উমরাহ হলো মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার নৈকট্য ও সন্তুষ্টি অর্জনের এক অনন্য আত্মিক সফর। বছরের যেকোনো সময় পবিত্র কাবা জিয়ারতের মাধ্যমে এই ইবাদত সম্পন্ন করা যায়। উমরার আধ্যাত্মিক সৌন্দর্য ও গ্রহণযোগ্যতা নিশ্চিত করতে প্রতিটি রোকন বা ধাপ রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর শেখানো সুন্নাহ মোতাবেক সম্পন্ন করা আবশ্যক। এই নির্দেশিকায় মিকাত থেকে ইহরাম বাঁধা, কাবা শরিফ তাওয়াফ, সাফা ও মারওয়া পাহাড়ে সাঈ করা থেকে শুরু করে মক্কা ত্যাগের পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত প্রতিটি ধাপের ধারাবাহিক আমল এবং সহিহ হাদিস দ্বারা প্রমাণিত দোয়াসমূহ আরবী, উচ্চারণ ও অর্থসহ বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।
১. ইহরামের প্রস্তুতি, নিয়ত ও তালবিয়া
উমরার প্রথম মৌলিক রোকন হলো মিকাত (শরিয়ত নির্ধারিত স্থান) অথবা তার পূর্ব থেকে ইহরামের কাপড় পরিধান করা এবং উমরার সুনির্দিষ্ট নিয়ত করা। ইহরামের পূর্বে নখ কাটা, গোসল বা ওজু করে নেওয়া সুন্নাত। পুরুষরা সেলাইবিহীন দুটি সাদা চাদর পরিধান করবেন এবং নারীরা শালীন সাধারণ পোশাক পরবেন।
উমরার নিয়ত
ইহরামের কাপড় পরে উমরার উদ্দেশ্যে মনে মনে সংকল্প করার পাশাপাশি মুখে নিম্নোক্ত বাক্যটি উচ্চারণ করা সুন্নাত:
উচ্চারণ: লাব্বাইকা আল্লাহুম্মা উমরাতান।
অনুবাদ: হে আল্লাহ! আমি উমরার উদ্দেশ্যে আপনার দরবারে হাজির হলাম। (সহীহ বুখারী, হাদিস ১৫৫১)
তালবিয়া পাঠ
নিয়ত করার পরপরই উচ্চস্বরে (নারীরা নিচু স্বরে) তালবিয়া পাঠ শুরু করতে হবে। মক্কায় পৌঁছে তাওয়াফ শুরু করার পূর্ব পর্যন্ত পথিমধ্যে ও জিয়ারতের বিভিন্ন অবস্থায় বেশি বেশি তালবিয়া পড়া সুন্নাত।
উচ্চারণ: লাব্বাইকা আল্লাহুম্মা লাব্বাইক, লাব্বাইকা লা শারিকা লাকা লাব্বাইক, ইন্নাল হামদা ওয়ান নি’মাতা লাকা ওয়াল মুলকা, লা শারিকা লাক।
অনুবাদ: আমি হাজির, হে আল্লাহ! আমি হাজির। আপনার কোনো শরিক নেই, আমি হাজির। নিশ্চয়ই সমস্ত প্রশংসা, নিয়ামত এবং রাজত্ব একমাত্র আপনারই, আপনার কোনো অংশীদার নেই। (সহীহ মুসলিম, হাদিস ১১৮৪)
২. কাবা শরিফ তাওয়াফের নিয়ম ও দোয়াসমূহ
মক্কায় পৌঁছে পবিত্র মসজিদুল হারামে প্রবেশ করার পর উমরার দ্বিতীয় রোকন অর্থাৎ তাওয়াফ শুরু করতে হয়। তাওয়াফ হলো কাবা ঘরকে বামে রেখে সাতবার চক্কর দেওয়া। তাওয়াফ শুরুর পূর্বে পুরুষদের জন্য 'ইজতিবা' করা অর্থাৎ ইহরামের চাদরের ডান প্রান্তটি ডান বগলের নিচ দিয়ে এনে বাম কাঁধের ওপর ফেলে রাখা সুন্নাত।
