জানাজার নামাজ মূলত মৃত ব্যক্তির জন্য শেষ বিদায়ের এক বিশেষ প্রার্থনা বা সুপারিশ। ইসলামের বিধান অনুযায়ী জানাজার নামাজ আদায় করা ফরজে কেফায়া। এই নামাজে কোনো রুকু বা সিজদা নেই; বরং চার তাকবিরের মাধ্যমে দাঁড়িয়ে মৃত ব্যক্তির মাগফিরাত ও রহমতের জন্য আল্লাহর দরবারে দুআ করা হয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) জানাজার নামাজে মৃত ব্যক্তির জন্য অত্যন্ত আকুলভাবে দুআ করতেন এবং সাহাবিদের তা শিক্ষা দিয়েছেন। এই নিবন্ধে আমরা প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ-নারী এবং অপ্রাপ্তবয়স্ক শিশুর জানাজার নামাজের সহিহ ও প্রামাণিক দুআসমূহ আরবি, বাংলা উচ্চারণ ও অর্থসহ বিস্তারিত আলোচনা করব।
জানাজার নামাজে দুআ করার গুরুত্ব ও শর্তাবলি
জানাজার নামাজের মূল উদ্দেশ্যই হলো মৃত ব্যক্তির জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা ও রহমতের সুপারিশ করা। রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, যখন তোমরা কোনো মৃতের জানাজার নামাজ আদায় করবে, তখন তার জন্য অত্যন্ত নিষ্ঠা ও আন্তরিকতার সাথে দুআ করবে। তবে মনে রাখা প্রয়োজন, ইসলামের দৃষ্টিতে এই মাগফিরাত বা ক্ষমার দুআ কেবল একজন মুসলিমের জন্যই প্রযোজ্য। কোনো অমুসলিম বা কুফরি ও শিরকের ওপর মৃত্যুবরণকারী ব্যক্তির জন্য জানাজা পড়া বা ক্ষমার দুআ করার কোনো অনুমতি ইসলামে নেই। এছাড়াও জানাজার দুআ কবুলের জন্য উপস্থিত মুসল্লিদের অন্তরের ইখলাস বা নিষ্ঠা অত্যন্ত জরুরি।
প্রাপ্তবয়স্কদের জানাজার নামাজের সহিহ দুআ সমূহ
জানাজার নামাজে তৃতীয় তাকবিরের পর মৃত ব্যক্তির জন্য দুআ করা সুন্নত। রাসুলুল্লাহ (সা.) থেকে একাধিক বিশুদ্ধ দুআ প্রমাণিত রয়েছে। তার মধ্যে অন্যতম দুটি প্রসিদ্ধ দুআ নিচে দেওয়া হলো:
১. সর্বসাধারণের জন্য ক্ষমা প্রার্থনার বিস্তৃত দুআ
এই দুআটিতে উপস্থিত-অনুপস্থিত, জীবিত-মৃত এবং সমাজের সকল স্তরের মুসলিমের জন্য সামগ্রিক মাগফিরাত কামনা করা হয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) জানাজায় এই দুআটি পাঠ করতেন।
উচ্চারণ: আল্লাহুম্মাগফির লিহায়্যিনা ওয়া মাইয়িতিনা ওয়া শাহিদিনা ওয়া গাইবিনা ওয়া সাগীরিনা ওয়া কাবীরিনা ওয়া যাকারিনা ওয়া উনছানা। আল্লাহুম্মা মান আহইয়াইতাহু মিন্না ফাআহয়িহি ‘আলাল ইসলাম, ওয়া মান তাওয়াফফাইতাহু মিন্না ফাতাওয়াফ্ফাহু ‘আলাল ঈমান।
অনুবাদ: হে আল্লাহ! আমাদের জীবিত ও মৃত, উপস্থিত ও অনুপস্থিত, ছোট ও বড় এবং আমাদের পুরুষ ও নারীদের ক্ষমা করুন। হে আল্লাহ! আমাদের মধ্যে আপনি যাকে জীবিত রাখেন তাকে ইসলামের ওপর জীবিত রাখুন, আর যাকে মৃত্যু দান করেন তাকে ঈমানের ওপর মৃত্যু দান করুন।
এই সহিহ দুআটি সুনানে আবু দাউদ, হাদিস ৩২০১ এবং সুনানে তিরমিযী, হাদিস ১০২৪-এ বর্ণিত হয়েছে।
২. মৃত ব্যক্তির জন্য রহমত ও কবরের আজাব থেকে মুক্তির বিশেষ দুআ
জানাজার নামাজে রাসুলুল্লাহ (সা.) এই দুআটিও অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে পাঠ করতেন। সাহাবি আওফ ইবনে মালিক (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে জানাজায় এই দুআটি পড়তে শুনে আমার মনে আকাঙ্ক্ষা জেগেছিল—হায়! এই মৃত ব্যক্তিটি যদি আমি হতাম!
