ভ্রমণের দোয়া: সহিহ হাদিসের আলোকে সফরের সুন্নাহসম্মত জিকির ও আদব

আব্দুর রহমান
আব্দুর রহমান
১২ জুল, ২০২৬দোয়া ও জিকির

মানবজীবনে বিভিন্ন প্রয়োজনে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাতায়াত বা সফর করতে হয়। ইসলামে সফরকে কেবল একটি জাগতিক কাজ হিসেবে দেখা হয়নি, বরং একে ইবাদতে পরিণত করার সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সফর শুরুর আগে, পথিমধ্যে এবং সফর থেকে ফেরার সময় আল্লাহর স্মরণ ও রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর শেখানো দোয়া পাঠ করা অত্যন্ত বরকতময় আমল। এই জিকির ও দোয়াগুলো একজন মুমিনকে সফরের ক্লান্তি ও আকস্মিক বিপদ-আপদ থেকে আল্লাহর হেফাজতে রাখে। এই নিবন্ধে আমরা সহিহ হাদিসের আলোকে সফরের গুরুত্বপূর্ণ দোয়া ও আদবসমূহ বিস্তারিত আলোচনা করব।

সফরের গুরুত্ব ও দোয়া কবুলের বিশেষ মুহূর্ত

ইসলামি শরিয়তে সফর একটি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থা। সফরের সময় মানুষের মন সাধারণত নরম থাকে এবং আল্লাহর প্রতি নির্ভরতা বাড়ে। রাসুলুল্লাহ (সা.) সফরকে কষ্টের একটি অংশ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তবে এই কষ্টকে সওয়াবে পরিণত করার চমৎকার সুযোগ রয়েছে। মুসাফিরের (ভ্রমণকারী) দোয়া আল্লাহর দরবারে বিশেষভাবে কবুল হয়, যতক্ষণ না সে কোনো পাপ বা আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করার দোয়া করে। তাই সফরের পুরোটা সময় জিকির ও ইস্তিগফারে কাটানো উচিত।

১. যানবাহনে আরোহণের পর এবং সফর শুরুর দোয়া

যেকোনো যানবাহনে (তা গাড়ি, ট্রেন, উড়োজাহাজ বা নৌকা যাই হোক না কেন) বসার পর স্থির হয়ে প্রথমে তিনবার ‘আল্লাহু আকবার’ বলা এবং এরপর পবিত্র কুরআনের সুনির্দিষ্ট আয়াত সংবলিত এই দোয়াটি পাঠ করা সুন্নাহ:

سُبْحَانَ الَّذِي سَخَّرَ لَنَا هَذَا وَمَا كُنَّا لَهُ مُقْرِنِينَ وَإِنَّا إِلَى رَبِّنَا لَمُنْقَلِبُونَ

উচ্চারণ: সুবহানাল্লাজি সাখখারা লানা হাজা ওয়া মা কুন্না লাহু মুকরিনিন, ওয়া ইন্না ইলা রাব্বিনা লামুনকালিবুন।

অনুবাদ: পবিত্র তিনি যিনি আমাদের জন্য একে (যানবাহনকে) বশীভূত করে দিয়েছেন, অথচ আমরা একে বশীভূত করতে সমর্থ ছিলাম না। আর আমরা অবশ্যই আমাদের প্রতিপালকের দিকে প্রত্যাবর্তনকারী।

এই দোয়াটি পাঠের মাধ্যমে মুমিন ব্যক্তি আল্লাহর অসীম নিয়ামতের শুকরিয়া আদায় করে এবং একই সাথে স্মরণ করে যে, পার্থিব এই সফরের চেয়েও পরকালের চূড়ান্ত সফর অনেক বেশি বাস্তব।

২. সফরকালীন দীর্ঘ ও ব্যাপক অর্থবোধক দোয়া

সফরের আনুষ্ঠানিক সূচনায় রাসুলুল্লাহ (সা.) আল্লাহর কাছে নিরাপত্তা, তাকওয়া এবং সফলতার জন্য একটি দীর্ঘ ও অত্যন্ত বরকতময় দোয়া পড়তেন। মুসাফিরের জন্য এই দোয়াটি পড়া অত্যন্ত জরুরি:

اللَّهُمَّ إِنَّا نَسْأَلُكَ فِي سَفَرِنَا هَذَا الْبِرَّ وَالتَّقْوَى، وَمِنَ الْعَمَلِ مَا تَرْضَى، اللَّهُمَّ هَوِّنْ عَلَيْنَا سَفَرَنَا هَذَا وَاطْوِ عَنَّا بُعْدَهُ، اللَّهُمَّ أَنْتَ الصَّاحِبُ فِي السَّفَرِ، وَالْخَلِيفَةُ فِي الْأَهْلِ

উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা ইন্না নাসআলুকা ফি সাফারিনা হাজাল বিররা ওয়াত্তাকওয়া, ওয়া মিনাল আমালি মা তারদা। আল্লাহুম্মা হাওউইন আলাইনা সাফারানা হাজা ওয়াতউই আন্না বু’দাহু। আল্লাহুম্মা আনতাস সাহিবু ফিস সাফারি, ওয়াল খালিফাতু ফিল আহলি।

অনুবাদ: হে আল্লাহ! আমরা আমাদের এই সফরে তোমার কাছে পুণ্য ও তাকওয়া প্রার্থনা করছি এবং এমন আমল চাচ্ছি যা তুমি পছন্দ কর। হে আল্লাহ! আমাদের জন্য এই সফর সহজ করে দাও এবং এর দূরত্ব আমাদের জন্য সংকুচিত করে দাও। হে আল্লাহ! তুমিই সফরে আমাদের সঙ্গী এবং আমাদের অনুপস্থিতিতে পরিবারের দেখাশোনাকারী।

৩. সফর থেকে ফিরে আসার দোয়া

সফর শেষ করে যখন কেউ নিজের দেশে বা বাড়িতে ফিরে আসবে, তখনও আল্লাহর প্রশংসা করা সুন্নাহ। রাসুলুল্লাহ (সা.) সফর থেকে ফেরার পথে পূর্বোক্ত দোয়াসমূহের সাথে অতিরিক্ত হিসেবে এই বিশেষ অংশটুকু বারবার পাঠ করতেন:

آيِبُونَ تَائِبُونَ عَابِدُونَ لِرَبِّنَا حَامِدُونَ

উচ্চারণ: আয়িবুনা, তায়িবুনা, আবিদুনা, লিরাব্বিনা হামিদুন।

অনুবাদ: আমরা প্রত্যাবর্তনকারী, তওবাকারী, ইবাদতকারী এবং আমাদের রবেরই প্রশংসাকারী।

৪. সফরের পথিমধ্যে উঁচু-নিচু স্থানে আরোহণের জিকির

ভ্রমণের সময় রাস্তা বা পথ সবসময় সমতল থাকে না। কখনো পাহাড় বা উড়ালসেতু দিয়ে ওপরে উঠতে হয়, আবার কখনো নিচে নামতে হয়। সাহাবি জাবের ইবনে আব্দুল্লাহ (রা.) বর্ণনা করেন যে, আমরা যখন সফরে কোনো উঁচু স্থানে আরোহণ করতাম, তখন ‘আল্লাহু আকবার’ (আল্লাহ মহান) বলতাম। আর যখন নিচু উপত্যকায় নামতাম, তখন ‘সুবহানাল্লাহ’ (আল্লাহ পবিত্র) বলতাম। এটি সফরের একটি অত্যন্ত সহজ কিন্তু সওয়াববহুল সুন্নাহ আমল।

সফরের সাধারণ আদব ও বর্জনীয় ভুলসমূহ

সফরকে নিরাপদ ও ইবাদতে পরিগণিত করতে হলে কিছু শরয়ী আদব মেনে চলা প্রয়োজন:

  • সফরের পূর্বে ইস্তিখারা ও পরামর্শ: যেকোনো গুরুত্বপূর্ণ সফরে বের হওয়ার আগে আল্লাহর কাছে কল্যাণ চেয়ে ইস্তিখারা করা এবং অভিজ্ঞদের সাথে পরামর্শ করা উচিত।
  • পাপের উদ্দেশ্যে সফর না করা: ইসলামে কেবল বৈধ ও নেক উদ্দেশ্যে সফরের অনুমতি রয়েছে। কোনো পাপ কাজ বা নিষিদ্ধ স্থানে যাওয়ার উদ্দেশ্যে সফর করলে আল্লাহর সাহায্য পাওয়া যায় না।
  • সালাত কসর ও জমা করা: শরিয়ত নির্ধারিত দূরত্ব (সাধারণত ৪৮ মাইল বা প্রায় ৭৮ কিলোমিটার) সফর করলে চার রাকাত বিশিষ্ট ফরজ সালাত দুই রাকাত (কসর) পড়া ওয়াজিব। এছাড়া বিশেষ প্রয়োজনে দুই ওয়াক্তের সালাত একত্রে (জমা) পড়ার সুযোগও সহিহ হাদিস দ্বারা প্রমাণিত।
  • ভুল উচ্চারণ পরিহার: আরবি দোয়াগুলো পড়ার সময় অর্থ বিকৃতির হাত থেকে বাঁচতে সঠিক মাখরাজ ও উচ্চারণ শেখা আবশ্যক। মুখস্থ না থাকলে বই বা মোবাইল স্ক্রিন দেখে দেখে বিশুদ্ধভাবে পড়া উত্তম।

