সন্তানের বিয়ে ও উপযুক্ত জীবনসঙ্গী নির্বাচন প্রতিটি পিতা-মাতার জীবনের অন্যতম বড় দায়িত্ব। একটি সুখী, শান্তিময় এবং দ্বীনদার দাম্পত্য জীবন গঠনে পিতা-মাতার দুআ আল্লাহর দরবারে অত্যন্ত দ্রুত কবুল হয়। ইসলামে সন্তানের জন্য পিতা-মাতার দুআকে বিশেষ মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। বিয়ের সিদ্ধান্ত গ্রহণ, উপযুক্ত পাত্র-পাত্রী নির্বাচন এবং তাদের মনকে দ্বীনের পথে পরিচালিত করতে পবিত্র কুরআন ও হাদীসে কিছু গুরুত্বপূর্ণ দুআ এবং আমল বর্ণিত হয়েছে।
সন্তানের বিয়ের ক্ষেত্রে পিতা-মাতার দুআর গুরুত্ব
পিতা-মাতার মন থেকে সন্তানের জন্য যে দুআ বের হয়, তা আল্লাহর আরশ পর্যন্ত পৌঁছে যায়। হযরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “তিনটি দুআ নিঃসন্দেহে কবুল হয়— মজলুমের দুআ, মুসাফিরের দুআ এবং সন্তানের জন্য পিতা-মাতার দুআ।” (جامع الترمذي, হাদিস: ১৯০৫; ইমাম তিরমিযী এটিকে হাসান বলেছেন)। বিয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আল্লাহর ওপর পূর্ণ ভরসা রেখে নিয়মিত দুআ করলে আল্লাহ তাআলা সমস্ত জটিলতা দূর করে দেন এবং উভয় পক্ষের হৃদয়কে অনুকূল করে দেন।
হৃদয়কে আল্লাহর অভিমুখী করা ও উত্তম জীবনসঙ্গী লাভের ৩টি সহীহ দুআ
সন্তানের বিয়ের উত্তম ব্যবস্থা এবং তাদের অন্তরকে সৎ পথে পরিচালনার জন্য বাবা-মা নিচে বর্ণিত সহীহ দুআগুলো নিয়মিত পাঠ করতে পারেন:
১. পরিবারে শান্তি ও চোখের শীতলতা লাভের কুরআনিক দুআ
পবিত্র কুরআনের এই দুআটি নিজের স্ত্রী ও ভবিষ্যৎ বংশধরদের নেককার এবং চোখের শীতলতাস্বরূপ পাওয়ার জন্য একটি সর্বশ্রেষ্ঠ প্রার্থনা।
উচ্চারণ: রাব্বানা হাবলানা মিন আজওয়াজিনা ওয়া জুররিয়্যাতিনা কুররাতা আ’ইউনিউ ওয়াজ’আলনা লিলমুত্তাকীনা ইমামা।
অনুবাদ: “হে আমাদের রব! আমাদের জন্য আমাদের স্ত্রী ও সন্তানদের পক্ষ থেকে চোখের শীতলতা দান করুন এবং আমাদের মুত্তাকীদের জন্য ইমাম বানিয়ে দিন।” (সূরা আল-ফুরকান, আয়াত: ৭৪)।
২. দুনিয়া ও আখিরাতের সর্বাঙ্গীণ কল্যাণ (হাসানা) লাভের দুআ
সন্তানের জন্য একটি ভালো ও দ্বীনদার পরিবারে বিয়ের ব্যবস্থা হওয়া মূলত দুনিয়ার একটি বড় কল্যাণ (হাসানা)। এই দুআটির মাধ্যমে আল্লাহ দুনিয়া ও আখিরাত উভয় জীবনের মঙ্গল দান করেন।
উচ্চারণ: রাব্বানা আতিনা ফিদ্দুনিয়া হাসানাতাও ওয়া ফিল আখিরাতি হাসানাতাও ওয়া কিনা আযাবান্নার।
অনুবাদ: “হে আমাদের রব! আমাদের দুনিয়াতেও কল্যাণ দিন এবং আখিরাতেও কল্যাণ দিন এবং আমাদের জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করুন।” (সূরা আল-বাকারাহ, আয়াত: ২০১)।
৩. পারস্পরিক ভালোবাসা ও মহব্বত বৃদ্ধির নববী দুআ
রাসূলুল্লাহ (সা.) এই দুআটির মাধ্যমে আল্লাহর ভালোবাসা এবং আল্লাহর প্রিয় বান্দাদের ভালোবাসা প্রার্থনা করতেন। সন্তানের হবু শ্বশুরবাড়ির লোকজনের অন্তরে মহব্বত সৃষ্টির উদ্দেশ্যে এটি পাঠ করা যায়।
উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা ইন্নি আসআলুকা হুব্বাকা ওয়া হুব্বা মাই ইয়ুহিব্বুকা ওয়া হুব্বা আমালিন ইউবাল্লিগুনি হুব্বাকা।
