রমজান কিংবা নফল রোজার জন্য সাহরি (সুহুর) গ্রহণ করা অত্যন্ত বরকতময় একটি ইবাদত। আমাদের সমাজে একটি প্রচলিত ধারণা রয়েছে যে, সাহরি খাওয়ার পর বা রোজা রাখার জন্য বিশেষ কোনো আরবি দোয়া মুখস্থ পড়া আবশ্যক। অনেকেই নির্দিষ্ট কিছু শব্দমালাকে ‘সাহরির দোয়া’ বা ‘রোজার নিয়তের দোয়া’ হিসেবে গণ্য করে থাকেন। তবে একজন মুমিনের জন্য শরিয়তের প্রকৃত বিধান এবং রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহর সঠিক প্রয়োগ জানা জরুরি। এই নিবন্ধে কুরআন ও হাদিসের আলোকে সাহরির সময় দোয়া, নিয়তের আসল পদ্ধতি এবং এ সংক্রান্ত ভুল ধারণাগুলো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।
সাহরি বা সুহুরের নির্দিষ্ট কোনো দোয়া আছে কি?
হাদিস শাস্ত্র ও সুন্নাহর বিশুদ্ধ গ্রন্থগুলো পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সাহরি বা সুহুর খাওয়ার জন্য বিশেষ কোনো নির্দিষ্ট দোয়া রাসূলুল্লাহ (সা.) থেকে প্রমাণিত নয়। আল্লাহর রাসূল (সা.) সাহরি খাওয়ার সময় সাধারণ খাবার গ্রহণের আদবই বজায় রাখতেন। অর্থাৎ, খাওয়ার শুরুতে ‘বিসমিল্লাহ’ বলা এবং খাবার শেষ করার পর ‘আলহামদুলিল্লাহ’ বলা। অতএব, সাহরির জন্য আলাদা কোনো মনগড়া দোয়া আবিষ্কার করা বা তাকে সুন্নাহ মনে করা শরিয়তসম্মত নয়।
সাহরির নিয়ত: বহুল প্রচলিত আরবি বাক্য ও তার বিধান
আমাদের উপমহাদেশে সাহরির পর একটি আরবি বাক্য মুখে উচ্চারণ করে নিয়তের দোয়া হিসেবে পড়ার রেওয়াজ রয়েছে, যা নিচে দেওয়া হলো:
আরবি টেক্সট
বাংলা উচ্চারণ
উচ্চারণ: নাওয়াইতু আন আছুমা গাদান মিন শাহরি রমাদান।
বাংলা অনুবাদ
অনুবাদ: আমি রমজান মাসের আগামীকালকের রোজা রাখার নিয়ত করছি।
ইসলামিক বিধান ও সতর্কতা: এই নির্দিষ্ট আরবি বাক্যটি কোনো সহিহ বা জয়িফ হাদিসেও বর্ণিত হয়নি। এটি পরবর্তী যুগের ফকিহগণ সাধারণ মানুষের বোঝার সুবিধার্থে তৈরি করেছিলেন। ইসলামে নিয়ত (সংকল্প) হলো অন্তরের কাজ, মুখের নয়। আপনি যখন শেষ রাতে রোজা রাখার উদ্দেশ্যে ঘুম থেকে উঠে সাহরি খাচ্ছেন, তখন আপনার অন্তরে যে ইচ্ছাটি রয়েছে, সেটিই শরিয়তসম্মত নিয়ত হিসেবে পূর্ণাঙ্গভাবে যথেষ্ট। মুখে এই বাক্যটি উচ্চারণ করা বাধ্যতামূলক বা সুন্নাত কোনোটিই নয়।
সাহরি ও নিয়তের ব্যাপারে সহিহ হাদিসের নির্দেশনা
ফরজ রোজার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হলো সুবহে সাদিকের পূর্বেই অন্তরে রোজা রাখার দৃঢ় সংকল্প করা। উম্মুল মুমিনীন হাফসা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি ফজরের পূর্বে (রাতের বেলায়) রোজার নিয়ত না করবে, তার কোনো রোজা নেই।’ হাদিসটি ইমাম আবু দাউদ তাঁর সুনান আবু দাউদ, হাদিস ২৪৫৪-এ সংকলন করেছেন এবং আল্লামা আলবানি একে সহিহ বলেছেন।
সাহরি খাওয়ার বড় একটি বৈশিষ্ট্য হলো এটি স্বয়ং একটি বরকত। আনাস ইবনে মালিক (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা সাহরি খাও, কারণ সাহরিতে বরকত রয়েছে।’ হাদিসটি ইমাম বুখারি তাঁর সহীহ বুখারী, হাদিস ১৯২৩-এ বর্ণনা করেছেন। সুতরাং, বরকতময় এই সময়ে অতিরিক্ত আনুষ্ঠানিকতায় না গিয়ে সুন্নাহর স্বাভাবিক পদ্ধতি অনুসরণ করাই শ্রেয়।
সাহরির শেষ সময়: দোয়া কবুলের এক সুবর্ণ সুযোগ
সাহরির জন্য নির্দিষ্ট কোনো দোয়া না থাকলেও, সাহরির সময়টি (রাতের শেষ তৃতীয়াংশ) দোয়া কবুলের জন্য অত্যন্ত বরকতময় ও মর্যাদাপূর্ণ। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন যে, মহান আল্লাহ প্রতি রাতের শেষ তৃতীয়াংশে দুনিয়ার আকাশে অবতরণ করেন এবং ঘোষণা করেন, ‘কে আছ আমার কাছে দোয়া করবে, আমি তার দোয়া কবুল করব? কে আছ আমার কাছে ক্ষমা চাইবে, আমি তাকে ক্ষমা করব?’ হাদিসটি সহীহ বুখারী, হাদিস ১১৪৫-এ বর্ণিত হয়েছে।