উপসংহার

সফর কেবল এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাওয়ার মাধ্যম নয়, বরং এটি আল্লাহর কুদরত ও সৃষ্টির বিশালতা দেখার একটি সুযোগ। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর নির্দেশিত সুন্নাহ জিকির ও দোয়াগুলোর মাধ্যমে সফরকে রাঙিয়ে তুললে তা যেমন দুনিয়াবি বিপদ থেকে রক্ষা করে, তেমনি আখেরাতের আমলনামায় বিপুল সওয়াব যুক্ত করে। তাই প্রতিটি মুসলিমের উচিত এই বরকতময় সুন্নাহগুলো নিজে আমল করা এবং পরিবার পরিজনকে শিক্ষা দেওয়া।

তথ্যসূত্র

কুরআনের আয়াত

হাদিস

  • সহীহ মুসলিম, হাদিস ১৩৪৫ — সফর থেকে ফেরার দোয়া ও তাসবিহ সংক্রান্ত বর্ণনা।
  • সহীহ বুখারী, হাদিস ২৯৯৩ (অধ্যায়: জিহাদ ও সফর) — উঁচু স্থানে তাকবির ও নিচু স্থানে তাসবিহ পাঠের সুন্নাহ।
  • সুনানে আবু দাউদ, হাদিস ২৬০২ (অধ্যায়: জিহাদ) — যানবাহনে ওঠার পর রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর আমল ও দোয়া।
  • সুনানে তিরমিযী, হাদিস ৩৪২২ (অধ্যায়: দোয়াসমূহ) — সফরকালীন দীর্ঘ দোয়ার বিবরণ (ইমাম তিরমিযী কর্তৃক হাসান সহীহ ও আল-আলবানী কর্তৃক সহীহ Grading প্রাপ্ত)।

সফরের দোয়া না পড়লে কি কোনো গুনাহ হবে?

সফরের বিভিন্ন দোয়া ও জিকির পাঠ করা রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহ। এটি ফরয বা ওয়াজিব নয়। তাই কেউ যদি এই দোয়া না পড়ে, তবে তার কোনো গুনাহ বা পাপ হবে না। তবে সে সফরের বরকত, নিরাপত্তা এবং একটি গুরুত্বপূর্ণ সুন্নাহর বিপুল সওয়াব থেকে বঞ্চিত হবে।

আধুনিক যানবাহন যেমন বিমান বা ট্রেনে ভ্রমণের সময় কি এই দোয়া প্রযোজ্য?

হ্যাঁ, অবশ্যই। ইসলাম একটি সার্বজনীন জীবনব্যবস্থা। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর যুগে উট, ঘোড়া বা গাধা যানবাহন হিসেবে ব্যবহৃত হতো। আধুনিক যুগে বিমান, ট্রেন, বাস বা প্রাইভেটকার—সবই যানবাহনের অন্তর্ভুক্ত। তাই যেকোনো আধুনিক বাহনে আরোহণের সময়ও এই একই সুন্নাহ দোয়া ও জিকির প্রযোজ্য হবে।

মুসাফিরের দোয়া কবুল হওয়ার বিশেষ কারণ কী?

সফরের সময় মানুষ সাধারণত নিজের চেনা পরিবেশ, পরিবার এবং স্বাচ্ছন্দ্য থেকে দূরে থাকে। ফলে তার অন্তরে এক ধরনের অসহায়ত্ব ও আল্লাহর প্রতি পরম নির্ভরশীলতা (তাওয়াক্কুল) তৈরি হয়। অন্তরের এই একাগ্রতা ও বিনম্র অবস্থার কারণেই আল্লাহ তাআলা মুসাফিরের দোয়াকে বিশেষভাবে মূল্যায়ন করেন এবং তা দ্রুত কবুল করেন।

আব্দুর রহমান

আব্দুর রহমান

এসইও স্পেশালিস্ট ও কনটেন্ট রাইটার

আব্দুর রহমান একজন এসইও স্পেশালিস্ট এবং ইসলামিক কনটেন্ট রাইটার। তিনি ফিকহ, দৈনন্দিন ইবাদত, নামাজ, পারিবারিক দিকনির্দেশনা এবং বাস্তব মুসলিম জীবনধারা নিয়ে সহজ প্রবন্ধ লেখেন, যাতে পাঠকরা প্রতিদিনের জীবনে ইসলাম অনুসরণ করতে পারেন।

আপডেট থাকুন

আমাদের সর্বশেষ আপডেট ও রিলিজ মিস করবেন না