পবিত্র কাবা শরিফ তাওয়াফ করার সময় রুকনে ইয়ামানি ও হাজরে আসওয়াদের মধ্যবর্তী অংশটি অত্যন্ত বরকতময় এবং গুরুত্বপূর্ণ। এই বিশেষ স্থানটিতে একটি সুনির্দিষ্ট দোয়া পাঠ করা রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর পবিত্র সুন্নাহ দ্বারা প্রমাণিত। এই দোয়াটি মূলত পবিত্র কুরআনের অত্যন্ত ব্যাপক ও অর্থবহ একটি আয়াত, যার মধ্যে দুনিয়া ও আখেরাতের সমস্ত কল্যাণ নিহিত রয়েছে।
হজ ও উমরাহ পালনকারী প্রতিটি হাজি সাহেবের জন্য এই স্থানের গুরুত্ব এবং মাসনুন দোয়াটি বিশুদ্ধভাবে জানা আবশ্যক। রুকনে ইয়ামানি ও হাজরে আসওয়াদের মাঝে পড়ার দোয়া, এর নিখুঁত আরবি উচ্চারণ, বাংলা অনুবাদ, সঠিক আমল এবং এর ফজিলত সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য দলিলসহ বিস্তারিত নিচে তুলে ধরা হলো।
দোয়ার আরবি, উচ্চারণ ও অনুবাদ
তাওয়াফের সময় রুকনে ইয়ামানি অতিক্রম করে হাজরে আসওয়াদের দিকে অগ্রসর হওয়ার সময় রাসুলুল্লাহ (সা.) এই দোয়াটি পাঠ করতেন। এটি মূলত সূরা আল-বাকারাহ, ২:২০১ নম্বর আয়াত।
উচ্চারণ: রাব্বানা- আ-তিনা- ফিদ্দুন্ইয়া- হাসানাতাও ওয়া ফিল আ-খিরাতি হাসানাতাও ওয়া কিনা- ‘আযা-বান্না-র।
অনুবাদ: হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের দুনিয়াতে কল্যাণ দান করুন এবং আখেরাতেও কল্যাণ দান করুন এবং আমাদেরকে জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করুন।
আমলের সময় ও সঠিক নিয়ম
পবিত্র কাবা শরিফ প্রদক্ষিণের সময় প্রতিটি চক্করেই যখন হাজি সাহেব রুকনে ইয়ামানি কোণটি অতিক্রম করবেন, তখন থেকে শুরু করে হাজরে আসওয়াদ পর্যন্ত পৌঁছানো পর্যন্ত এই অংশটুকুতে অনবরত এই দোয়াটি পাঠ করতে থাকবেন। এটি তাওয়াফের সাতটি চক্করের প্রতিটিতেই আদায় করা সুন্নাত।
এখানে মনে রাখা জরুরি যে, ভুলবশত কিংবা ভিড়ের চাপে এই দোয়াটি পাঠ করতে না পারলে তাওয়াফ বাতিল হয় না, তবে সুন্নাতের সওয়াব থেকে বঞ্চিত হতে হয়। তাই এই অংশে দুনিয়াবি আলাপচারিতা বা ছবি তোলার মতো মনোযোগ বিনষ্টকারী কাজ পরিহার করে অত্যন্ত আকুলতার সাথে জবান সচল রাখা উচিত।
এই দোয়ার আধ্যাত্মিক ফজিলত ও গুরুত্ব
এই দোয়াটিকে ইসলামের পরিভাষায় 'আশ-শামেল' বা সর্বব্যাপী প্রার্থনা বলা হয়। মুমিন বান্দা যখন আল্লাহর কাছে দুনিয়ার 'হাসানাহ' বা কল্যাণ চায়, তখন এর অন্তর্ভুক্ত হয় সুস্থতা, হালাল রিজিক, সৎ সন্তান, নেককার স্ত্রী এবং মানসিক প্রশান্তি। একইভাবে আখেরাতের কল্যাণের মধ্যে রয়েছে কবরের আজাব থেকে মুক্তি, হাশরের ময়দানে সহজ হিসাব এবং জান্নাত লাভ।
