ইফতারের দোয়া, আরবি উচ্চারণ ও সহজ অর্থ: সুন্নাহসম্মত আমল ও গাইড

আব্দুর রহমান
আব্দুর রহমান
১২ জুল, ২০২৬রোজা

ইসলামের পঞ্চস্তম্ভের মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত হলো রোজা বা সাওম। আর সারাদিন রোজা রাখার পর সূর্যাস্তের সময় মহান আল্লাহর দেওয়া রিজিক নিয়ে আনন্দপূর্ণ চিত্তে রোজা ভাঙার নামই ইফতার। ইফতারের সময়টি কেবল একজন মুমিনের জন্য শারীরিক তৃপ্তির মুহূর্ত নয়, বরং এটি আধ্যাত্মিক দিক থেকেও অত্যন্ত বরকতময়। রাসুলুল্লাহ (সা.) ইফতারের সময় বিশেষ দোয়া পাঠ করতেন এবং উম্মতকে দোয়া করার নির্দেশ দিয়েছেন। এই নিবন্ধে আমরা সহিহ হাদিসের আলোকে ইফতারের মাসনুন দোয়া, এর আরবি, সঠিক উচ্চারণ, অর্থ এবং ইফতারের সুন্নাহসম্মত আদবসমূহ বিস্তারিত আলোচনা করব।

ইসলামে ইফতার ও দোয়ার গুরুত্ব

ইফতারের সময়টি আল্লাহর দরবারে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। সারাদিন ক্ষুধার্ত ও তৃষ্ণার্ত থেকে একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য বান্দা যখন ইফতারের অপেক্ষা করে, তখন আল্লাহ তাআলা ফেরেশতাদের সামনে গর্ব করেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, "নিশ্চয়ই ইফতারের সময় রোজাদারের এমন একটি দোয়া রয়েছে যা ফিরিয়ে দেওয়া হয় না" (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস ১৭NT; ইমাম আল-আলবানি একে সহিহ বলেছেন)। তাই ইফতারের পূর্ব মুহূর্তটিকে অবহেলায় না কাটিয়ে বেশি বেশি ইস্তিগফার ও আল্লাহর কাছে নিজের প্রয়োজনীয় বিষয় চাওয়া উচিত।

ইফতারের বিশুদ্ধ ও মাসনুন দোয়া

আমাদের সমাজে ইফতারের সময় একাধিক দোয়া প্রচলিত রয়েছে। তবে মুহাদ্দিস ও আলেমগণের তাহকিক বা গবেষণা অনুযায়ী সবচেয়ে সহিহ ও সুন্নাহসম্মত দোয়াটি নিচে উল্লেখ করা হলো:

১. ইফতারের সবচেয়ে সহিহ দোয়া (যাহাবাজ জামাউ)

রাসুলুল্লাহ (সা.) ইফতার করার পর বা পানি পানের মাধ্যমে মুখ সিক্ত করে এই দোয়াটি পাঠ করতেন:

ذَهَبَ الظَّمَأُ وَابْتَلَّتِ الْعُرُوقُ وَثَبَتَ الْأَجْرُ إِنْ شَاءَ اللَّهُ

উচ্চারণ: জাহাবাজ জামাউ ওয়াবতাল্লাতিল উরুকু ওয়া সাবাতাল আজরু ইন শা আল্লাহ।

অনুবাদ: পিপাসা দূর হলো, শিরা-উপশিরাগুলো সিক্ত হলো এবং আল্লাহর ইচ্ছায় সওয়াব নির্ধারিত হলো।

এই দোয়াটি সুনানে আবু দাউদ, হাদিস ২৩৫৭-এ বর্ণিত হয়েছে। ইমাম দারা কুতনী এবং আল-আলবানি একে সহিহ বলে গণ্য করেছেন। ইফতারের পর এই দোয়াটি পড়া সবচেয়ে উত্তম আমল।

২. বহুল প্রচলিত দ্বিতীয় দোয়া ও তার সত্যতা

আমাদের দেশে ইফতারের শুরুতে সাধারণত আরেকটি দোয়া খুব বেশি পড়া হয়:

