আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থায় বিমান ভ্রমণ অত্যন্ত সাধারণ ও জনপ্রিয় মাধ্যম। ইসলামের সৌন্দর্য হলো, মানুষের জীবনযাত্রার প্রতিটি স্তরেই আল্লাহর স্মরণ ও কল্যাণের চমৎকার বিধান রয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সা.) যখনই কোনো সফরে বের হতেন, নির্দিষ্ট কিছু ইবাদত, জিকির ও দোয়ার মাধ্যমে আল্লাহর দরবারে আত্মসমর্পণ করতেন। প্রাচীন যুগের উট কিংবা ঘোড়ার মতো সমকালীন বিমান সফরের ক্ষেত্রেও এই সুন্নতি দোয়া ও আমলসমূহ সমভাবে প্রযোজ্য। বিমানে আরোহণের সময় আল্লাহর নাম নিয়ে দোয়া পাঠ করলে সফর যেমন নিরাপদ হয়, তেমনি তা ইবাদতে পরিণত হয়। নিচে বিমান ভ্রমণের বিভিন্ন পরিস্থিতি অনুযায়ী দোয়া ও আমলসমূহ বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।
বিমান ভ্রমণের সুন্নাহ দোয়া সমূহ
১. বিমানে আরোহণের দোয়া (যাত্রার শুরুতে)
বিমানে নিজের আসনে বসার পর স্থির হয়ে প্রথমে 'বিসমিল্লাহ' এবং 'আলহামদুলিল্লাহ' বলতে হবে। এরপর পবিত্র কুরআনের সূরা আজ-জুখরুফ, আয়াত ১৩-১৪ এর অংশবিশেষ সম্বলিত এই সুন্নতি দোয়াটি পাঠ করতে হবে:
উচ্ছারণ: সুবহানাল্লাজি সাখখারা লানা হাজা ওয়া মা কুন্না লাহু মুকরিনিন, ওয়া ইন্না ইলা রাব্বিনা লামুনকালিবুন।
অনুবাদ: পবিত্র তিনি যিনি আমাদের জন্য এ বাহনকে অধীন করে দিয়েছেন, অন্যথায় আমরা একে বশীভূত করতে সক্ষম ছিলাম না। আর আমরা অবশ্যই আমাদের প্রতিপালকের কাছে ফিরে যাব।
এখানে মনে রাখা প্রয়োজন যে, বুখারীর বর্ণনায় সওয়ারিতে চড়ার সময় সাধারণ তাকবীর ও তাসবীহ এবং সহীহ মুসলিমের বর্ণনায় মূল দোয়ার বিবরণ এসেছে।
২. সফরের মূল দীর্ঘ দোয়া (সফরের সময়)
বিমানে আরোহণের পর যখন বিমানটি গতিশীল হয় বা আকাশে ওড়ার প্রস্তুতি নেয়, তখন রাসূলুল্লাহ (সা.) তিনবার 'আল্লাহু আকবার' বলতেন এবং এই বিস্তারিত দোয়াটি পাঠ করতেন। সহীহ মুসলিমের বর্ণনা অনুযায়ী দোয়াটি নিচে দেওয়া হলো:
উচ্ছারণ: আল্লাহুম্মা ইন্না নাসআলুকা ফী সাফারিনা হাজাল বিররা ওয়াত-তাকওয়া, ওয়া মিনাল আমালি মা তারদা। আল্লাহুম্মা হাওউইন আলাইনা সাফারানা হাজা ওয়াতউই আন্না বু'দাহু। আল্লাহুম্মা আনতাস সাহিবু ফিস সাফারি ওয়াল খালিফাতু ফিল আহলি। আল্লাহুম্মা ইন্নি আউযুবিকা মিন ওয়া'ছায়িস সাফারি ওয়া কাআবাতিল মানজারি ওয়া সূইল মুনকালাবি ফিল মালি ওয়াল আহলি।
অনুবাদ: হে আল্লাহ! আমরা আমাদের এই সফরে আপনার কাছে কল্যাণ ও তাকওয়া প্রার্থনা করছি এবং এমন আমল চাচ্ছি যা আপনি পছন্দ করেন। হে আল্লাহ! আমাদের জন্য এই সফর সহজ করে দিন এবং এর দূরত্বকে সংকুচিত করে দিন। হে আল্লাহ! আপনিই সফরের সঙ্গী এবং পরিবারের অভিভাবক। হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে সফরের কষ্ট-ক্লেশ, ভয়াবহ দৃশ্য এবং পরিবার ও সম্পদের শোচনীয় অবস্থা থেকে আশ্রয় চাচ্ছি।