উচ্চারণ: আল্লাহুম্মাগফির লাহু ওয়ারহামহু ওয়া ‘আফিহি ওয়াফু ‘আনহু ওয়া আকরিম নুযুলাহু ওয়া ওয়াসসি‘ মুদখালাহু ওয়াগসিলহু বিল-মায়ি ওয়াছ-ছালজি ওয়াল-বারাদি ওয়া নাক্কিহি মিনাল খাতায়া কামা নাক্কাইতাছ-ছাওবাল আবয়াদ্বা মিনাদ-দানাস। ওয়া আবদিলহু দ রান খাইরাম-মিন দ রিহি ওয়া আহলান খাইরাম-মিন আহলিহি ওয়া যাওজান খাইরাম-মিন যাওজিহি ওয়া আদখিলহুল জান্নাতা ওয়া আ‘ইযহু মিন ‘আযাবিল ক্বাবরি আও মিন ‘আযাবিন-নার।
অনুবাদ: হে আল্লাহ! আপনি তাকে ক্ষমা করুন, তার প্রতি দয়া করুন, তাকে পূর্ণ নিরাপত্তায় রাখুন, তার অপরাধসমূহ মার্জনা করুন। তার আতিথেয়তাকে মর্যাদাপূর্ণ করুন, তার প্রবেশস্থল (কবর) প্রশস্ত করুন। আপনি তাকে পানি, বরফ ও শিলা দিয়ে ধুয়ে পরিষ্কার করে দিন এবং পাপ থেকে তাকে এমনভাবে পরিচ্ছন্ন করুন যেমন সাদা কাপড় ময়লা থেকে পরিচ্ছন্ন করা হয়। তাকে তার দুনিয়ার ঘরের চেয়ে উত্তম ঘর, পরিবারের চেয়ে উত্তম পরিবার ও জীবনসঙ্গীর চেয়ে উত্তম জীবনসঙ্গী দান করুন। তাকে জান্নাতে প্রবেশ করান এবং কবরের আজাব ও জাহান্নামের আজাব থেকে রক্ষা করুন।
এই পরম অনিন্দ্য ও তাৎপর্যপূর্ণ দুআটি সহিহ মুসলিম, হাদিস ৯৬৩-এ বর্ণিত হয়েছে। (মৃত ব্যক্তি নারী হলে সর্বনামগুলো পরিবর্তন করে 'লাহা', 'আরহামহা' ইত্যাদি পড়তে হবে)।
নাবালক শিশু বা বাচ্চার জানাজার দুআ
ইসলামের শরিয়ত অনুযায়ী অপ্রাপ্তবয়স্ক বা নাবালক শিশু নিষ্পাপ অবস্থায় মৃত্যুবরণ করে। তাই তাদের জানাজার নামাজে গুনাহ মাফের কোনো দুআ পড়তে হয় না। বরং তাদের জানাজায় আল্লাহর কাছে দুআ করা হয় যেন এই শিশুটি পরকালে তার পিতা-মাতার জন্য সুপারিশকারী এবং জান্নাতে অগ্রবর্তী পুণ্য হিসেবে গণ্য হয়।
অনুবাদ: হে আল্লাহ! এই শিশুটিকে আমাদের জন্য (জান্নাতে) অগ্রবর্তী পথপ্রদর্শক বানান, তাকে আমাদের জন্য সওয়াব ও জমানো সম্পদ বানান এবং তাকে আমাদের জন্য এমন সুপারিশকারী বানান যার সুপারিশ কবুল করা হবে।
এই আমলটি সম্পর্কে ইমাম বুখারী (র.) তাঁর সহিহ গ্রন্থে অনুচ্ছেদ রচনা করেছেন এবং হাসান বসরী (র.)-এর আমল থেকে এটি সহিহ সনদে প্রমাণিত (সহীহ বুখারী, জানাজা অধ্যায়)।
জানাজার নামাজের সুন্নাহসম্মত নিয়ম ও পদ্ধতি
জানাজার নামাজে ইমাম সাহেব লাশের বক্ষ বরাবর দাঁড়াবেন এবং মুসল্লিগণ পেছনে কাতারবদ্ধ হবেন। জানাজার সালাত আদায়ের সুন্নাহসম্মত ধারাবাহিক ধাপগুলো নিচে দেওয়া হলো:
- প্রথম তাকবির: ইমাম সাহেব প্রথম 'আল্লাহু আকবার' বলে হাত বাঁধবেন। এরপর মনে মনে সানা পাঠ করবেন।
- দ্বিতীয় তাকবির: দ্বিতীয়বার তাকবির বলার পর হাত না ছেড়ে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর প্রতি দরূদে ইব্রাহিম (যা সাধারণ সালাতে আত্তাহিয়্যাতুর পর পড়া হয়) পাঠ করবেন।
- তৃতীয় তাকবির: তৃতীয়বার তাকবির বলার পর উপরে উল্লেখিত সহিহ জানাজার দুআগুলোর মধ্য থেকে যেকোনো একটি বা একাধিক দুআ পূর্ণ মনোযোগের সাথে পাঠ করবেন।
- চতুর্থ তাকবির ও সালাম: চতুর্থবার তাকবির বলার পর কোনো দুআ ছাড়া অথবা সংক্ষেপে সাধারণ একটি দুআ পড়ে ডান ও বাম দিকে সালাম ফিরিয়ে নামাজ শেষ করবেন।
তথ্যসূত্র ও রেফারেন্স
Hadith
- সহীহ মুসলিম, হাদিস ৯৬৩ (অধ্যায়: জানাজা) — মৃত ব্যক্তির জন্য মাগফিরাত ও জান্নাত কামনার বিশেষ দুআ।
- সুনানে আবু দাউদ, হাদিস ৩২০১ (অধ্যায়: জানাজা) — সর্বসাধারণের জন্য রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর পঠিত জানাজার সাধারণ দুআ।
- সুনানে তিরমিযী, হাদিস ১০২৪ — 'আল্লাহুম্মাগফির লিহায়্যিনা' দুআটির প্রামাণিক সূত্র।

