হজ ও উমরাহ হলো ইসলামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত, যা আত্মিক পরিশুদ্ধি এবং আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের এক অনন্য মাধ্যম। এই পবিত্র সফরে মক্কা ও মদিনার বিভিন্ন স্থানে দোয়া কবুলের বিশেষ মুহূর্ত ও স্থান রয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) হজের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ রোকন বা ধাপের জন্য উম্মতকে বিশেষ কিছু দোয়া ও জিকির শিখিয়েছেন। এই নিবন্ধে কুরআন ও সহিহ সুন্নাহ থেকে প্রমাণিত হজ ও উমরার প্রধান দোয়াগুলো আরবী, বাংলা উচ্চারণ ও অর্থসহ বিস্তারিত আলোচনা করা হলো, যা আপনার সফরকে আরও বরকতময় করতে সাহায্য করবে।
হজ ও উমরায় দোয়ার গুরুত্ব ও কবুলিয়তের শর্ত
পবিত্র হজের পুরো সময়টাই মূলত জিকির ও দোয়ার আমেজ। মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা আমাদের নির্দেশ দিয়ে বলেছেন, “তোমরা আমাকে ডাকো, আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দেব।” (সূরা গাফির, আয়াত ৬০)। তবে দোয়া কবুল হওয়ার জন্য কিছু মৌলিক শর্ত রয়েছে, যেমন—উপার্জন হালাল হওয়া, অন্তরে ইখলাস বা খাঁটি নিয়ত থাকা এবং দোয়ার সময় তাড়াহুড়ো না করা।
রাসূলুল্লাহ (সা.) হজের বিভিন্ন স্থানে নিজে দীর্ঘ সময় ধরে হাত তুলে দোয়া করেছেন এবং সাহাবিদেরকে বেশি বেশি প্রার্থনা করার তাগিদ দিয়েছেন। হজের সফরে বান্দা আল্লাহর মেহমান হিসেবে উপস্থিত হয়, তাই এ সময় চাওয়া প্রতিটি নেক দোয়া কবুল হওয়ার সম্ভাবনা অত্যন্ত প্রবল থাকে।
হজ ও উমরার গুরুত্বপূর্ণ মাসনুন দোয়াসমূহ
১. তালবিয়াহ (Talbiyah)
ইহরাম বাঁধার পর থেকে হজের মূল আমল শুরু হওয়া পর্যন্ত (উমরার ক্ষেত্রে তাওয়াফ শুরুর পূর্ব পর্যন্ত এবং হজের ক্ষেত্রে ১০ই জিলহজ জামারায় কঙ্কর নিক্ষেপ পর্যন্ত) পুরুষদের জন্য উচ্চস্বরে এবং নারীদের জন্য নিম্নস্বরে এই তালবিয়াহ পাঠ করা সুন্নাত।
উচ্চারণ: লাব্বাইকা আল্লাহুম্মা লাব্বাইক, লাব্বাইকা লা শারিকা লাকা লাব্বাইক, ইন্নাল হামদা ওয়ান নি’মাতা লাকা ওয়াল মুলক, লা শারিকা লাক।
অনুবাদ: হে আল্লাহ! আমি আপনার ডাকে সাড়া দিয়ে হাজির হয়েছি। আপনার কোনো শরিক নেই, আমি আবার হাজির হয়েছি। নিশ্চয়ই সমস্ত প্রশংসা, নিয়ামত এবং রাজত্ব একমাত্র আপনারই, আপনার কোনো অংশীদার নেই। (সহীহ বুখারী, হাদিস ১৫check৪৯)
২. প্রথমবার কাবা শরীফ দেখার সময়
কাবা ঘরের ওপর প্রথম দৃষ্টি পড়ার সময় দোয়া কবুল হয় বলে বর্ণিত রয়েছে। এ সময় আল্লাহর প্রশংসা ও দরুদ পাঠের পর নিজের ইচ্ছামতো দ্বীন ও দুনিয়ার কল্যাণের জন্য দোয়া করা উচিত। সাহাবি হযরত উমর (রা.) থেকে এই ক্ষেত্রে একটি দোয়া বর্ণিত আছে:
উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা আন্তাস সালামু ওয়া মিনকাস সালামু, ফাহাইয়্যিনা রাব্বানা বিস সালাম।
অনুবাদ: হে আল্লাহ! আপনিই শান্তি এবং আপনার পক্ষ থেকেই শান্তি অবতীর্ণ হয়। হে আমাদের রব! আমাদের শান্তির সাথে বাঁচিয়ে রাখুন। (মুসান্নাফ ইবনে আবি শাইবা, হাদিস ৮৫৭৬; ইমাম বায়হাকির সুনানে কুবরায় এটি বর্ণিত হয়েছে)
৩. তাওয়াফের সময় রুকনে ইয়ামানি ও হাজরে আসওয়াদের মধ্যবর্তী দোয়া
তাওয়াফ করার সময় নির্দিষ্ট কোনো ধরাবাঁধা দোয়া নেই। তবে প্রতিটি চক্করে রুকনে ইয়ামানি থেকে হাজরে আসওয়াদের দিকে যাওয়ার সময় আল্লাহর রাসূল (সা.) পবিত্র কুরআনের এই বিখ্যাত আয়াতটি পাঠ করতেন:
উচ্চারণ: রাব্বানা আতিনা ফিদ দুনিয়া হাসানাহ, ওয়া ফিল আখিরাতি হাসানাহ, ওয়া কিনা আজাবান নার।
অনুবাদ: হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের দুনিয়াতে কল্যাণ দান করুন এবং আখিরাতেও কল্যাণ দান করুন আর আমাদের জাহান্নামের আজাব থেকে রক্ষা করুন। (সূরা আল-বাকারাহ, আয়াত ২০১; সুনানে আবু দাউদ, হাদিস ১৮৯২)
৪. সাফা ও মারওয়া পাহাড়ে সায়ী করার দোয়া
সায়ী শুরু করার সময় সাফা পাহাড়ের কাছাকাছি পৌঁছে রাসূলুল্লাহ (সা.) কুরআনের আয়াত পাঠ করতেন। সাফা পাহাড়ে উঠে কাবার দিকে মুখ করে হাত তুলে তিনবার তাকবির ও তাহলিল পাঠ করে নিজের জন্য দীর্ঘ দোয়া করা সুন্নাত। প্রারম্ভিক আয়াতটি হলো:
উচ্চারণ: ইন্নাস সাফা ওয়াল মারওয়াতা মিন শা‘আইরিল্লাহ...