হাজরে আসওয়াদ অভিমুখী তাকবির
তাওয়াফ শুরু করতে হয় হাজরে আসওয়াদের কোণ থেকে। সেখানে দাঁড়িয়ে হাজরে আসওয়াদের দিকে হাত তুলে ইশারা (ইস্তিলাম) করার সময় বলতে হয়:
উচ্চারণ: বিসমিল্লাহি ওয়াল্লাহু আকবার।
অনুবাদ: আল্লাহর নামে শুরু করছি এবং আল্লাহ সবচেয়ে মহান। (সুনানে তিরমিজি, হাদিস ৮৫৪)
তাওয়াফকালীন মাসনুন দোয়া
তাওয়াফের নির্দিষ্ট চক্করগুলোর জন্য আলাদা কোনো দোয়া সুন্নাহ দ্বারা প্রমাণিত নয়। তবে প্রতিটি চক্করের সময় রুকনে ইয়ামানি (হাজরে আসওয়াদের পূর্বের কোণ) থেকে হাজরে আসওয়াদের মধ্যবর্তী স্থানে পৌঁছালে আল্লাহর রাসুল (সা.) পবিত্র কুরআনের এই দোয়াটি পাঠ করতেন:
উচ্চারণ: রাব্বানা আতিনা ফিদ দুনিয়া হাসানাতাও ওয়া ফিল আখিরাতি হাসানাতাও ওয়া কিনা আজাবান নার।
অনুবাদ: হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের দুনিয়াতে কল্যাণ দান করুন এবং আখিরাতেও কল্যাণ দান করুন আর আমাদের জাহান্নামের আজাব থেকে রক্ষা করুন। (সূরা আল-বাকারাহ, আয়াত ২০১; সুনানে আবু দাউদ, হাদিস ১৮৯২)
৩. মাকামে ইবরাহিমে নামাজ ও জমজমের পানি পান
সাত চক্কর পূর্ণ হওয়ার পর ইজতিবা শেষ করে ডান কাঁধ চাদর দিয়ে ঢেকে নিতে হবে। অতঃপর মাকামে ইবরাহিমের পিছনে (জায়গা না পেলে মসজিদের যেকোনো স্থানে) দুই রাকাত ওয়াজিবুত তাওয়াফ নামাজ আদায় করা সুন্নাত। নামাজের পর এই দোয়াটি পড়া যেতে পারে, যা ইব্রাহিম (আ.) কাবা ঘর নির্মাণের সময় পড়েছিলেন:
উচ্চারণ: রাব্বানা তাকাব্বাল মিন্না, ইন্নাকা আনতাস সামিউল আলিম।
অনুবাদ: হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের পক্ষ থেকে এটি কবুল করুন; নিশ্চয় আপনি সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ। (সূরা আল-বাকারাহ, আয়াত ১২৭)। নামাজ শেষে মনভরে জমজমের পানি পান করা এবং নিজের জন্য দোয়া করা মুস্তাহাব।
৪. সাফা ও মারওয়া পাহাড়ের মধ্যবর্তী সাঈ
উমরার তৃতীয় রোকন হলো সাফা ও মারওয়া পাহাড়ের মাঝে সাতবার সাঈ করা বা যাতায়াত করা। সাফা পাহাড় থেকে শুরু করে মারওয়া পাহাড়ে পৌঁছালে এক চক্কর এবং মারওয়া থেকে সাফায় ফিরে এলে দ্বিতীয় চক্কর গণ্য হয়। এভাবে সাফা থেকে শুরু হয়ে মারওয়ায় গিয়ে সাত নম্বর চক্কর শেষ হবে।
সাঈ শুরুর প্রারম্ভিক দোয়া
সাঈ শুরু করার উদ্দেশ্যে সাফা পাহাড়ের কাছাকাছি পৌঁছালে পবিত্র কুরআনের এই আয়াতটি পাঠ করা সুন্নাত:
উচ্চারণ: ইন্নাস সাফা ওয়াল মারওয়াতা মিন শা‘আইরিল্লাহ...
