কোরবানি ইসলামের একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিআর বা মহান ইবাদত। পশু জবাই করার সময় রাসুলুল্লাহ (সা.) থেকে নির্দিষ্ট কিছু দোয়া ও আমল প্রমাণিত রয়েছে। তবে কোরবানি করার সময় এই দীর্ঘ দোয়াটি পড়া কি ওয়াজিব (অবশ্য করণীয়) নাকি সুন্নত ও মুস্তাহাব? এ বিষয়ে ইসলামের প্রধান চার মাযহাবের ফকিহদের মধ্যে কিছুটা তাত্ত্বিক মতভেদ রয়েছে। একজন মুসলিম হিসেবে নিজের ইবাদতকে ত্রুটিমুক্ত ও সুন্নাহসম্মত উপায়ে আদায় করতে এর সঠিক ফিকহি রূপরেখা এবং শর্তাবলি জানা অত্যন্ত জরুরি। এই নিবন্ধে কোরবানির দোয়া, তাসমিয়াহ (বিসমিল্লাহ বলা) এবং তাকবিরের বিধান নিয়ে চার মাযহাবের দলিলভিত্তিক বিশ্লেষণ উপস্থাপন করা হলো।
কোরবানির দোয়া ও এর শরিয়তি রূপ
পশু জবাইয়ের প্রাক্কালে রাসুলুল্লাহ (সা.) যে দীর্ঘ দোয়াটি পাঠ করতেন, তা হাদিসের বিভিন্ন গ্রন্থে বিশুদ্ধ সনদে বর্ণিত হয়েছে। জাবের ইবনে আব্দুল্লাহ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) কোরবানির দিন দুটি শিংওয়ালা, সাদা-কালো এবং খাসি করা দুম্বা জবাই করলেন। যখন তিনি সে দুটিকে কিবলামুখী করলেন, তখন এই দোয়াটি পাঠ করলেন:
উচ্চারণ: ইন্নি ওয়াজ্জাহতু ওয়াজহিয়া লিল্লাজি ফাতারাস সামাওয়াতি ওয়াল আরদা হানিফাও ওয়া মা আনা মিনাল মুশরিকিন। ইন্না সালাতি ওয়া নুসুঁকি ওয়া মাহয়াইয়া ওয়া মামাতি লিল্লাহি রাব্বিল আলামিন। লা শারিকা লাহু ওয়া বি জালিকা উমিরতু ওয়া আনা আউওয়ালুল মুসলিমিন। আল্লাহুম্মা মিনকা ওয়া লাকা ওয়া আন মুহাম্মাদিন ওয়া উম্মাতিহি, বিসমিল্লাহি ওয়াল্লাহু আকবার।
অনুবাদ: আমি একনিষ্ঠভাবে আমার মুখমণ্ডল সেই মহান সত্তার দিকে ফেরাচ্ছি যিনি আসমান ও জমিন সৃষ্টি করেছেন এবং আমি মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত নই। নিশ্চয়ই আমার সালাত, আমার কোরবানি, আমার জীবন ও আমার মরণ একমাত্র আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের জন্য; তাঁর কোনো শরিক নেই। আমি এরই নির্দেশপ্রাপ্ত হয়েছি এবং আমি মুসলিমদের প্রথম অন্তর্ভুক্ত। হে আল্লাহ! এটি আপনার পক্ষ থেকে প্রাপ্ত এবং আপনার জন্যই উৎসর্গীকৃত; মুহাম্মাদ ও তাঁর উম্মতের পক্ষ থেকে। আল্লাহর নামে এবং আল্লাহ সবচেয়ে মহান।
জবাই করার মূল মুহূর্তে এই দীর্ঘ দোয়ার ঠিক কতটুকু অংশ আবশ্যিক আর কতটুকু ঐচ্ছিক, তা নিয়েই মূলত ফকিহদের মাঝে ফিকহি আলোচনা রয়েছে।
কোরবানির দোয়ার ফিকহি বিধান: চার মাযহাবের দৃষ্টিভঙ্গি
ইসলামি ফিকহে পশুর গলায় ছুরি চালানোর সময় ‘আল্লাহর নাম নেওয়া’ (তাসমিয়াহ) এবং ওপরের দীর্ঘ ‘দোয়া ও ইস্তিগফার’ পাঠ করাকে পৃথকভাবে মূল্যায়ন করা হয়েছে। নিচে চার মাযহাবের নির্ভরযোগ্য ফতোয়া ও কর্মপদ্ধতি তুলে ধরা হলো:
১. হানাফি মাযহাবের বিধান
