জাহাবাজ জামাউ দোয়া: ইফতারের সহিহ দোয়ার আরবি, অর্থ ও হাদিসের মান

আব্দুর রহমান
আব্দুর রহমান
১২ জুল, ২০২৬রোজা

রমজান বা নফল রোজার একটি অন্যতম আনন্দঘন ও বরকতময় মুহূর্ত হলো ইফতার। ইফতারের সময় মহান আল্লাহর দরবারে দোয়া কবুল হওয়ার এক বিশেষ সুযোগ তৈরি হয়। এই পবিত্র মুহূর্তে রাসুলুল্লাহ (সা.) একটি বিশেষ দোয়া পাঠ করতেন, যা ‘জাহাবাজ জামাউ’ বা ‘ধাহাবা আজ-জামা’ দোয়া নামে পরিচিত। অনেকেই ইফতারের সময় প্রচলিত বিভিন্ন দুর্বল বা জয়িফ সনদের দোয়া পড়ে থাকেন। তবে ইফতারের জন্য সবচেয়ে বিশুদ্ধ ও নির্ভরযোগ্য দোয়া হলো এটি। নিচে এই দোয়ার আরবি, সঠিক উচ্চারণ, বাংলা অর্থ, হাদিসের মান এবং এর আমল সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।

জাহাবাজ জামাউ দোয়ার আরবি, উচ্চারণ ও অর্থ

ইফতারের সময় পানি বা খেজুর মুখে দিয়ে রোজা ভাঙার পরপরই এই দোয়াটি পাঠ করা সুন্নত। দোয়াটির আরবি পাঠ, উচ্চারণ ও অনুবাদ নিচে দেওয়া হলো:

আরবি টেক্সট

ذَهَبَ الظَّمَأُ وَابْتَلَّتِ الْعُرُوقُ وَثَبَتَ الأَجْرُ إِنْ شَاءَ اللَّهُ

বাংলা উচ্চারণ

উচ্চারণ: জাহাবাজ্জামাউ ওয়াবতাল্লাতিল উরুকু, ওয়া সাবাতাল আজরু ইনশাআল্লাহ।

বাংলা অনুবাদ

অনুবাদ: তৃষ্ণা দূর হলো, শিরা-উপশিরা সিক্ত হলো এবং আল্লাহর ইচ্ছায় পুরস্কার (সওয়াব) নির্ধারিত হলো।

হাদিসের উৎস ও এর বিশুদ্ধতার মান (Hadith Grade)

সাধারণত সমাজে ইফতারের দোয়া হিসেবে ‘আল্লাহুম্মা লাকা সুমতু ওয়া আলা রিজকিকা আফতারতু’ দোয়াটি বহুল প্রচলিত। তবে মুহাদ্দিসগণের গবেষণায় সেই দোয়াটির সনদ দুর্বল (জয়িফ) বলে প্রমাণিত। পক্ষান্তরে, ‘জাহাবাজ জামাউ’ দোয়াটি অত্যন্ত শক্তিশালী ও বিশুদ্ধ সনদে বর্ণিত হয়েছে।

এই হাদিসটি বিখ্যাত সাহাবি আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) যখন ইফতার করতেন, তখন এই দোয়াটি বলতেন। হাদিসটি ইমাম আবু দাউদ তাঁর ‘সুনান’ গ্রন্থে লিপিবদ্ধ করেছেন। প্রখ্যাত হাদিস বিশারদ আল্লামা আল-অ্যালবানি (রহ.) এই হাদিসটিকে হাসান (গ্রহণযোগ্য ও নির্ভরযোগ্য) বলে আখ্যায়িত করেছেন এবং দারা কুতনি এটিকে সহিহ বলেছেন। সুতরাং, আমলের ক্ষেত্রে এই দোয়াটিই সবচেয়ে অগ্রগণ্য।

দোয়াটির ভেতরের আধ্যাত্মিক তাৎপর্য

এই সংক্ষিপ্ত দোয়াটির মধ্যে একজন রোজাদারের সারাদিনের ক্লান্তি দূর হওয়া এবং পরকালীন স্থায়ী সফলতার এক অপূর্ব সমন্বয় রয়েছে। দোয়াটিকে মূলত তিনটি অংশে ভাগ করা যায়:

  • ذَهَبَ الظَّمَأُ (তৃষ্ণা দূর হলো): দীর্ঘ সময় ক্ষুধার্ত ও তৃষ্ণার্ত থাকার পর পানি পানের মাধ্যমে যে শারীরিক তৃপ্তি আসে, তার জন্য আল্লাহর তাৎক্ষণিক শুকরিয়া প্রকাশ।
  • وَابْتَلَّتِ الْعُرُوقُ (শিরা-উপশিরা সিক্ত হলো): শুকিয়ে যাওয়া শরীরে প্রাণ ফিরে পাওয়ার এক বাস্তব অনুভূতি, যা আল্লাহর নেয়ামতের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।
  • وَثَبَتَ الأَجْرُ إِنْ شَاءَ اللَّهُ (আল্লাহর ইচ্ছায় সওয়াব নির্ধারিত হলো): এটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ। দুনিয়ার ক্লান্তি তো ক্ষণস্থায়ী, তা ইফতারের সাথে সাথেই শেষ হয়ে যায়। কিন্তু এই রোজার বিনিময়ে আখিরাতের যে স্থায়ী পুরস্কার ও সওয়াব, তা আল্লাহর দরবারে সংরক্ষিত হয়ে গেল। এখানে ‘ইনশাআল্লাহ’ বলে বান্দা আল্লাহর রহমতের ওপর পূর্ণ আস্থা ও বিনয় প্রকাশ করে।

