মানবজীবনে বিবাহ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং সংবেদনশীল একটি অধ্যায়। একটি সঠিক সিদ্ধান্ত যেমন পুরো জীবনকে শান্তিময় করে তুলতে পারে, তেমনই একটি ভুল সিদ্ধান্ত ডেকে আনতে পারে চরম বিপর্যয়। তাই ইসলামে বিয়ের মতো যেকোনো গুরুত্বপূর্ণ জীবনমুখী পদক্ষেপ নেওয়ার আগে মহান আল্লাহর কাছে সিদ্ধান্ত বা দিকনির্দেশনা চাওয়ার বিশেষ পদ্ধতি শেখানো হয়েছে। একেই বলা হয় 'ইস্তিখারা'।
অনেকেই মনে করেন ইস্তিখারা কেবল বিশেষ কোনো বুজুর্গ বা আলেমের মাধ্যমে করাতে হয়, যা সম্পূর্ণ একটি ভুল ধারণা। ইস্তিখারা মূলত একটি ব্যক্তিগত সুন্নাহ ইবাদত, যা যেকোনো সাধারণ মুসলিম নিজের প্রয়োজনে নিজেই আদায় করতে পারেন। এই নিবন্ধে আমরা বিয়ের জন্য ইস্তিখারার নামাজ পড়ার বিশুদ্ধ পদ্ধতি, এর বিশেষ দোয়া, বাংলা অর্থ এবং এ সংক্রান্ত বিভিন্ন ভুল ধারণা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।
ইস্তিখারা কী এবং এর গুরুত্ব
ইস্তিখারা (استخارة) শব্দের শাব্দিক অর্থ হলো কোনো বিষয়ে মহান আল্লাহর কাছে কল্যাণ বা উত্তমটি প্রার্থনা করা। পরিভাষায়, কোনো বৈধ কাজের দুটি দিকের মধ্যে কোনটি নিজের জন্য বেশি কল্যাণকর হবে, তা জানতে দুই রাকাত নফল নামাজ ও বিশেষ দোয়ার মাধ্যমে আল্লাহর ওপর সম্পূর্ণ ভরসা করে সাহায্য চাওয়াকে ইস্তিখারা বলা হয়।
রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁর সাহাবিদেরকে সব গুরুত্বপূর্ণ কাজে ইস্তিখারা করার শিক্ষা দিতেন। জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) আমাদের সব কাজে ইস্তিখারা করার শিক্ষা দিতেন, যেভাবে তিনি আমাদের কুরআনের সূরা শিক্ষা দিতেন। এটি থেকে বোঝা যায়, পারিবারিক জীবনে এর গুরুত্ব কতটা অপরিসীম।
ইস্তিখারার নামাজের পূর্বশর্ত ও প্রস্তুতি
ইস্তিখারার নামাজ আদায়ের পূর্বে সাধারণ নামাজের মতোই কিছু প্রস্তুতি সম্পন্ন করতে হবে:
- **শারীরিক পবিত্রতা:** উত্তমরূপে ওজু করে পবিত্রতা অর্জন করতে হবে।
- **সঠিক সময় নির্বাচন:** শরিয়ত নির্ধারিত নামাজের নিষিদ্ধ বা মাকরুহ সময় (যেমন: সূর্যোদয়, সূর্যাস্ত ও ঠিক দ্বিপ্রহর) ব্যতীত যেকোনো সময় এই নামাজ পড়া যাবে। তবে রাতের শেষ তৃতীয়াংশ বা তাহাজ্জুদের সময় দোয়া কবুলের জন্য সবচেয়ে উত্তম।
- **মানসিক স্থিরতা:** কোনো একটি পক্ষের প্রতি তীব্র পক্ষপাতিত্ব না রেখে, মনকে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ রেখে আল্লাহর সিদ্ধান্তের ওপর ছেড়ে দেওয়ার মানসিকতা তৈরি করতে হবে।
ধাপে ধাপে বিয়ের ইস্তিখারা নামাজ পড়ার নিয়ম
ইস্তিখারার নামাজ ও দোয়া সম্পন্ন করার জন্য নিচে বর্ণিত ধারাবাহিক ধাপগুলো অনুসরণ করুন:
১. নামাজের নিয়ত করা
মনে মনে নিয়ত করুন যে, আপনি বিয়ের বিষয়ে আল্লাহর কাছে সঠিক সিদ্ধান্তের উদ্দেশ্যে দুই রাকাত ইস্তিখারার নফল নামাজ আদায় করছেন। মুখে উচ্চারণ করে নিয়ত বলা জরুরি নয়, মনের সংকল্পই যথেষ্ট।
২. দুই রাকাত নফল নামাজ আদায় করা
সাধারণ নফল নামাজের মতোই দুই রাকাত সালাত আদায় করুন। প্রথম রাকাতে সূরা ফাতিহার পর যেকোনো সূরা (যেমন সূরা আল-কাফিরুন) এবং দ্বিতীয় রাকাতে সূরা ফাতিহার পর অন্য যেকোনো একটি সূরা (যেমন সূরা আল-ইখলাস) পাঠ করা মুস্তাহাব।
৩. নামাজ শেষে আল্লাহর প্রশংসা ও দরূদ পাঠ
নামাজের সালাম ফেরানোর পর অত্যন্ত বিনম্রতার সাথে বসুন। এরপর প্রথমে মহান আল্লাহর গুণকীর্তন ও হামদ-সানা পাঠ করুন। অতঃপর রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর প্রতি দরূদ শরিফ (সালাতে পঠিত দরূদে ইব্রাহীম) পাঠ করুন।
