দৈনন্দিন প্রয়োজনে বা দীর্ঘ ভ্রমণে আমাদের প্রায়ই বাইরে যেতে হয় এবং কাজ শেষে আমরা নিজ নিজ নীড়ে ফিরে আসি। ইসলামে শুধু ঘর থেকে বের হওয়ার সময়ই নয়, বরং নিরাপদে বাড়ি ফেরার সময়ও আল্লাহর কৃতজ্ঞতা আদায় ও বিশেষ দোয়া পাঠের সুনির্দিষ্ট সুন্নাহ রয়েছে। সফর শেষে নিজের বাড়িতে ফিরে আসা মহান আল্লাহর এক বিশাল নিয়ামত। রাসূলুল্লাহ (সা.) যখনই কোনো সফর বা কাজ শেষে বাড়ি ফিরতেন, তখন মহান আল্লাহর প্রশংসা করতেন এবং বিশেষ কিছু দোয়া পাঠ করতেন। এই দোয়াগুলো পাঠ করলে ঘরে বরকত নাযিল হয়, শয়তানের কুপ্রভাব থেকে পরিবার সুরক্ষিত থাকে এবং আত্মিক প্রশান্তি লাভ হয়। নিচে বাড়ি ফেরার সুন্নতি দোয়াসমূহ, অর্থ ও এর সঠিক আমল বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।
বাড়ি ফেরার সময় পড়ার সুন্নাহ দোয়াসমূহ
১. সফর শেষে এলাকায় বা বাড়িতে পৌঁছানোর দোয়া
যখন কোনো ব্যক্তি দীর্ঘ সফর শেষে নিজের শহর বা নিজ বাড়ির কাছাকাছি পৌঁছাবে, তখন রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহ হলো এই দোয়াটি বারবার পাঠ করা:
উচ্চারণ: আইবুনা, তাইবুনা, আবিদুনা, লিরাব্বিনা হামিদুন।
অনুবাদ: আমরা ফিরে এসেছি, তাওবাকারী হিসেবে, ইবাদতকারী হিসেবে এবং আমাদের প্রতিপালকের প্রশংসাকারী হিসেবে।
হাদিস শরিফে এসেছে, রাসূলুল্লাহ (সা.) যখন কোনো যুদ্ধ বা হজ্জ-উমরাহ্র সফর থেকে ফিরে আসতেন, তখন তিনবার তাকবীর (আল্লাহু আকবার) বলতেন এবং তারপর এই দোয়াটি পাঠ করতেন (সহীহ বুখারী, হাদিস ৩০৮৫)।
২. ঘরে প্রবেশের সময় পাঠ করার দোয়া
সফর থেকে ফিরে কিংবা প্রতিদিনের সাধারণ কাজ শেষে যখন কেউ নিজের ঘরের দরজায় পৌঁছাবে, তখন আল্লাহর নাম নিয়ে ঘরে প্রবেশ করা সুন্নত। সুনান আবু দাউদের একটি বর্ণনায় ঘরে প্রবেশের এই দোয়াটি বর্ণিত হয়েছে:
উচ্চারণ: বিসমিল্লাহি ওয়ালাজনা, ওয়া বিসমিল্লাহি খারাজনা, ওয়া আলাল্লাহি রাব্বিনা তাওয়াক্কালনা।
অনুবাদ: আল্লাহর নামে আমরা প্রবেশ করলাম, আল্লাহর নামে আমরা বের হলাম এবং আমাদের প্রতিপালক আল্লাহর ওপরই আমরা ভরসা করলাম।
এই দোয়াটি পাঠ করার পর পরিবারের সদস্যদের সালাম দেওয়া সুন্নত। তবে মনে রাখতে হবে, এই হাদিসটির (সুনান আবু দাউদ, হাদিস ৫০৯৬) সনদ নিয়ে মুহাদ্দিসগণের মাঝে কিছুটা শাস্ত্রীয় আলোচনা থাকলেও রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সাধারণ নির্দেশনা হলো—ঘরে ঢোকার সময় আল্লাহর নাম নেওয়া এবং সালাম দেওয়া। সহীহ মুসলিমের হাদিসে এসেছে, মানুষ যখন ঘরে প্রবেশের সময় এবং খাবার খাওয়ার সময় আল্লাহর নাম স্মরণ করে, তখন শয়তান তার সঙ্গীদের বলে, "তোমাদের জন্য এখানে রাত্রিযাপন ও নৈশভোজের কোনো সুযোগ নেই" (সহীহ মুসলিম, হাদিস ২০২৩)।