অতএব, সাহরি খাওয়ার পর মুখে মনগড়া আরবি নিয়তের দোয়া না পড়ে, সেই মূল্যবান সময়ে আল্লাহর কাছে নিজের ভাষায় বেশি বেশি ইস্তিগফার (ক্ষমা প্রার্থনা) করা এবং জীবনের প্রাত্যহিক ও পারলৌকিক কল্যাণের জন্য সাধারণ দোয়া করা অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ আমল।
সাহরির সময় প্রচলিত ভুলসমূহ
- দোয়া না পড়লে রোজা হবে না ভাবা: অনেক সাধারণ মুসলিম মনে করেন মুখে নিয়তের দোয়া না পড়লে রোজা শুদ্ধ হয় না, যা সম্পূর্ণ ভুল ধারণা। অন্তরের সংকল্পই রোজা শুদ্ধ হওয়ার জন্য যথেষ্ট।
- জামাআতবদ্ধ হয়ে উচ্চস্বরে নিয়ত পড়া: সাহরি শেষে দলবদ্ধভাবে বা মাইকে উচ্চস্বরে সম্মিলিতভাবে নিয়তের বাক্য পড়া একটি নব-উদ্ভাবিত আমল (বিদআত), যা থেকে বিরত থাকা আবশ্যক।
- ইফতারের দোয়া সাহরিতে পড়া: অনেকে ভুলবশত ইফতারের দোয়া যেমন ‘আল্লাহুম্মা লাকা সুমতু’ সাহরির সময় পড়ে থাকেন, যা অসচেতনতার বহিঃপ্রকাশ।
রেফারেন্স (References)
হাদিসের মূল উৎসসমূহ
- সহীহ বুখারী, হাদিস ১৯২৩ (অধ্যায়: রোজা) — সাহরি খাওয়ার ফজিলত ও বরকত সংক্রান্ত বর্ণনা।
- সুনান আবু দাউদ, হাদিস ২৪৫৪ — সুবহে সাদিকের পূর্বে ফরজ রোজার নিয়ত নিশ্চিত করার বাধ্যবাধকতার দলিল।
- সহীহ বুখারী, হাদিস ১১৪৫ (অধ্যায়: তাহাজ্জুদ সালাত) — রাতের শেষ তৃতীয়াংশে দোয়া কবুল হওয়ার শ্রেষ্ঠ সময় সংক্রান্ত প্রমাণ।
প্রায়শ জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)
১. সাহরি না খেলে কি রোজা হবে না?
সাহরি খাওয়া সুন্নাত এবং অত্যন্ত বরকতময় কাজ, ফরজ নয়। কোনো ব্যক্তি যদি সাহরি না খেয়েও রোজা রাখার অন্তরের সংকল্প রাখে, তবে তার রোজা শরিয়ত অনুযায়ী শুদ্ধ হয়ে যাবে। তবে সুন্নতের সওয়াব থেকে সে বঞ্চিত হবে।
২. মুখে নিয়তের দোয়া বলা কি গুনাহের কাজ?
মুখে কোনো বাক্য উচ্চারণ করাকে যদি কেউ সুন্নাত বা শরিয়তের আবশ্যক অংশ মনে করে আমল করে, তবে তা দ্বীনের মধ্যে নতুন সংযোজন বা বিদআত হবে। তবে কেউ যদি কেবল নিজের মনকে স্থির করার জন্য কোনো সুন্নাত বিশ্বাস ছাড়া মুখে বলে, তা গুনাহ হবে না; কিন্তু না বলাই উত্তম।
৩. সাহরি খাওয়ার শেষ সময় কখন?
সুবহে সাদিক বা ফজরের আজানের পূর্ব পর্যন্ত সাহরি খাওয়া ও পান করা জায়েজ। ফজরের আজান শুরু হওয়ার সাথে সাথেই সব ধরনের পানাহার বন্ধ করতে হবে। সুন্নাত হলো সাহরি কিছুটা বিলম্ব করে শেষ সময়ে খাওয়া।
৪. নফল রোজার নিয়ত কি রাতে করা জরুরি?
না, ফরজ রোজার নিয়ত রাতে বা সুবহে সাদিকের আগে করা আবশ্যক হলেও নফল রোজার নিয়ত সুবহে সাদিকের পর দুপুরের পূর্ব পর্যন্ত যেকোনো সময় করা যায়, যদি সুবহে সাদিকের পর থেকে নিয়ত করার আগ পর্যন্ত রোজা ভঙ্গকারী কোনো কাজ (যেমন পানাহার) না করা হয়ে থাকে।
উপসংহার
ইসলামের সুউচ্চ ইবাদতগুলো অত্যন্ত সহজ ও প্রজ্ঞাময়। সাহরি বা সুহুরের নির্দিষ্ট কোনো দোয়া হাদিসে নেই, বরং সাহরি গ্রহণ করা এবং শেষ রাতে আল্লাহর কাছে ইস্তিগফার করাই হলো প্রকৃত সুন্নতি আদর্শ। মুখের কৃত্রিম শব্দমালার চেয়ে অন্তরের খাঁটি ইখলাস বা সংকল্পই আল্লাহর দরবারে অগ্রগণ্য। মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে সুন্নাহর সঠিক জ্ঞান অনুযায়ী আমল করার তৌফিক দান করুন। আমীন।

