি দোয়াগুলো হুবহু আরবিতে উচ্চারণ করা উত্তম, কারণ এতে সুন্নাহর পূর্ণ সওয়াব ও বরকত পাওয়া যায়। তবে কেউ যদি আরবি না জানেন, তবে নিজের ভাষায় মনে মনে বা মুখে অর্থ বুঝে আল্লাহর কাছে দোয়া করলেও তা নিশ্চিতভাবে কবুল হবে।

নবদম্পতিকে ‘সুখে-শান্তিতে থেকো’ বলা কি নিষিদ্ধ?

নিষিদ্ধ নয়, তবে এটি জাহেলি যুগের একটি প্রথা যেখানে আল্লাহর বরকতের কথা উল্লেখ থাকতো না। ইসলাম আমাদের এর চেয়েও উত্তম ও তাৎপর্যপূর্ণ দোয়া ‘বারাকাল্লাহু লাকা...’ শিখিয়েছে, যাতে দুনিয়া ও আখেরাত উভয়ের কল্যাণের দোয়া অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। তাই সুন্নতি দোয়াটি পঠনই শ্রেয়।

বাসর রাতে স্বামী-স্ত্রী একত্রে সালাত আদায় করা কি সুন্নত?

হ্যাঁ, বিয়ের প্রথম রাতে স্বামী ও স্ত্রী একত্রে (স্বামী ইমাম হয়ে) দুই রাকাত নফল নামাজ আদায় করা এবং নামাজ শেষে দাম্পত্য জীবনের সুখ ও বরকতের জন্য আল্লাহর কাছে যৌথভাবে দোয়া করা সালাফে সালেহীন ও ওলামায়ে কেরামের নিকট মুস্তাহাব ও বরকতময় আমল হিসেবে প্রমাণিত।

বিবাহের খুতবা পাঠ করা কি ফরজ?

বিবাহের পূর্বে খুতবা (খুতবাতুল হাজাহ) পাঠ করা ফরজ বা রুকন নয়, বরং এটি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সুন্নাত আমল। খুতবা ছাড়াও যদি ইজাব ও কবুল (প্রস্তাব ও গ্রহণ) এবং দুজন ন্যায়পরায়ণ সাক্ষীর উপস্থিতি ঠিক থাকে, তবে বিবাহ শুদ্ধ হয়ে যাবে।

উপসংহার

ইসলামিক বিবাহ কেবল একটি চুক্তি নয়, বরং এটি আল্লাহর রহমত ও বরকত লাভের এক অনুপম মাধ্যম। বিয়ের প্রতিটি পদক্ষেপে সুন্নাহসম্মত দোয়া ও আমলসমূহ আঁকড়ে ধরলে দাম্পত্য জীবনে শয়তানের কুপ্রভাব থেকে বাঁচা সম্ভব। আসুন, আমরা লোকদেখানো সংস্কৃতির ঊর্ধ্বে উঠে সুন্নাহ অনুযায়ী বিবাহ সম্পাদন করি এবং পবিত্র দাম্পত্য জীবন গড়ে তুলি। আল্লাহ তাআলা আমাদের দাম্পত্য জীবনগুলোকে বরকতময় করুন। আমিন।

আব্দুর রহমান

আব্দুর রহমান

এসইও স্পেশালিস্ট ও কনটেন্ট রাইটার

আব্দুর রহমান একজন এসইও স্পেশালিস্ট এবং ইসলামিক কনটেন্ট রাইটার। তিনি ফিকহ, দৈনন্দিন ইবাদত, নামাজ, পারিবারিক দিকনির্দেশনা এবং বাস্তব মুসলিম জীবনধারা নিয়ে সহজ প্রবন্ধ লেখেন, যাতে পাঠকরা প্রতিদিনের জীবনে ইসলাম অনুসরণ করতে পারেন।

আপডেট থাকুন

আমাদের সর্বশেষ আপডেট ও রিলিজ মিস করবেন না