ইফতারের দোয়া পাঠের সঠিক নিয়ম ও আদব

ইফতারের সময় দোয়া করার ক্ষেত্রে কিছু নির্দিষ্ট নিয়ম ও আদব বজায় রাখা উচিত, যা আমলের সওয়াব ও গ্রহণযোগ্যতা বাড়িয়ে দেয়:

  1. ইফতারের ঠিক পর মুহূর্তেই পড়া: এই দোয়াটির শব্দবিন্যাস লক্ষ্য করলে দেখা যায়, এখানে অতীতকাল (Past Tense) ব্যবহার করা হয়েছে। অর্থাৎ, ‘তৃষ্ণা দূর হলো এবং শিরা সিক্ত হলো’। এর থেকে প্রমাণিত হয় যে, পানি বা ইফতার সামগ্রী মুখে দিয়ে রোজা ভাঙার ঠিক পর মুহূর্তেই এই দোয়াটি পড়া সুন্নত।
  2. শুরুতে বিসমিল্লাহ বলা: ইফতার মুখে দেওয়ার সময় সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী ‘বিসমিল্লাহ’ বলে খাওয়া শুরু করবেন। অতঃপর ইফতার করা শেষ হলে বা পানির প্রথম চুমুকের পর ‘জাহাবাজ জামাউ’ দোয়াটি পাঠ করবেন।
  3. ইফতারের পূর্ব মুহূর্তের দোয়া: ইফতারের ঠিক আগ মুহূর্তটি দোয়া কবুলের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সময়। তাই আজানের অপেক্ষা করার সময় বেশি বেশি ইস্তিগফার, দুরুদ শরিফ এবং নিজের ও উম্মাহর কল্যাণে আল্লাহর কাছে সাধারণ দোয়া করা উচিত।

ইফতারের সময় যেসব ভুল থেকে বেঁচে থাকা জরুরি

আমাদের সমাজে ইফতারের সময় কিছু সাধারণ অসচেতনতা দেখা যায়, যা বর্জন করা উচিত। প্রথমত, আজানের পর দোয়া পড়তে গিয়ে ইফতার বিলম্বে করা ঠিক নয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) দ্রুত ইফতার করার নির্দেশ দিয়েছেন। দ্বিতীয়ত, অনেকে কেবল প্রচলিত জয়িফ দোয়াটিই পড়েন এবং এই সহিহ সুন্নত দোয়াটি ছেড়ে দেন। সুন্নতের পূর্ণ অনুসরণের জন্য আমাদের এই সহিহ দোয়াটি মুখস্থ করে আমল করা উচিত।

প্রশ্নোত্তর (FAQ)

১. জাহাবাজ জামাউ দোয়াটি কখন পড়তে হয়? ইফতারের আগে নাকি পরে?

এই দোয়াটি ইফতার শুরু করার ঠিক পরে পড়তে হয়। অর্থাৎ, প্রথমে 'বিসমিল্লাহ' বলে পানি বা খেজুর খেয়ে রোজা ভাঙবেন, তারপর তৃষ্ণা উপশম হলে এই দোয়াটি পাঠ করবেন। কারণ দোয়ার অর্থ হলো 'তৃষ্ণা দূর হলো', যা ইফতার করার পরই কেবল সম্ভব।

২. 'আল্লাহুম্মা লাকা সুমতু' দোয়াটি পড়া কি জায়েজ নয়?

এই দোয়াটি সুনানে আবু দাউদে মুরসাল সনদে বর্ণিত হয়েছে, যা মুহাদ্দিসগণের নিকট দুর্বল বা জয়িফ। এটি পড়া একেবারে নাজায়েজ বা গুনাহের কাজ নয়, তবে এর চেয়ে 'জাহাবাজ জামাউ' দোয়াটি পড়া অনেক বেশি উত্তম ও সুন্নতসম্মত, কারণ এর সনদ সহিহ ও হাসান স্তরের।

৩. নফল রোজার ইফতারেও কি এই দোয়া পড়া যাবে?

হ্যাঁ, রমজানের ফরজ রোজা হোক কিংবা যেকোনো নফল বা কাজা রোজা—সব ধরনের রোজা ইফতার করার সময়ই এই দোয়াটি পাঠ করা সুন্নত।

৪. দোয়াটির শেষে 'ইনশাআল্লাহ' কেন বলা হয়েছে?

এখানে 'ইনশাআল্লাহ' বলার উদ্দেশ্য হলো আল্লাহর ইচ্ছার প্রতি বিনয় ও আশা প্রকাশ করা। বান্দা নিজের ইবাদতের ওপর অহংকার না করে আল্লাহর দয়া ও কবুলিয়তের ওপর ভরসা রাখছে—এটিই এর মূল তাৎপর্য।

রেফারেন্স (References)

কুরআন ও হাদিসের উৎস

আব্দুর রহমান

আব্দুর রহমান

এসইও স্পেশালিস্ট ও কনটেন্ট রাইটার

আব্দুর রহমান একজন এসইও স্পেশালিস্ট এবং ইসলামিক কনটেন্ট রাইটার। তিনি ফিকহ, দৈনন্দিন ইবাদত, নামাজ, পারিবারিক দিকনির্দেশনা এবং বাস্তব মুসলিম জীবনধারা নিয়ে সহজ প্রবন্ধ লেখেন, যাতে পাঠকরা প্রতিদিনের জীবনে ইসলাম অনুসরণ করতে পারেন।

আপডেট থাকুন

আমাদের সর্বশেষ আপডেট ও রিলিজ মিস করবেন না