অনুবাদ: নিশ্চয়ই সাফা ও মারওয়া আল্লাহর নিদর্শনসমূহের অন্তর্ভুক্ত...। (সূরা আল-বাকারাহ, আয়াত ১৫৮)। এরপর পাহাড়ে উঠে রাসুল (সা.) বলতেন: “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা শারিকা লাহু, লাহুল মুলকু ওয়া লাহুল হামদু ওয়া হুয়া আলা কুল্লি শাইয়িন কাদির...।” (সহীহ মুসলিম, হাদিস ১২১৮)।
৫. আরাফার দিনের শ্রেষ্ঠ দোয়া
৯ই জিলহজ আরাফার ময়দানে অবস্থানের সময়টি হজের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রোকন। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “শ্রেষ্ঠ দোয়া হলো আরাফার দিনের দোয়া।” তিনি এবং তাঁর পূর্ববর্তী নবীগণ এ দিন যে জিকিরটি সবচেয়ে বেশি করতেন, তা হলো:
উচ্চারণ: লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা শারিকা লাহু, লাহুল মুলকু ওয়া লাহুল হামদু, ওয়া হুয়া ‘আলা কুল্লি শাইয়িন কাদির।
অনুবাদ: আল্লাহ ছাড়া কোনো সত্য উপাস্য নেই, তিনি একক, তাঁর কোনো শরিক নেই। রাজত্ব ও সমস্ত প্রশংসা একমাত্র তাঁরই এবং তিনি সবকিছুর ওপর পূর্ণ ক্ষমতাবান। (সুনানে তিরমিজি, হাদিস ৩৫৮৫, ইমাম তিরমিজি এটিকে হাসান বলেছেন)
হজ ও উমরার যাত্রীদের জন্য ব্যবহারিক পরামর্শ
পবিত্র সফরে বের হওয়ার আগেই দোয়াগুলো বিশুদ্ধ আরবী উচ্চারণ ও অর্থসহ আয়ত্ত করার চেষ্টা করুন। বাজারে প্রচলিত চটি বইয়ের বানোয়াট বা ভিত্তিহীন দোয়া পরিহার করে সুন্নাহসম্মত জিকির করাই শ্রেয়। তাওয়াফ বা সায়ীর সময় চক্কর গণনায় ভুল এড়াতে ডিজিটাল কাউন্টার ব্যবহার করতে পারেন। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, দোয়ার সময় অন্যের দেখাদেখি বা কৃত্রিমতা পরিহার করে নিজের ভাষায় মনের আকুতি আল্লাহর দরবারে পেশ করা।
রেফারেন্স
কুরআনের আয়াত
- সূরা আল-বাকারাহ, ২:১৫৮ — সাফা ও মারওয়াকে আল্লাহর নিদর্শন ঘোষণা।
- সূরা আল-বাকারাহ, ২:২০১ — দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণের দোয়া।
- সূরা গাফির, ৪০:৬০ — আল্লাহর কাছে দোয়া করার নির্দেশ।
হাদিস শরিফ
- সহীহ বুখারী, হাদিস ১৫৪৯ (অধ্যায়: হজ) — ইহরামের তালবিয়াহর বিবরণ।
- সহীহ মুসলিম, হাদিস ১২১৮ (অধ্যায়: হজ) — রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর হজের বিস্তারিত বিবরণ ও সায়ীর নিয়ম।
- সুনানে আবু دাউদ, হাদিস ১৮৯২ — তাওয়াফকালে রুকনে ইয়ামানি ও হাজরে আসওয়াদের মধ্যবর্তী দোয়া।
- সুনানে তিরমিজি, হাদিস ৩৫৮৫ (অধ্যায়: দোয়া) — আরাফার দিনের বিশেষ জিকিরের ফজিলত।