হানাফি মাযহাবের নির্ভরযোগ্য মতানুযায়ী, পশু জবাই করার সময় কেবল ‘তাসমিয়াহ’ বা আল্লাহর নাম (যেমন: বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবার) উচ্চারণ করা ওয়াজিব। যদি কোনো ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে আল্লাহর নাম ত্যাগ করে জবাই করে, তবে হানাফি ফিকহ মতে সেই পশুর গোশত খাওয়া হারাম এবং কোরবানি বাতিল বলে গণ্য হবে। তবে যদি কেউ ভুলবশত বা অসাবধানতাবশত নাম বলতে ভুলে যায়, তবে কোরবানি শুদ্ধ হয়ে যাবে। আর ওপরে উল্লেখিত দীর্ঘ দোয়াটি পড়া ওয়াজিব নয়, বরং তা উত্তম ও সুন্নত।
২. শাফিঈ মাযহাবের বিধান
শাফিঈ মাযহাবের ফিকহ অনুসারে, জবাইয়ের সময় আল্লাহর নাম নেওয়া (বিসমিল্লাহ বলা) এবং দীর্ঘ দোয়া পাঠ করা—উভয়টিই সুন্নাতে মুয়াক্কাদাহ বা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সুন্নত; এটি ওয়াজিব নয়। কোনো ব্যক্তি যদি ইচ্ছাকৃতভাবেও আল্লাহর নাম না নিয়ে কেবল কোরবানি বা জবাইয়ের নিয়তে পশু জবেহ করে, তবুও শাফিঈ মাযহাবে সেই কোরবানি বৈধ হবে এবং গোশত হালাল হবে, যদিও কাজটি মাকরুহ বা অনুত্তম হয়েছে বলে গণ্য হবে।
৩. মালিকি মাযহাবের বিধান
মালিকি মাযহাবের ফতোয়া অনুযায়ী, জবাইয়ের সময় আল্লাহর নাম বা তাসমিয়াহ বলা ওয়াজিব। তবে হানাফি মাযহাবের মতোই এখানেও ভুলবশত ছেড়ে দিলে তা ক্ষমাযোগ্য। কিন্তু মালিকি ফিকহে দীর্ঘ দোয়াটি পড়া ওয়াজিব নয়, বরং তা মুস্তাহাব বা পছন্দনীয় আমল। তাদের মতে, জবাইয়ের সময় পশুর নিখুঁত বৈশিষ্ট্য ও জবেহ করার সঠিক পদ্ধতির প্রতি লক্ষ্য রাখাই প্রধান দায়িত্ব।
৪. হাম্বলি মাযহাবের বিধান
হাম্বলি মাযহাবেও জবাইয়ের সময় ‘বিসমিল্লাহ’ বলা ওয়াজিব এবং এটি ইচ্ছাকৃতভাবে বাদ দিলে জবাইকৃত পশু শরিয়তের দৃষ্টিতে মৃত বা ‘মাইতাহ’ (হারাম) বলে গণ্য হয়। তবে হাম্বলি ফিকহবিদদের মতেও দীর্ঘ দোয়াটি পাঠ করা ওয়াজিবের অন্তর্ভুক্ত নয়, বরং রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহর অনুসরণে এটি অত্যন্ত সওয়াবের কাজ।
মাযহাব ভিত্তিক তুলনামূলক সারণি
বিষয়টি আরও সহজে অনুধাবন করার জন্য নিচে চার মাযহাবের ফিকহি সিদ্ধান্তের সংক্ষিপ্ত রূপ দেওয়া হলো:
| ফিকহি মাযহাব | দীর্ঘ দোয়া পাঠের বিধান | ‘বিসমিল্লাহ’ বলার বিধান | ইচ্ছাকৃতভাবে ‘বিসমিল্লাহ’ না ছাড়ার হুকুম |
|---|---|---|---|
| হানাফি মাযহাব | সুন্নত / মুস্তাহাব | ওয়াজিব | পশু হারাম ও কোরবানি বাতিল |
| শাফিঈ মাযহাব | সুন্নত / মুস্তাহাব | সুন্নাতে মুয়াক্কাদাহ | কোরবানি মাকরুহসহ আদায় হবে |
| মালিকি মাযহাব | মুস্তাহাব | ওয়াজিব | পশু হারাম ও কোরবানি বাতিল |
| হাম্বলি মাযহাব | সুন্নত | ওয়াজিব | পশু হারাম ও কোরবানি বাতিল |
কোরবানির দোয়া ও তাসমিয়াহর সুন্নাহসম্মত আদব