অনুবাদ: “হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে আপনার ভালোবাসা চাই, এবং যে ব্যক্তি আপনাকে ভালোবাসে তার ভালোবাসা চাই, আর এমন আমলের তাওফীক চাই যা আমাকে আপনার ভালোবাসার কাছাকাছি পৌঁছে দেয়।” (جامع الترمذي, হাদিস: ৩৪৯০; ইমাম তিরমিযী এটিকে হাসান সহীহ বলেছেন)।
বিয়ের সিদ্ধান্ত গ্রহণে বাবা-মায়ের জন্য শরিয়তসম্মত গাইডলাইন
কেবল মুখে দুআ করাই যথেষ্ট নয়, বরং দুআর পাশাপাশি সুন্নাহসম্মত কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করা আবশ্যক:
- দ্বীনদারিতাকে অগ্রাধিকার দেওয়া: পাত্র বা পাত্রী নির্বাচনের ক্ষেত্রে বংশমর্যাদা বা ধনসম্পদের চেয়ে তার দ্বীনদারিতা ও চরিত্রকে সবচেয়ে বেশি প্রধান্য দিতে হবে (সহীহ বুখারী, হাদিস: ৫০৯০)।
- সালাতুল ইস্তিখারা করা: বিয়ের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সন্তানের পক্ষ থেকে কিংবা পিতা-মাতা নিজে দুই রাকাত নফল সালাত আদায় করে সুন্নাহসম্মত ‘ইস্তিখারার দুআ’র মাধ্যমে আল্লাহর কাছে কল্যাণ-অকল্যাণের ফয়সালা চাইবেন (সহীহ বুখারী, হাদিস: ১১৬৬)।
- জোরপূর্বক বিয়ে না দেওয়া: পাত্র-পাত্রীর স্পষ্ট মতামত বা সম্মতি ছাড়া জোর করে বিয়ে দেওয়া ইসলামের বিধান অনুযায়ী সম্পূর্ণ অনুচিত ও নিষিদ্ধ।
- সহজ ও অনাড়ম্বর বিয়ের আয়োজন: ইসলামে সেই বিয়েকে সবচেয়ে বেশি বরকতময় বলা হয়েছে, যা অত্যন্ত সহজ ও কম খরচে সম্পন্ন হয়। লোকদেখানো অপচয় ও কুসংস্কার থেকে বিবাহকে মুক্ত রাখা পিতা-মাতার অন্যতম দায়িত্ব।
ভুল ধারণা ও কুসংস্কার থেকে সতর্কতা
আমাদের সমাজে সন্তানের বিয়েতে বিলম্ব হলে বা বাধা আসলে অনেকে জ্যোতিষী, গণক কিংবা বিভিন্ন অবৈধ তাবীজ-কবজের দ্বারস্থ হন, যা ঈমান ধ্বংসকারী ও শিরকের অন্তর্ভুক্ত। একইভাবে নির্দিষ্ট কোনো সূরাকে মনগড়া নিয়মে যেমন— শতবার বা হাজারবার পড়ার কোনো সহীহ ভিত্তি নেই। যেকোনো সংকট দূর করতে পাঁচ ওয়াক্ত সালাত পাবন্দির সাথে আদায় করা, বেশি বেশি ইস্তিগফার (ক্ষমা প্রার্থনা) করা এবং আল্লাহর ওপর পূর্ণ তাওয়াক্কুল (ভরসা) রাখাই ইসলামের একমাত্র শিক্ষা।
রেফারেন্স (References)
কুরআনের আয়াত (Quranic Ayahs)
- সূরা আল-বাকারাহ, ২:২০১ — দুনিয়া ও আখিরাতের সর্বোত্তম কল্যাণ বা হাসানা লাভের প্রার্থনা।
- সূরা আল-ফুরকান, ২৫:৭৪ — নেককার পরিবার ও চোখের শীতলতাস্বরূপ বংশধর লাভের কুরআনিক দুআ।
হাদিস (Hadith)
- جامع الترمذي, হাদিস: ১৯০৫ (তাহকীক: হাসান) — সন্তানের জন্য পিতা-মাতার দুআ কবুল হওয়ার অকাট্য দলিল।
- جامع الترمذي, হাদিস: ৩৪৯০ (তাহকীক: হাসান সহীহ) — আল্লাহর ভালোবাসা ও নেক বান্দাদের মহব্বত অর্জনের দুআ।
- সহীহ বুখারী, হাদিস: ১১৬৬ — গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের পূর্বে সালাতুল ইস্তিখারা আদায়ের নিয়ম ও দুআ।
- সহীহ বুখারী, হাদিস: ৫০৯০ — বিয়েতে পাত্র-পাত্রীর দ্বীনদারিতা ও চরিত্রকে অগ্রাধিকার দেওয়ার নির্দেশ।