اللَّهُمَّ لَكَ صُمْتُ وَعَلَى رِزْقِكَ أَفْطَرْتُ

উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা লাকা সুমতু ওয়া আলা রিজকিকা আফতারতু।

অনুবাদ: হে আল্লাহ! আমি আপনার জন্যই রোজা রেখেছি এবং আপনারই দেওয়া রিজিক দিয়ে ইফতার করছি।

এই দোয়াটি সুনানে আবু দাউদ, হাদিস ২৩৫৮-এ মুয়াজ ইবনে জুহরাহ (রহ.) থেকে মুরসাল তথা জয়িফ (দুর্বল) সূত্রে বর্ণিত হয়েছে। তবে এর অর্থ বিশুদ্ধ হওয়ায় ইফতারের শুরুতে 'বিসমিল্লাহ' বলার সাথে এটি পাঠ করা জায়েজ, তবে পূর্বোক্ত সহিহ দোয়াটিকে অগ্রাধিকার দেওয়া সুন্নাতের অধিক নিকটবর্তী।

ইফতারের সুন্নাহসম্মত আদব ও নিয়মাবলি

ইফতারের সময় আল্লাহর পূর্ণাঙ্গ বরকত ও সওয়াব লাভ করতে হলে কিছু সুন্নাহসম্মত আদব মেনে চলা প্রয়োজন:

  • ইফতারে জলদি করা: সূর্যাস্ত নিশ্চিত হওয়ার পর ইফতার করতে দেরি না করা সুন্নাত। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, "মানুষ ততদিন কল্যাণের ওপর থাকবে, যতদিন তারা দ্রুত ইফতার করবে" (সহীহ বুখারী, হাদিস ১৯৫৭)।
  • খেজুর বা পানি দিয়ে শুরু করা: তাজা খেজুর (রুতাব) অথবা শুকনো খেজুর (তামর) দিয়ে ইফতার শুরু করা সুন্নাত। খেজুর না থাকলে সাধারণ পানি দিয়ে ইফতার শুরু করা উচিত (সুনানে আত-তিরমিজী, হাদিস ৬৯৫)।
  • অপচয় ও অতিভোজ বর্জন: সারাদিন রোজা রাখার পর ইফতারের টেবিলে অতিরিক্ত ভাজাপোড়া ও ভারী খাবার খেয়ে পেট অতিরিক্ত পূর্ণ করা সুন্নাত পরিপন্থী। পরিমিত আহার স্বাস্থ্য ও ইবাদত উভয়ের জন্য সহায়ক।
  • অন্যকে ইফতার করানো: অভাবী বা যেকোনো রোজাদারকে ইফতার করালে মহান আল্লাহ সেই রোজাদারের সমপরিমাণ সওয়াব দান করেন (সুনানে আত-তিরমিজী, হাদিস ৮০৭)।

ইফতারের দোয়া নিয়ে সমাজে প্রচলিত ভুল ধারণা

অনেকে মনে করেন ইফতারের নির্দিষ্ট আরবি দোয়াগুলো পাঠ না করলে হয়তো রোজাই হবে না। এটি সম্পূর্ণ ভুল ধারণা। ইফতারের দোয়া পড়া একটি গুরুত্বপূর্ণ সুন্নাত আমল, যা রোজার সওয়াব বৃদ্ধি করে; তবে কোনো কারণে দোয়া পড়তে না পারলে রোজার কোনো ক্ষতি হয় না। এছাড়া ইফতারের আগে মনগড়া বা দীর্ঘ আনুষ্ঠানিক দোয়া করার চেয়ে হাদিসে বর্ণিত সংক্ষিপ্ত ও অর্থপূর্ণ মাসনুন দোয়াগুলো পাঠ করাই সর্বোত্তম।