সূত্র: সহীহ মুসলিম, হাদিস নং ১৩৪২।
৩. গন্তব্যে পৌঁছার বা বিমান থেকে নামার দোয়া
বিমান যখন নির্দিষ্ট এয়ারপোর্টে অবতরণ করবে এবং আপনি গন্তব্যে পৌঁছাবেন, তখন আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতাস্বরূপ রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর শেখানো এই দোয়াটি পড়া উচিত:
উচ্ছারণ: আউজু বিকালিমাতিল্লাহিত তামমাতি মিন শাররি মা খালাক।
অনুবাদ: আল্লাহর পরিপূর্ণ বাণীসমূহের উসিলায় আমি তাঁর সৃষ্টির যাবতীয় অনিষ্ট থেকে আশ্রয় চাচ্ছি।
হাদিস শরিফে এসেছে, যে ব্যক্তি কোনো মনজিলে বা গন্তব্যে অবতরণ করে এই দোয়া পাঠ করবে, সেখান থেকে প্রস্থান করা পর্যন্ত কোনো কিছুই তার ক্ষতি করতে পারবে না (সহীহ মুসলিম, হাদিস নং ২৭০৮)।
বিমানে যাতায়াতের সময় কিছু সুন্নাহ আমল ও আদব
আকাশ ভ্রমণের সময় মুমিনদের জন্য কিছু গুরুত্বপূর্ণ আমল ও আদব রয়েছে, যা সফরকে ইবাদতে পরিণত করে:
- তাকবীর ও তাসবীহ পাঠ: সওয়ারি বা বিমান যখন আকাশের দিকে ওপরের দিকে উঠতে থাকবে, তখন 'আল্লাহু আকবার' (আল্লাহ মহান) বলা সুন্নত। আবার বিমান যখন নিচের দিকে নামতে থাকবে, তখন 'সুবহানাল্লাহ' (আল্লাহ পবিত্র) বলা সুন্নত (সহীহ বুখারী, হাদিস ২৯৯৩)।
- ফরজ সালাতের খেয়াল রাখা: দীর্ঘ বিমান ভ্রমণের সময় অনেকেই সালাত বা নামাজ কাজা করে ফেলেন, যা একটি বড় গুনাহ। বিমানে সিটে বসেই ইশারায় হলেও সময়মতো ওয়াক্তিয়া সালাত আদায় করে নিতে হবে। প্রয়োজনে বিমানের ক্রুদের থেকে কিবলার দিক জেনে নেওয়া যেতে পারে।
- জিকির ও ইস্তিগফার: সফরের সময় দোয়া কবুল হয়। তাই বিমানে থাকাকালীন গল্পগুজব বা অনৈসলামিক বিনোদনে মত্ত না থেকে জিকির, ইস্তিগফার এবং বেশি বেশি ব্যক্তিগত দোয়া করা উচিত।
তথ্যসূত্র
কুরআনিক আয়াত
- সূরা আজ-জুখরুফ, ৪৩:১৩-১৪ — সওয়ারি বা বাহনে আরোহণের সময় আল্লাহর নিয়ামতের তাসবীহ পাঠের মূল নির্দেশ।
হাদিস
- সহীহ মুসলিম, হাদিস ১৩৪২ (অধ্যায়: হজ্জ) — বাহনে আরোহণের এবং সফরের সুদীর্ঘ সুন্নতি দোয়ার মূল প্রামাণ্য ভিত্তি।
- সহীহ বুখারী, হাদিস ২৯৯৩ (অধ্যায়: জিহাদ) — উচ্চ ভূমিতে ওঠার সময় তাকবীর এবং নিচে নামার সময় তাসবীহ পাঠের সুন্নাহ।
- সহীহ মুসলিম, হাদিস ২৭০৮ (অধ্যায়: জিকির ও দোয়া) — নতুন স্থানে বা গন্তব্যে অবতরণের পর নিরাপত্তার দোয়া ও তার ফজিলত।
- সুনান আবু دাউদ, হাদিস ২৬০২ (অধ্যায়: জিহাদ) — বাহনে স্থির হয়ে বসার পর রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর আমল ও হাসির প্রসঙ্গ।