৪. ইস্তিখারার মূল দোয়া পাঠ
আল্লাহর প্রশংসা ও দরূদ পাঠের পর হাদিসে বর্ণিত মূল ইস্তিখারার দোয়াটি গভীর মনোযোগের সাথে পাঠ করুন:
উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা ইন্নি আস্তাখিরুকা বি'ইলমিকা, ওয়া আস্তাক্বদিরুকা বিক্বুদরাতিকা, ওয়া আস্আলুকা মিন ফাদলিকাল আজিম। ফাইন্নাকা তাক্বদিরু ওয়ালা আক্বদিরু, ওয়া তা'লামু ওয়ালা আ'লামু, ওয়া আন্তা আল্লামুল গুয়ুব। আল্লাহুম্মা ইন কুন্তা তা'লামু আন্না হাজাল আমরা [এখানে পাত্র বা পাত্রীর নাম ও বিয়ের বিষয়টি মনে মনে নির্দিষ্ট করবেন] খাইরুল লি ফী দীনি ওয়া মা'আশী ওয়া আ'কিবাতি আমরী, ফাক্বদুরহু লী ওয়া ইয়াসসিরহু লী, ছুম্মা বারিক লি ফীহি। ওয়া ইন কুন্তা তা'লামু আন্না হাজাল আমরা শাররুল লি ফী দীনি ওয়া মা'আশী ওয়া আ'কিবাতি আমরী, ফাসরিফহু আন্নি ওয়াসরিফনি আনহু, ওয়াক্বদুর লিয়াল খাইরা হাইছু কানা, ছুম্মা আরদিনি বিহি।
অনুবাদ: হে আল্লাহ! আমি তোমার জ্ঞানের মাধ্যমে তোমার কাছে কল্যাণ প্রার্থনা করছি এবং তোমার কুদরতের মাধ্যমে শক্তি কামনা করছি। আর তোমার মহান অনুগ্রহের প্রার্থনা করছি। কেননা তুমিই ক্ষমতাবান, আমি অক্ষম। তুমিই সর্বজ্ঞ, আমি অজ্ঞ এবং তুমিই অদৃশ্যের পরিজ্ঞাতা। হে আল্লাহ! তুমি যদি জানো যে এই কাজটি (অর্থাৎ অমুকের সাথে আমার বিয়ে) আমার দ্বীন, আমার জীবন ও আমার কর্মের পরিণামের দিক দিয়ে কল্যাণকর, তবে তা আমার জন্য নির্ধারিত করে দাও এবং তা আমার জন্য সহজ করে দাও। অতঃপর তাতে আমার জন্য বরকত দাও। আর যদি তুমি জানো যে, এই কাজটি আমার দ্বীন, জীবন ও কর্মের পরিণামে ক্ষতিকর, তবে তা আমার থেকে ফিরিয়ে নাও এবং আমাকেও তা থেকে ফিরিয়ে রাখো। আর আমার জন্য কল্যাণ নির্ধারণ করো যেখানেই তা থাকুক না কেন, অতঃপর তাতেই আমাকে সন্তুষ্ট করে দাও।
এই বিশুদ্ধ দোয়াটি সহীহ বুখারী, হাদিস ৬৩৮২-এ বর্ণিত হয়েছে। দোয়ার মধ্যে 'হাজাল আমরা' (هَذَا الْأَمْرَ) বলার সময় মনে মনে বা মুখে নিজের নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যের (বিয়ের বিষয়টি) কথা উল্লেখ করতে হবে।
ইস্তিখারা সম্পর্কিত সাধারণ ভুল ধারণা ও সংশোধন
আমাদের সমাজে ইস্তিখারা নিয়ে কিছু অমূলক ও ভিত্তিহীন ধারণা প্রচলিত রয়েছে, যা শরিয়তের সাথে সাংঘর্ষিক:
- **স্বপ্নের ওপর অতি-নির্ভরতা:** অনেকে মনে করেন ইস্তিখারা করার পর ঘুমালে স্বপ্নে সবুজ বা সাদা রঙ দেখলে ভালো, আর কালো বা লাল রঙ দেখলে খারাপ—এমন কোনো কথা হাদিসে আসেনি। ইস্তিখারার মূল ফলাফল হলো দোয়ার পর মনের ঝোঁক বা কোনো একদিকে কাজ সহজ হয়ে যাওয়া।
- **একবার করেই ক্ষান্ত হওয়া:** কোনো বিষয়ে দ্রুত মানসিক সিদ্ধান্ত বা পরিবেশ অনুকূলে না আসলে ইস্তিখারা একাধিক দিন (যেমন ৩ বা ৭ দিন) নিয়মিত করা যেতে পারে।
- **পরামর্শ না করা:** অনেকে মনে করেন ইস্তিখারা করলে বুঝি মানুষের সাথে পরামর্শ করতে হয় না। অথচ ইসলামে ইস্তিখারার পাশাপাশি অভিজ্ঞ ও হিতাকাঙ্ক্ষীদের সাথে পরামর্শ (শূরা) করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ একটি সুন্নাহ।
রেফারেন্স
হাদিস শরিফ
- সহীহ বুখারী, হাদিস ৬৩৮২ (অধ্যায়: দোয়া, অনুচ্ছেদ: সব কাজে ইস্তিখারা করা) — জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ (রা.) থেকে বর্ণিত মূল ইস্তিখারার দীর্ঘ হাদিস ও দোয়া।
- সূنان আত-তিরমিযী, হাদিস ৪৮০ — ইস্তিখারা ও আল্লাহর ওপর ভরসা করার গুরুত্ব।