সফর থেকে ফেরার কিছু গুরুত্বপূর্ণ সুন্নাহ আমল
বাড়ি ফেরার সময় শুধু মুখে দোয়া পড়াই যথেষ্ট নয়, বরং আল্লাহর রাসূল (সা.)-এর কিছু চমৎকার ব্যবহারিক সুন্নাহ রয়েছে যা আমাদের অনুসরণ করা উচিত:
- মসজিদে দুই রাকাত সালাত আদায়: দীর্ঘ সফর থেকে ফিরে সরাসরি ঘরে না গিয়ে মহল্লার মসজিদে গিয়ে দুই রাকাত নফল নামাজ আদায় করা রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর অন্যতম প্রধান সুন্নাহ ছিল (সহীহ বুখারী, হাদিস ৩০৮৮)।
- পরিবারকে আগে থেকে জানিয়ে আসা: গভীর রাতে হুট করে বা পরিবারকে না জানিয়ে সফর থেকে ঘরে ফেরা অপছন্দনীয়। রাসূলুল্লাহ (সা.) রাতে অতর্কিত ঘরে প্রবেশ করতে নিষেধ করেছেন, যাতে ঘরের মানুষ গুছিয়ে নেওয়ার সুযোগ পায়।
- সালাম বিনিময় ও কুশল বিনিময়: ঘরে প্রবেশ করেই উচ্চকণ্ঠে 'আসসালামু আলাইকুম' বলা। এটি ঘরের বরকত বৃদ্ধি করে এবং শয়তানকে দূরে রাখে।
দোয়া ও আমলের ক্ষেত্রে প্রচলিত কিছু ভুল ধারণা
আমাদের সমাজে অনেকে মনে করেন, এসব দোয়া কেবল দীর্ঘ বা দূরপাল্লার সফর (যেমন বিদেশ ভ্রমণ বা অন্য জেলায় যাওয়া) থেকে ফেরার জন্যই নির্ধারিত। প্রকৃতপক্ষে, প্রতিদিন কাজের উদ্দেশ্যে বাইরে গিয়ে ঘরে ফেরার সময়ও আল্লাহর নাম নেওয়া ও সালাম দেওয়ার বিধান রয়েছে। আরেকটি ভুল হলো, দোয়ার মূল আত্মিক দিকটি ভুলে শুধু তোতাপাখির মতো শব্দ উচ্চারণ করা। দোয়া পড়ার সময় অন্তরে আল্লাহর প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা এবং তাঁর তাওফীকের কথা স্মরণ রাখা উচিত, কারণ তিনি চাইলে যেকোনো সময় পথে দুর্ঘটনা ঘটতে পারত।
তথ্যসূত্র
হাদিস
- সহীহ বুখারী, হাদিস ৩০৮৫ (অধ্যায়: জিহাদ) — সফর থেকে ফেরার সময় 'আইবুনা তাইবুনা...' দোয়া পাঠের প্রামাণ্য বর্ণনা।
- সহীহ মুসলিম, হাদিস ২০২৩ (অধ্যায়: পানীয় ও খাবার) — ঘরে প্রবেশের সময় আল্লাহর নাম স্মরণ করার ফজিলত এবং শয়তানের বঞ্চিত হওয়ার বিবরণ।
- সহীহ বুখারী, হাদিস ৩০৮৮ (অধ্যায়: জিহাদ) — সফর থেকে প্রত্যাবর্তন করে প্রথমে মসজিদে গিয়ে দুই রাকাত সালাত আদায়ের সুন্নাহ।
- সুনান আবু দাউদ, হাদিস ৫০৯৬ (অধ্যায়: আদব) — ঘরে প্রবেশের সময় পঠিত দোয়া এবং সালাম দেওয়ার নিয়ম।