হাদিস শরিফে এসেছে, রুকনে ইয়ামানির কাছে সত্তরজন ফেরেশতা মোতায়েন থাকেন। বান্দা যখন এই স্থানে দোয়া করে, তখন ফেরেশতারা সমস্বরে 'আমীন' (হে আল্লাহ! কবুল করুন) বলেন। তাই ফেরেশতাদের আমীনের সাথে নিজের দোয়া মেলাবার এই এক অপূর্ব সুযোগ।
আমলগত সাধারণ ভুলত্রুটি
তাওয়াফকারীদের মধ্যে একটি সাধারণ ভুল ধারণা দেখা যায় যে, রুকনে ইয়ামানিকে হাজরে আসওয়াদের মতো চুম্বন করতে হবে কিংবা দূর থেকে হাত দিয়ে ইশারা বা ইস্তিলাম করতে হবে। এটি সুন্নাহর পরিপন্থী। নিয়ম হলো—সুযোগ থাকলে রুকনে ইয়ামানিকে কেবল ডান হাত দিয়ে আলতোভাবে স্পর্শ করা, আর সুযোগ না থাকলে কোনো ইশারা বা চুম্বন না করেই শুধু দোয়া পড়তে পড়তে হাজরে আসওয়াদের দিকে এগিয়ে যাওয়া।
আরেকটি ভুল হলো, অনেকে মনে করেন কাবা শরিফের অন্যান্য কোণেও নির্দিষ্ট দোয়া রয়েছে। প্রকৃতপক্ষে রুকনে ইয়ামানি ও হাজরে আসওয়াদের মধ্যবর্তী স্থান ছাড়া অন্য কোনো চক্করে বা কোণে রাসুলুল্লাহ (সা.) থেকে পৃথক কোনো দোয়া প্রমাণিত নেই।
তথ্যসূত্র
কুরআনিক আয়াত
- সূরা আল-বাকারাহ, ২:২০১ — দুনিয়া ও আখেরাতের সার্বিক কল্যাণ কামনার মূল আয়াত।
হাদিস
- সুনান আবু দাউদ, হাদিস ১৮৯২ (অধ্যায়: মনাসিক) — রুকনে ইয়ামানি ও হাজরে আসওয়াদের মাঝে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর দোয়া পাঠের স্পষ্ট দলিল।
- সুনান ইবনে মাজাহ, হাদিস ২৯৫৭ (অধ্যায়: মনাসিক) — রুকনে ইয়ামানির নিকট ফেরেশতাদের আমীন বলার ফজিলত।
রুকনে ইয়ামানি বলতে মূলত কোন স্থানটিকে বোঝায়?
ভিড়ের কারণে রুকনে ইয়ামানি হাত দিয়ে স্পর্শ করতে না পারলে করণীয় কী?
এই অংশে কি অন্য কোনো ভাষায় মনের ইচ্ছা ব্যক্ত করে দোয়া করা যাবে?
তাওয়াফের বাইরে সাধারণ অবস্থায় কি এই দোয়াটি পড়া যাবে?
উপসংহার
রুকনে ইয়ামানি ও হাজরে আসওয়াদের মধ্যবর্তী স্থানটি বান্দার আকুতি পেশ করার এক অনন্য জান্নাতি টুকরো। কৃত্রিম নিয়মের পেছনে না ছুটে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর শেখানো এই খাঁটি কোরআনিক দোয়ার মাধ্যমে নিজের ইহকাল ও পরকালের মুক্তির জন্য আল্লাহর দরবারে রোনাজারি করা উচিত। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা আমাদের সকলকে সুন্নাত সম্মত উপায়ে কাবা শরিফ তাওয়াফ করার তাওফিক দান করুন। আমীন।