কোরবানির আমলকে ত্রুটিমুক্ত ও মহান আল্লাহর দরবারে গ্রহণযোগ্য করতে হলে কিছু শরিয়তসম্মত আদব বা নিয়ম মেনে চলা প্রয়োজন:
- কিবলামুখী করা: পশুকে বাম কাতে শুইয়ে মাথাটি দক্ষিণ দিকে এবং পাগুলো পশ্চিম দিকে রেখে কিবলামুখী করে শোয়ানো সুন্নত।
- ছুরি ধারালো করা: পশুর সামনে ছুরি ধার দেওয়া মাকরুহ। জবাই করার আগেই ছুরি ভালোভাবে ধারালো করে নিতে হবে যাতে পশুর কষ্ট কম হয়।
- পশু শান্ত রাখা: এক পশুর সামনে অন্য পশুকে জবাই করা অনুচিত এবং জবাইয়ের স্থানে পশুকে টেনে-হিঁচড়ে কষ্ট দিয়ে নেওয়া মাকরুহ।
তথ্যসূত্র
কুরআনিক আয়াত
- সূরা আল-আনআম, ৬:১৬২ — আল্লাহর উদ্দেশ্যে সালাত ও কোরবানির একনিষ্ঠতার নির্দেশ।
হাদিস
- সহীহ বুখারী, হাদিস ৫৫৬৫ (অধ্যায়: কোরবানি) — রাসুলুল্লাহ (সা.) কর্তৃক বিসমিল্লাহ ও তাকবিরসহ নিজের হাতে দুটি দুম্বা জবাই করার বিবরণ।
- সহীহ মুসলিম, হাদিস ১৯৬৬ (অধ্যায়: কোরবানি) — রাসুলুল্লাহ (সা.) এর কোরবানির দোয়া ও জবাইয়ের সুন্নাহ পদ্ধতি।
- সূনান আবু দাউদ, হাদিস ২৮১০ — কোরবানি করার সময় রাসুলুল্লাহ (সা.) এর দীর্ঘ দোয়া পাঠের ঐতিহাসিক দলিল (আল-আলবানী কর্তৃক সহীহ সাব্যস্ত)।
প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)
১. কোরবানির পূর্ণ দীর্ঘ দোয়াটি না পারলে কি কোরবানি হবে?
হ্যাঁ, অবশ্যই হবে। দীর্ঘ আরবি দোয়াটি মুখস্থ না থাকলে বা পড়তে না পারলে কোরবানি অশুদ্ধ হবে না। জবাই করার সময় কেবল ‘বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবার’ বলাই যথেষ্ট এবং এটিই অধিকাংশ মাযহাবে ওয়াজিব।
২. কোরবানির দোয়া কি শুধু পশুর মালিককে পড়তে হবে নাকি যে জবাই করছে তাকে?
জবাই করার সময় ‘বিসমিল্লাহ’ এবং তাকবির বলা মূলত যিনি নিজ হাতে ছুরি চালাচ্ছেন (জবেহকারী), তাঁর ওপর ওয়াজিব। পশুর মালিক পাশে উপস্থিত থাকলে তিনিও বরকতের জন্য দোয়াটি পড়তে পারেন, তবে জবেহকারীর তাসমিয়াহ পাঠ করা বাধ্যতামূলক।
৩. ভুলবশত বিসমিল্লাহ না বললে কি কোরবানির গোশত খাওয়া যাবে?
হানাফি, মালিকি ও হাম্বলি মাযহাবের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, কোনো মুসলিম যদি পশু জবাইয়ের সময় অসাবধানতাবশত বা ভুলে গিয়ে বিসমিল্লাহ বলতে বাদ দিয়ে ফেলে, তবে আল্লাহর রহমতে সেই কোরবানি ও পশুর গোশত সম্পূর্ণ হালাল থাকবে। তবে অলসতাবশত বা ইচ্ছাকৃতভাবে ছাড়লে তা খাওয়া বৈধ হবে না।
৪. মহিলারা কি নিজের কোরবানির পশু নিজে জবাই করতে এবং দোয়া পড়তে পারেন?
ইসলামি শরিয়তে নারীদের পশু জবাই করার পূর্ণ অধিকার রয়েছে। কোনো নারী যদি জবাইয়ের নিয়ম জানেন এবং পশুর গলায় ছুরি চালাতে সক্ষম হন, তবে তিনি ‘বিসমিল্লাহ’ বলে নিজের বা অন্যের পশু জবাই করতে পারবেন এবং কোরবানির দোয়াও পাঠ করতে পারবেন। এতে কোনো ধরনের ফিকহি নিষেধাজ্ঞা নেই।