অনুবাদ: নিশ্চয়ই সাফা ও মারওয়া আল্লাহর নিদর্শনসমূহের অন্তর্ভুক্ত। সুতরাং যে ব্যক্তি বাইতুল্লাহর হজ বা উমরা করে, তার জন্য এ দুটির মাঝে সাঈ করা কোনো পাপ নয়...। (সূরা আল-বাকারাহ, আয়াত ১৫৮)
আয়াতটি পড়ার পর রাসুল (সা.) বলতেন, "আল্লাহ যা দিয়ে শুরু করেছেন, আমিও তা দিয়ে শুরু করছি"। অতঃপর সাফা পাহাড়ে আরোহণ করে কাবার দিকে মুখ করে হাত তুলে আল্লাহর হামদ ও তাকবির (আল্লাহু আকবার) পাঠ করে নিজের ইচ্ছামতো দীর্ঘ সময় দোয়া করবেন। সাঈর দুই সবুজ বাতির মধ্যবর্তী স্থানে পুরুষদের জন্য কিছুটা দ্রুত দৌড়ানো সুন্নাত, তবে নারীরা স্বাভাবিক গতিতেই হাঁটবেন।
৫. হলক বা তাকসির (মাথা মুন্ডন বা চুল ছাঁটা)
সাতটি চক্কর পূর্ণ করার পর উমরার সর্বশেষ ওয়াজিব আমল হলো মাথা মুন্ডন করা (হলক) অথবা পুরো মাথার চুল সমানভাবে ছোট করা (তাকসির)। পুরুষদের জন্য সম্পূর্ণ মাথা মুন্ডন করা অধিক উত্তম। নারীদের জন্য মাথার সমস্ত চুলের অগ্রভাগ থেকে এক আঙুল বা এক ইঞ্চি পরিমাণ কেটে নেওয়া ওয়াজিব। এই আমলটি সম্পন্ন করার সময় নির্দিষ্ট কোনো দোয়া হাদিসে আসেনি, তবে চুল কাটার সময় আল্লাহু আকবার বলা এবং আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করা সুন্নাতসম্মত। মাথা মুন্ডন বা চুল ছাঁটার পর ইহরামের সমস্ত নিষেধাজ্ঞা উঠে যায় এবং উমরাহ পরিপূর্ণ হয়।
৬. বিদায়ী তাওয়াফের বিধান
উমরার মূল রোকনগুলো শেষ হওয়ার পর মক্কায় অবস্থানকালে বেশি বেশি নফল তাওয়াф ও ইবাদত করা উচিত। উমরাহ পালনকারী যখন মক্কা ত্যাগ করে নিজ দেশে বা মদিনার উদ্দেশ্যে রওনা হবেন, তখন বিদায়ী তাওয়াফ (তাওয়াফুল বিদা) করা সুন্নাত। হজের ক্ষেত্রে এটি ওয়াজিব হলেও উমরার ক্ষেত্রে এটি সুন্নাত ও মুস্তাহাব আমল হিসেবে গণ্য হয়। বিদায়ী তাওয়াফের পর কাবার দিকে তাকিয়ে অশ্রুসজল নয়নে আল্লাহর কাছে বারবার এই পবিত্র ভূমিতে ফিরে আসার এবং গুনাহ মাফের আকুতি জানানো উচিত। তবে মক্কা ত্যাগের পূর্বে রাসুল (সা.) থেকে নির্দিষ্ট কোনো আরবী দোয়া বর্ণিত হয়নি, বরং যেকোনো কল্যাণকর দোয়া করা যায়।
উমরা পালনকালে সাধারণ ভুলত্রুটিসমূহ
- নির্দিষ্ট বানোয়াট দোয়া পড়া: তাওয়াф ও সাঈর প্রতি চক্করের জন্য বাজারে প্রচলিত চটি বইয়ের মনগড়া দোয়া পাঠ করা সুন্নাহ পরিপন্থী। রাসুল (সা.) থেকে প্রমাণিত দোয়ার বাইরে যেকোনো বৈধ দোয়া করা যায়।
- সবুজ বাতির মাঝে নারীদের দৌড়ানো: সাঈ করার সময় দুই সবুজ বাতির মাঝের অংশে কেবল পুরুষদের দ্রুত চলার নির্দেশ রয়েছে, নারীদের জন্য নয়।
- তাড়াহুড়ো করা: তাওয়াф বা সাঈর সময় অন্যকে धक्का দেওয়া বা দ্রুত শেষ করার মানসিকতা বর্জন করে ধীরস্থিরভাবে ইবাদত করা উচিত।
রেফারেন্স
কুরআনের আয়াত
- সূরা আল-বাকারাহ, ২:১২৭ — কাবা ঘর নির্মাণের সময় ইব্রাহিম (আ.)-এর দোয়া।
- সূরা আল-বাকারাহ, ২:১৫৮ — সাফা ও মারওয়া পাহাড়ের সাঈর নির্দেশনা।
- সূরা আল-বাকারাহ, ২:২০১ — তাওয়াফের সময় পঠিত দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণের দোয়া।
হাদিস
- সহীহ বুখারী, হাদিস ১৫৫১ — উমরার সুনির্দিষ্ট নিয়তের বিবরণ।
- সহীহ মুসলিম, হাদিস ১১৮৪ — ইহরামের পর রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর পঠিত তালবিয়া।
- সুনানে তিরমিজি, হাদিস ৮৫৪ — হাজরে আসওয়াদ ইস্তিলামের সময় তাকবির।
- সুনানে আবু দাউদ, হাদিস ১৮৯২ — রুকনে ইয়ামানি ও হাজরে আসওয়াদের মধ্যবর্তী মাসনুন দোয়া।