উপসংহার

ইফতারের সময় মহান আল্লাহর দরবারে কৃতজ্ঞতা প্রকাশের এবং সুন্নাহ অনুসরণের এক অনন্য সুযোগ। বিশুদ্ধ হাদিস দ্বারা প্রমাণিত দোয়াগুলো পাঠ করে এবং ইফতারের সঠিক আদবসমূহ মেনে চলে আমরা আমাদের রোজাকে আরো বেশি অর্থবহ ও বরকতময় করে তুলতে পারি। রোজা আমাদের আত্মিক ও শারীরিক পরিশুদ্ধি দান করে। তবে রোজা অবস্থায় কোনো গুরুতর শারীরিক অসুস্থতা দেখা দিলে শরীয়তের ছাড়ের বিধান অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া এবং অভিজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ গ্রহণ করাও ইসলামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা। আল্লাহ আমাদের সবার রোজা ও ইফতার কবুল করুন।

রেফারেন্স

কুরআনিক আয়াত

হাদিস

প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)

ইফতারের দোয়াটি ইফতার করার আগে নাকি পরে পড়তে হয়?

সবচেয়ে সহিহ দোয়া 'যাহাবাজ জামাউ...' এর শাব্দিক অর্থ (পিপাসা দূর হলো ও শিরা সিক্ত হলো) থেকে স্পষ্ট যে, এটি ইফতার শুরু করার পর, অর্থাৎ পানি বা খেজুর মুখে দিয়ে তৃষ্ণা কিছুটা নিবারণ করার পর পড়তে হয়। আর প্রচলিত দোয়া 'আল্লাহুম্মা লাকা সুমতু' ইফতার শুরু করার মুহূর্তে বিসমিল্লাহর সাথে পড়া যায়।

ইফতারের সময় নিজের ভাষায় কি দোয়া করা যাবে?

হ্যাঁ, ইফতারের সময়টি যেহেতু দোয়া কবুলের বিশেষ মুহূর্ত, তাই হাদিসে বর্ণিত মাসনুন দোয়ার পাশাপাশি বান্দা তার নিজের ভাষায় ইহকাল ও পরকালের যেকোনো বৈধ চাওয়া আল্লাহর দরবারে পেশ করতে পারেন। এ সময় নিজের, পরিবারের এবং সমগ্র মুসলিম উম্মাহর জন্য দোয়া করা অত্যন্ত উত্তম।

আজান শেষ হওয়া পর্যন্ত কি ইফতার না করে অপেক্ষা করতে হবে?

না, আজান শেষ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করার প্রয়োজন নেই। সূর্যাস্ত নিশ্চিত হওয়ার সাথে সাথেই ইফতার করে নেওয়া সুন্নাত। ঘড়ির সময় বা মসজিদের আজানের প্রথম শব্দ শোনার সাথে সাথেই ইফতার শুরু করা উচিত, কারণ সুন্নাহ হলো দ্রুত ইফতার করা।

ইফতারের দোয়া জোরে নাকি মনে মনে পড়া উচিত?

ইফতারের দোয়া সাধারণ অন্য সব দোয়ার মতোই স্বাভাবিক কণ্ঠে নিচু আওয়াজে বা মনে মনে পড়া উত্তম। উচ্চ শব্দে চিৎকার করে বা দলবদ্ধভাবে সমস্বরে পড়ার কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। তবে পরিবারের ছোটদের শেখানোর উদ্দেশ্যে কিছুটা স্পষ্ট আওয়াজে পড়া যেতে পারে।
আব্দুর রহমান

আব্দুর রহমান

এসইও স্পেশালিস্ট ও কনটেন্ট রাইটার

আব্দুর রহমান একজন এসইও স্পেশালিস্ট এবং ইসলামিক কনটেন্ট রাইটার। তিনি ফিকহ, দৈনন্দিন ইবাদত, নামাজ, পারিবারিক দিকনির্দেশনা এবং বাস্তব মুসলিম জীবনধারা নিয়ে সহজ প্রবন্ধ লেখেন, যাতে পাঠকরা প্রতিদিনের জীবনে ইসলাম অনুসরণ করতে পারেন।

আপডেট থাকুন

আমাদের সর্বশেষ আপডেট ও রিলিজ মিস করবেন না